ইতিহাস

পাল সভ্যতা ও বাঙ্গালী শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর

গৌতম ব্যানার্জী
ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সুন্দর সমন্বয়ের লীলাভূমি বিক্রমপুর। বিক্রমপুর শুধু ইতিহাসের নয়, একটি জাতির প্রাণকেন্দ্র। বাংলাদেশের প্রাণ স্পন্দন। নবম শতাব্দী থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত বঙ্গে বৌদ্ধ, সেন, মুসলিম-পাঠানদের শাসনকালকে বাঙালী জাতির আত্মবিকাশের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে ধরা হয়। ভারত উপমহাদেশে জাতিগত রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতা দখলের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও শিক্ষা সংস্কৃতি বিকাশে তারা ছিল উদার। আর বিক্রমাদিত্যের বিক্রমপুরে বৌদ্ধ, সেন, মুসলিম, পাঠানদের রাজত্বকালে গড়ে উঠেছিল শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ ঐক্য ধারা। সেই সংস্কৃতির ঐক্যের ধারাই প্রাচীন বঙ্গের ইতিহাস।

কারা ধারণ করে রাখবে সেই বিদদ্যুাতসাহী অনুরাগীদের?

সেই মহীয়সী বিক্রমপুর কিংবদন্তীর অহংকার নিয়ে আজও কীর্তিনাশা পদ্মার বুকে ধুকে ধুকে মরছে। আজ সেই প্রদীপের আলো যদিও ম্লান, তবু স্তিমিত নয়। যখন নবদ্বীপ, গৌড়, সোনারগাঁ, ঢাকা সপ্তগ্রাম জনসাধারণের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেনি তারও পূর্বে ৯শ’ ৮০ সালে বিক্রমপুরস্থ বজ্রযোগিনী গ্রামে বৌদ্ধ বাঙালী পন্ডিত শ্রী জ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর ও গণকপাড়া গ্রামে শীলভদ্রের জন্ম হয়। এই দুই বাঙালী মনীষী আধুনিক বিশ্বে মানবতার কিংবদন্তী।

এছাড়া ইতিহাস প্রসিদ্ধ আমাদের বিক্রমপুরের মাটিতে বিভিন্ন সময়ে বহু বিশ্ববিখ্যাত রাস্ট্রনায়ক ও উদারনৈতিক ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটেছে। এরমদ্যে ১৩৭৮ সালে দ্বিতীয় বল্লালসেনের আমলে ইসলাম ধর্ম প্রচারক বাবা আদম, ১৫০৬ সালে সুলতানী আমলে সৈয়দ হুসেন শাহের সময়ে বৈষ্ণব ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা কলির দেবতা শ্রী শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু এবং ১৬২৪ সালের মে মাসে বিশ্ববিখ্যাত তাজমহলের প্রতিষ্ঠাতা ময়ূর সিংহাসনের অধিপতি মোগল সম্রাট শাহজাহান ঢাকা থেকে নৌপথে প্রথমে লক্ষ্যার তীরে খিজিরপুরে যাত্রাবিরতি এবং যাত্রা বিরতির পর বিক্রমপুরে পৌঁছেন। শাহজাহান বিক্রমপুরে তিনদিন অতিবাহিত করে অবশেষে কলাকোপা পৌঁছেন। শিক্ষা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার হিসেবে বিক্রমপুরবাসী আপোষহীন। তাই মোগল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে আড়ফুল বাড়িয়া গ্রামের দু’সহোদর বাঙালী বিপ্লবী চাঁদ রায় ও কেদার রায় বিক্রমপুরের অর্ন্তগত পদ্মা তীরবর্তী শ্রীপুর দুর্গ থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। মানসিংহ ক্ষিপ্ত হয়ে তৃতীয়বার বিক্রমপুরে এসে বার ভূঁইয়াদের মতভেদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পদ্মার তটস্থিত বিক্রমপুরের রাজধানী কেদার রায়ের প্রিতম শ্রীপুর দুর্গ জয় করেন।

একদিকে যেমন অতীত বিক্রমপুরের শৌয-বীর্য আমাদের জাতীয় সত্তাকে শত শত বছর লালন করেছে তেমনি বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের অনুরক্ত বিক্রমপুরের রাজনগর গ্রামের রাজা রাজবল্লভ সিরাজদৌল্লার হত্যার চক্রান্তে জড়িত থেকে বিক্রপুরের ঐতিহ্যে কালিমা লেপন করেছে। কিন্তু না হাজার বছরের চেতনা বিক্রমপুরবাসীকে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে শক্তি যুগিয়েছে। সেই রক্ত পলাশের রক্তিম ছটায় উনবিংশ শতাব্দীর সর্বভাগে বিক্রমপুরে ফরায়েজী আন্দোলনের দানা বাঁধতে থাকে। ফরায়েজী আন্দোলন যখন ফরিদপুর, ২৪ পরগনায় বিস্তৃতি লাভ করে তখন মুহম্মদ মহসিন উদ্দিন দুদু মিয়ার নেতৃত্বে বিক্রমপুরের জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে মুসলিম ও হিন্দু কৃষকরা সংগঠিত হতে থাকে। পরবর্তীতে সেই আন্দোলনের অব্যাহত ধারা বৃটিশ রাজত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়।

দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বঙ্গের রাজধানী বিক্রমপুরে অবস্থিত ছিল। ঐ সময় বঙ্গেশ্বরগণ বিক্রমপুর থেকেই রাজ্যশাসন করতেন। বঙ্গদেশের প্রাচীন রাজধানী ছিল বর্তমানে তা রামপাল নামে পরিচিত। পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল পাল থেকে শুরু করে পরবর্তী সেন রাজাদের রাজত্বকাল সাড়ে চারশ বছরের বেশি হবে। এদরে মধ্য প্রায় সব রাজাই বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। পাল বংশের রাজা ধর্মপাল ও রাজা মহিপাল এবং সেন বংশের রাজা বিজয় সেন, রাজা বলস্নাল সেন ও রাজা লÿণ সেন যদিও ধর্ম সম্প্রসারণে উৎসাহী ছিলেন তথাপি তারা পূর্ববঙ্গেরই অধিপতি ছিলেন, এমনকি কোন কোন রাজা বঙ্গপতি উপাধি ধারণ করে গৌরববোধ করতেন।

ঢাকার অন্তর্গত মুন্সীগঞ্জ জেলাধীন এক বিস্তীর্ণ এলাকাকে বর্তামনে বিক্রমপুর নামে পরিচয় দিলেও বিক্রমপুরের ভৌগলিক সীমারেখা ছিল ৯০০ বর্গমাইল। কিন্তু বর্তমানে পদ্মার ভাঙ্গনে ওলটপালটে এসে দাঁড়িয়েছে ৩৬২ বর্গমাইল।

ঈশ্বর বৈদিক বিক্রমপুরের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘বীরেশ্বর শংকর বসতি ব্রক্ষ্মপত্র জল কল্লোল বলায়িত, বিবিধ মনোহর মন্দির নগর তরু বিবাদি ভূষিত ও বিধি বধূগণ সেবতি, অর্থাৎ বিক্রমপুর ক্ষুদ্র একটি পরগণা হলেও বাংলার সভ্যতা ও সুউচ্চ শিল্পের আঙ্গিকে মহামূল্য হীরকতুল্য।

বিক্রমপুরের নাম উৎপত্তি সম্বন্ধে বিপ্রকুল কল্পলতিকীয় বলা হয়েছে সেন বংশীয় পূর্বপুরুষ নিভুজ সেন, বীর সেন প্রভৃতি রাজারা দক্ষিণাত্য হতে বঙ্গে আগমন করে এবং তাদের বংশধর বিক্রম সেনই বিক্রমপুর পরগনার স্থাপয়িত।

ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর পঞ্চম রিপোর্টে বলে হয়েছে বল্লাল পৌত্র বিশ্বরূপ সেনের রাজত্বের শেষ সময় বিক্রমপুর শাসনের (বর্তমানের পরগনার ন্যায় বিভাগ) সৃষ্টি হয় এবং সে সময় বিক্রমপুরে একটি স্বতন্ত্র সনও চালু ছিল।

তখন পশ্চিমে পদ্মা, পূর্ব-উত্তর ধলেশ্বরী, দক্ষিণে আড়িয়াল ও কৃষ্ণসলিল মেঘনাদ নদের সাগরের অংশবেষ্টিত চতুর্সীমানাই বিক্রমপুর নামে পরিচিত ছিল। কালীগঙ্গা নদীর উত্তাল স্রোত বিক্রমপুরের পল্লী নগরগুলোকে বিদেশী পর্যবেক্ষকদের কাছে মোহনীয় করে তুলেছিল। মহারাজ বল্লাল সেন প্রাচীন বাংলাকে বারেন্দ্র, রাগরী, রাঢ় বঙ্গ ও মিথিলা পাঁচভাগে বিভক্ত করে। বর্তমান সময়ে বিক্রমপুর পরগনার অধিকাংশ স্থান ঢাকা, ত্রিপুরা, ফরিদপুর, নোয়াখালী চার জেলাতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পূর্বে ইদিলপুর বাকলার অন্তর্গত, সন্দীপ ও সাবাজপুর ফতেয়াবাদের অন্তর্গত ও বিক্রপুরে, কার্তিকপুর, চাঁদপুর ইত্যাদি পরগণাগুলো সোনারগাঁয়ের অন্তর্গত ছিল। এখন রাজনৈতিক পরিবর্তন ও কীর্তিনাশা পদ্মা বিক্রমপুরকে উত্তর ও দক্ষিণে দু’ভাগে বিভক্ত করেছে। মূলফতৎগঞ্জ (পরে নদীর ভাঙ্গন) নড়িয়াতে পরিবর্তন করা হয়। পালং ও শিবচর থানা নিয়ে ৪৮৫ টি গ্রামসহ দক্ষিণে বিক্রমপুর এবং রাজবাড়ী মুন্সীগঞ্জ শ্রীনগর থানা নিয়ে উত্তর বিক্রমপুর গঠিত হয়। তিনশ বছর পূর্বে কীর্তিনাশা পদ্মা বিক্রমপুরের অসংখ্যা সবুজবেষ্টিত পল্লী, দেবমন্দির, মঠ ও প্রাচীন শিল্প র্কীতি ধ্বংস করেছে যা নির্ণয় করা দুস্কর।

মহারাজা আমাদের সময় থেকেই বঙ্গদেশে বৌদ্ধ ধর্মের আবির্ভাব ঘটে। পাল রাজবংশ দশম শতাব্দী থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিক্রমপুর শাসন করে। দ্বিতীয় শূরপালের (১০৭৮ – ১০৯১) রাজত্বকালের পর তার সহোদর রামপাল (১০৯১ – ১১০৩) সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং তার নামানুসারে বিক্রমপুরস্থ রামপাল গ্রাসও তার সময়ে প্রতিষ্ঠিত বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। পালবংশীয় রাজাদের মদ্যে বঙ্গদেশে তালিপাবাদ পরগনার মাধবপুরে যশোপাল, ভাওয়ালের কাপাসিয়ায় শিশুপাল এবং সাভারের নিকটস্থ কাঠালবাড়ীতে হরিশচন্দ্রের রাজত্ব রংপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বিক্রমপুর রামপালে আজও কালের সাক্ষী রাজা হরিশচন্দ্রের দীঘির অস্তিত্ব বিদ্যামান।

ঐতিহাসিক আর সি মজুমদারের মতে হরিশচন্দ্রের বংশেই বৌদ্ধ রাজা মানিক চন্দ্র ও গোবিন্দ্রচন্দ্রের শাসনামলে ৯৮০ সালে বিক্রমপুরস্থ বজ্রযোগিনী গ্রামে বৌদ্ধ বাঙালী পন্ডিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম কল্যাণশ্রী ও মাতার নাম প্রভাবতী। অতীশ ছেলেবেলায় আদিনাথ চন্দ্রগর্ভ নামে পরিচিত ছিল। তিনি শৈশবে মায়ের কাছে বিদ্যালাভ করেন। সে সময়ে প্রখ্যাত বৌদ্ধ পন্ডিত অবধূত দেত্যারির কাছে পাঁচটি প্রধান বিজ্ঞানে বিদ্যালাভ করেন। তিনি বাংলা তথা বিক্রমপুর আর চীনের মধ্যে হাজার বছর আগে মৈত্রীর সেতু রচনা করেছেন। আজও তিববতীয় লামাগণ এই বাঙালী মহামুনির সমাধিতে এক বিশেষ দিন ধূপদীপ বাদ্যযন্ত্রসহ মন্ত্রোচ্চারণ করে অর্ঘ প্রদান করেন। বৌদ্ধের মূর্তির সাথে দীপঙ্করের বন্দনা ও অর্চনা করে থাকেন। দীপঙ্কর ১৭৫ টি গ্রন্থ রচনা করেন। আজকের মত দীপঙ্কর শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবী লেখকই ছিলেন না। তিনি খন্ডিত জ্ঞানের সাধনা করেন, সমগ্র জ্ঞানের সাধনা তাকে মহাপন্ডিত করেছে। পরিচালক ও প্রশাসক হিসেবে দীপনুরের প্রতিভা ছিল প্রশ্নাতীত যা সাধারন কোন ধর্মীয় নেতার থাকে না। একই সময়ে ৫১ জন আচার্য ও ১০৮ টি মন্দিরের সেবা ও রক্ষার দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি শুধু ধর্ম সম্বন্ধীয় পুস্তক রচনাই করেননি, চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়েও বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি ছিলেন বহু ভাষাবিদ, প্রকৌশলী ও শব্দ বিজ্ঞানী। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নালন্দা ও বিক্রমশীল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষপদ অলংকৃত করেছেন বাঙালী দীপঙ্কর ও আচার্যশীল ভদ্র। এই দুই বাঙালী ছিলেন বিক্রমপুরের গৌরব। অতীশ দীপঙ্কর তিববতে অক্লান্ত পরিশ্রম করায় তার দেহ ভেঙে পড়ে। অবশেষে ১০৬৪ সালে তিয়াত্তর বছর বয়সে লাম নগরীর অদূরে লেথাঃ অঞ্চলে তারই নির্মিত তারা দেবীর মন্দিরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই মহাজ্ঞানী মহাজনের হাজার বছর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ১৯৮২ সালে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পন্ডিত ব্যাক্তিবর্গ বিক্রমপুরের সেই অজেয় পল্লী বজ্রযোগিনী গ্রামের ভিটায় সমবেত হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বৌদ্ধপাল রাজাদের সময় বিক্রমপুরের মেয়েরা স্বাধীনভাবে চলাচল করতো। ‘দোলায় আসি ঘোড়ায় যাই’ প্রভৃতি উপকথার মধ্যে সেই আধুনিক বিলাসিতার জন্যে মেয়েরা ঘাগরা, কাচুলি, বানারসী শাড়ি, পাট ও পশমীর বস্ত্রাদি পরিধান করতো। অলংকারের মধ্যে শাঁখা, অঙ্গুরি, কংকন, কেয়ূর, হার বেসর, কুত্তল, নূপুর, নোলক, একছানা, পৈছি গুরজী, বেকী, তোড়ল ইত্যাদি বেশি ওজনের জিনিসপত্র ব্যাবহার করতো। পাল রাজাগণ বিক্রমপুরে বৌদ্ধধর্ম ও শিক্ষা বিস্তারে প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়েছিল। প্রতি গ্রাম থেকে পুকুর ও দীঘি ইত্যাদি খননে প্রাপ্ত নানা প্রকার প্রস্তরখচিত বুদ্ধদেবের মূর্তিসমূহ থেকেই তা অনুমান করা যায়। পদ্মা ধ্যানস্থ বৌদ্ধের সৌম্য মূর্তিগুলো পালরাজাদের শিল্প কৌশলের নিপুণতার সাক্ষীস্বরূপ। পালরাজারা শিক্ষা বিস্তারের জন্য বিক্রমপুরের সবর্ত্র টোল ও চতুম্পাটিতে অধ্যয়নের ব্যবস্থা করেছিলো। বৈদিক যুগের সভ্যতায় ন্যায় গুরুগৃহে শিক্ষাদানের রীতি প্রচলিত ছিল। পালরাজত্বের সময় বঙ্গদেশ ভুক্তি মওলক এবং মন্ডালিকাসমূহ শাসন বিভক্ত ছিল। তৎকালে বিক্রমপুরে রাজকর স্বরূপ ভূমি মালিকদের কাছ থেকে উৎপন্ন শস্যের এক ষষ্ঠাংশ গ্রহণ করা হতো। প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য রাজার অধীনে প্রধান পুরোহিত,সেনাপতি, প্রধান প্রধান শান্তিরক্ষক ও প্রধান সভাষদসহ বিভিন্ন উচচ কর্মচারী নিয়োগ করা হতো।

সেন সভ্যতা ও বাংলার রাজধানী রামপাল

বাংলার ইতিহাস অনুসন্ধান করতে যেয়ে বাংলার প্রাচীন মানসিক রূপের বর্ণনা প্রসঙ্গে বিক্রমপুর চোখ-১ আলোচনায় পালবংশের উদ্ভবের কথা নবম শতাব্দী থেকে ধরা হয়েছে। পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল পাল থেকে শুরু করে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত পালবংশ বিক্রমপুর শাসন করে। দ্বিতীয় শূরপালের সহোদর রামপাল তার নামানুসারেই রামপাল গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে সেন বংশোদ্ভহত বিক্রম সেনই বিক্রমপুর নগরের স্থাপয়িতা। ঐতিহাসিকরা আরও বলেন, রামপাল প্রতিষ্ঠার পর পরই বিক্রমপুর পরগনার নামের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বিক্রমপুরের ধারাবাহিক শাসনামলের ইতিহাস লিখিত বা সংরক্ষিত না থাকায় নবম শতাব্দীর পূর্বে অর্থাৎ খ্রীষ্টপূর্ব তিনদশক থেকে অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত বিক্রমপুর পরগনার অস্তিত্ব সম্পর্কে কোন তথ্য সত্য নির্ভর করে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। এই সময় বিক্রমপুরের কি নাম ছিল? কোন জনপদ ছিল না কিনা? এখানকার আর্থ-সামাজিক অবস্থা, ভাষা, শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার, শিক্ষা, ধর্ম, উৎপাদন পদ্ধতি, শ্রমজীবী মানুষের জীবনাচরণ এবং বাংলার রাষ্ট্রীয় পারিকল্পনা কি পর্যায়ের ছিল তা অনুমান করা কষ্টসাধ্য। শুধু পৌরাণিক বেদ ও মনুসংহিতার উপর নির্ভর করে বলা যায়, বঙ্গ নামে একটি দেশ ছিল এবং তখন বঙ্গদেশ অরণ্যসঙ্কুল ও অনার্যগণের আবাসভূমি ছিল। কারা বাংলাদেশের প্রাচীনতম অধিবাসী, আর বাঙালীর রক্তে কোন রক্ত কতটা আছে এ বিচার নৃ-বিজ্ঞানের।

নৃ-বিজ্ঞানের মতে বাংলার প্রাচীনতম অধিবাসীরা ছিলেন অষ্ট্রিক গোষ্ঠীর অষ্ট্রো এশিয়াটিক জাতির মানুষ। অষ্ট্রিক গোষ্ঠী ছাড়াও বাংলাদেশে বাস করতেন দ্রাবড়ি গোষ্ঠীর বিভিন্ন শাখার লোকেরা। অষ্ট্রো এশিয়াটিক ও দ্রাবিড় ভাষীরা ছাড়াও পূর্ব ও উত্তর বাংলায় বহু পূর্বকাল থেকে নানা সময়ে এসেছিলেন মঙ্গোলীয় বা ভোট-চীনা গোষ্ঠীর নানা জাতি-উপজাতি। অতএব, শুধু নানা ভাষাই যে এই বাংলাদেশে প্রাচীনতম কালে চলত তা নয়, দেশটি ছিল, নানা জাতি উপজাতিদের বাসভূমি। ‘রাঢ়’, ‘সুক্ষ’, ‘পুন্ড’, ‘বঙ্গ’, প্রভৃতি প্রাচীন শব্দগুলো প্রথম দিকে বোঝাতে বিশেষ বিশেষ জাতি বা উপজাতিকে ; তারপরে তাদের বাসস্থল হিসেবে এক একটা বিশেষ বিশেষ অঞ্চলকে। যেমন, ‘রাঢ়’ বলতে এখনো বুঝায় মধ্য পশ্চিম বঙ্গ, ‘সুক্ষ’ বোঝাতে দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গ, ‘পুন্ড বর্ধনভুক্তি’ বোঝাতে মোটের উপর উত্তর বঙ্গের বঙ্গকে। অবশ্য এ ছাড়াও এক একটা অঞ্চলের অন্য নাম ছিল। যেমন, উত্তর বঙ্গকে পূর্বেও বলত এখনো বলে, ‘বরেন্দ্র’ ; ‘বঙ্গ’ বলতে বিশেষ করে বোঝাত পূর্ব বঙ্গ। বাংলা ভাষা কিন্তু অষ্ট্রিক গোষ্ঠীর ভাষাও নয়, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ভাষাও নয়, আর ভোট-চীনা গোষ্ঠীর ভাষার চিহ্ন তা এ ভাষায় নেই-ই বলা চলে। বাংলাভাষা আর্য (ইন্দো-এরিয়ান) গোষ্ঠীর ভাষারই বংশধর।

‘আর্য’ কথাটাই সম্ভবত মূলত একটা সংস্কৃতিতেই ছিল এক গোষ্ঠীর। খ্রীষ্টপূর্ব ১০০০ থেকে খ্রী ৫০০ অব্দের মধ্যেই তারা সম্ভবত প্রথমে এসেছিল বিদেহে, সগর্বে, পরে আসে অঙ্গে, তারও পরে বঙ্গে, কলিঙ্গে। যারা এসব দেশে প্রথম আসত, বসবাস করত তখনকার স্থানীয় ‘অন-আর্য’ অধিবাসীদের সাথে দ্বন্দ্ব চলত। তাই জাতি ও দেশের প্রধান এক পরিচয় ভাষা ; কারণ, ভাষা একটি মৌলিক সামাজিক বন্ধন, সংস্কৃতির এক প্রধানতম বাহন, জাতির মানসিক রূপেরও পরিচায়ক। আর্যদের বাংলায় আগমনের পূর্বে বঙ্গোপসাগরের তট ব্যাপী কতগুলো স্থান সমতট বলে পরিচিত ছিল। চৈনিক পরিব্রাজক যুয়ন চয়ঙের ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে জানা যায় তখন বিক্রমপুর সমতটাখ্যা হিসেবে বিক্রমপুর বা বঙ্গের অন্তর্ভুক্তি হিসেবে তখন এখানে গোষ্ঠীতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ছিল। বেদের শাস্ত্রনুযায়ী জীবন অতিবাহিত হতো।

কৌলিণ্যপ্রথা বংশ পরম্পরা হিসেবে গণ্য হতো না। শিক্ষা ও কর্মের বিভাজনের উপর কৌলিণ্য প্রথা চালু ছিল। ভারতের আর্য সমাজ ব্যবস্থা বৈদিক রীতিতে প্রসার ঘটার পর বুদ্ধের ন্যায় ত্যাগী সন্নাসী পুরুষ ভোগ বিলাস ও দ্বেষ-হিংসা পরিত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্মের বাণী প্রচার করতে থাকে। কিন্তু শ্রী শকরাচার্যের অভ্যুদয় বুদ্ধের সেই মানবতার অভয়বাণী ভারতে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। পূর্ব বঙ্গের বিশেষতঃ বিক্রমপুরে কিরূপ বৌদ্ধধর্ম বিস্তার লাভ করে তার একটু প্রাচীন ইতিহাস আলোচনা করা প্রয়োজন। ৩৭২ খ্রী পূর্ব চন্দ্রগুপ্ত জৈন বতির শিষ্যত্ব নেয়ার বঙ্গদেশ থেকে বাহ্মাণচার এক প্রকার বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। চন্দ্রগুপ্তের পর মহারাজা অশোকের অভ্যুদয় হয় এবং অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে। অশোক বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য নানা দেশে ধর্ম প্রচারক প্রেরণ করেন। অশোকের সময় বঙ্গদেশের অবস্থা এতটা গৌরবজনক ছিল না। তার অধীনে বঙ্গদেশে বিভিন্ন প্রদেশে বিভক্ত হয়ে সামন্ত রাজার উদ্ভব ঘটে। এই সময় থেকেই পূর্ববঙ্গে বৌদ্ধধর্মের প্রচার হতে থাকে। মহারাজা অশোকের সময় বঙ্গের আধিপত্য বিস্তার না করলেও পাল রাজবংশের অভ্যুদয়ের সাথে সাথে বিক্রমপুর তাদের শাসনে চলে যায়।

এই পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হওয়ায় বিক্রমপুর তথা বঙ্গে বৌদ্ধধর্মের উদ্ভব ঘটে। আর্য-অনার্য শব্দের সমন্বয়ে বিক্রমপুরে একটি প্রাচীন গোষ্ঠতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠে। সে সময় বিক্রমপুরের আর্থ সামাজিক অবস্থা সামন্তশ্রেণী ভুক্তি ছিল এবং কালী গঙ্গা নদী প্রবাহিত হওয়ায় কৃষি উৎপাদনে অত্র অঞ্চল খ্যাতির শীর্ষে ছিল। তখন সমতট বাসীদের প্রধান আহার ছিল ভাত মাছ। বিক্রমপুর তথা পূর্ববঙ্গে তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্পদের বন্টন হতো এবং কড়ির বিনিময়ে সম্পদ ক্রয়-বিক্রয় চলত। বৈদিক মতে বিয়ে কার্যাদি সম্পন্ন হতো। গোষ্ঠীগুলো বেঁচে থাকার প্রয়োজনে পুকুর খনন, গুরুগৃহে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং অর্থের জন্য কার্পাস চাষ করা হতো। এছাড়াও সূতা ও কাপড় তৈরী হতো। আড়িয়ল কাগজ শিল্প প্রসিদ্ধ ছিল। যে শঙ্খ শিল্প এখন ঢাকায় গৌরব, বিক্রমপুর তার জন্মস্থান কুস্বকারের হাঁড়ি-পাতিল, শত শত মাটির মূর্তি এবং সোনা-রূপার কাজেরও গৌরব ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের উন্নতির বিকাশে তখন বিক্রমপুরে একটি কারিগরী শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে যা পরবর্তীতে শ্রমজীবি হিসেবে পরিচয় লাভ করে।

পাল নৃপতিগণ বৌদ্ধ ধর্মাবম্বী হলেও তারা ব্রাহ্মাণের প্রতি শ্রদ্ধাবান ছিলেন। পাল রাজারা বৌদ্ধধর্মের বিস্তৃতির জন্য চেষ্টা করলেও বৈদিক ধর্মই অধিকতর প্রতিষ্ঠাবান ছিল। তবে একথা ঠিক যে বৌদ্ধ ধর্মের তান্ত্রিকতা বৈদিক আচার অনুষ্ঠানের কঠিন ও রীতিনীতির বহু পরিমাণে শিথিল করে ফেলেছিল। পাল রাজাদিগনের সময়ে হিন্দু সমাজের জাতিগত সংকীর্ণতা দূরীভুত হয়ে আর্য শক ও অনার্যদিগের মধ্যে একতার দৃঢ়তা বৃদ্ধি পেয়েছিল। সে সময় বিক্রমপুরে প্রত্যেক জাতিই দ্বেষ ভাব ভুলে গিয়ে মিলনের স্বমহিমায় প্রত্যেকই আপনার ভাবতে শিখেছিল। বিক্রমপুরের ইতিহাস মূলত : সেন রাজাদের সময়ই পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, ধারাবাহিক শিল্প সংস্কৃতির উত্তরণ, কৌলিণ্য প্রথা এবং কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা ও বিচার কাঠামো সেন রাজাদের রাষ্ট্রীয় চিন্তা দর্শন। সেনবংশীয় রাজাদের সময় বিক্রমপুরের রামপাল বাংলার রাজধানী হয়ে উঠে এবং দ্বিতীয় বল্লাল সেনের সময় মুসলিম দরবেশ বাবা আদম রামপালের নিকটবর্তী আবদুল্লাহপুর গ্রামে কানাইচঙ্গ নামক স্থানের মসজিদে আশ্রয় নেন।

ঐতিহাসিকরা মসজিদের উপস্থিত থেকে ধারণা করেন সেন রাজত্বকালে রামপালে মুসলিম সভ্যতার উন্মেষ ঘটে। সেনবংশীয় রাজাগণের পূর্বপুরুষ দাক্ষিণাত্য থেকে বঙ্গদেশে আগমন করেন। তাদের বংশোদ্ভব বিক্রমসেনই বিক্রমপুর নগরের প্রতিষ্ঠতা এই সেন বংশের রাজা আদিশূর অত্যন্ত খ্যাতিমান রাজা ছিলেন। তিনি স্বয়ং গৌড়ের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। ‘‘বিষকূলকল্পলতা’’ বইয়ে উল্লেখ রয়েছে ‘‘বরেন্দ্র সেন’’ গৌড় রাজ্যের অধিপতি ছিলেন এবং তার নামানুসারে গৌড়দেশ ‘‘বরেন্দ্রভূমি’’ বলে খ্যাতি লাভ করে। সেই সময় রাঢ়, বঙ্গ সবই গৌড় বলে পরিচিত ছিল এবং তখন বঙ্গদেশের ভাষা গৌড়ীয় ভাষা বলেও চিহ্নিত ছিল। গৌড় ও বরেন্দ্রই পূর্বে পুন্ডদেশ বলে পরিচিত ছিল। আদিশূর শ্বশুরের সহায়তায় বীরসিংহ এবং পাল রাজাগণকে পরাজিত করে গৌড়ে স্বাধীনতা প্রাপ্ত হয়। এভাবেই প্রমাণিত হয় যে, বঙ্গদেশের রামপাল নগরীই আদিশূরের আদি রাজধানী। সেনরাজাগণ বৈদ্য ছিলেন, কানাকু্ব্জ হতে বাক্ষ্মাণ ও কায়স্থগণ বিক্রমপুরে আগমন, এজন্যই বিক্রমপুরে এই তিন জাতির প্রাধান্য দেখা যায়।

প্রসন্ন কুমার ঠাকুর ‘বেনীসংহারে’ বলেছেন, মহারাজ আদিশূর রাজধানী রামপাল প্রজাদের কল্যাণে যজ্ঞানুষ্ঠান পরিচালনার জন্য কান্যকুব্জ থেকে পাঁচজন ব্রাহ্মণ নিয়ন্ত্রণ করেন। নিমন্ত্রিত ব্রাহ্মণরা এসে রাজধানীর দু’কিলোমিটার দূরে আর্শীবাদের জল চিরশুষ্ক গজারি বৃক্ষে ছিটিয়ে দিলে বৃক্ষটি পুনরুজ্জীবিত হয় এবং ফল ও পুষ্পে সুশোভিত হয়। বর্তামানে মৃতপ্রায় গজারি বৃক্ষটি রামপাল মহাবিদ্যালয়ের পূর্বপাশে কালের সাক্ষী হিসেবে আজও দাড়িয়ে আছে। পরবর্তীতে রাজা আদিশূর ব্রাক্ষণদের তেজ ও অলৌকিক ক্ষমতায় খুশি হয়ে ব্রাহ্মণদের স্থায়ী বসবাসের জন্য বিক্রমপুরে ‘পঞ্চসার’, ‘পাঁচগাও’ নামে পাঁচটি গ্রাম দান করেন। সেই ব্রাহ্মরেদ সুবাদেই বাঙালী জীবনে জাতিপ্রথার গোড়াপত্তন হয় এবং বল্লাসেনের আমলে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। ফলে বিক্রমপুরে ‘‘স্বেচ্ছা’’, ‘‘যবনদের’’, জীবন কাঠামো শোষণ যন্ত্রণায় শোণিত হয়ে উঠে। বল্লাসেন রচিত ‘অদ্ভুদ সাগর’ গ্রন্থে সেন বংশের একটি ধারাবাহিক বংশ পরিচয় দিয়েছেন, আদিশুর (৯০০-৯৫২) ভুশূর পুত্র (স্বতন্ত্র) লক্ষীকন্যা (৯৫২-৯৭০) অশোক সেন (৯৭০-৯৮১) শূরসেন (৯৮১-৯৯৪) বীরসেন (৯৯৪-১০১২) সামন্ত সেন – হেমন্ত সেন বল্লাল সেন (১০৬৬-১১০১) ১ম লক্ষণ সেন (১১০১-১১২১) মাধবসেন – কেশব সেন ২য় লক্ষণ সেন (১১২৩-১২০৩) পর্যন্ত। মহারাজা বল্লাসেন আদিশূরের কন্যা কুলসজ্ঞাত। বঙ্গপ্রদেশ দু’জন বল্লাল সেন ছিলেন।

প্রথম বল্লাল সেন বিজয়সেনের পুত্র, দ্বিতীয় বল্লাল সেন – বেদসেন বা বিশকতাতের ঔরস পুত্র। এই উভয় বল্লালই বিক্রমপুরের সমৃদ্ধির সাথে জড়িত। ঐতিহাসিক জেসি র্মাস সেনস হিষ্ট্রি অব বেঙ্গল বিক্রমপুরের সমৃদ্ধির সাথে জড়িত। ঐতিহাসিক জে সি মার্স সেনস হিষ্ট্রি অব বেঙ্গল এ লিখেছেন, প্রথম বল্লাল সেন ১০৫০ খ্রী : রামপালের রাজা নির্বাচিত হয়ে বঙ্গদেশকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেন। তিনিই বঙ্গে কৌলিণ্য প্রথার সৃষ্টি করেন এবং অসর্বনা ডোম কন্যার অন্নগ্রহণ করায় পুত্র লক্ষণ সেনের সাথে মতবিরোধ হয়। ডোম কন্যাকে বিয়ে করায় তখন অস্পশ্বহতার কারণে বিক্রমপুর থেকে অনেক কৌলিণ্য ব্রহ্মাণ চলে যায়। বল্লাল সেন মিথিলা আক্রমণের সময় বিক্রমপুরে বীরশ্রেষ্ঠ লক্ষণ সেনের জন্ম হয় এবং বল্লাল সেন মারা গেলে ১১৬৮ সালে লক্ষণ সেন পৈতৃক রাজ্য লাভ করেন। পরে লক্ষণ সেন রাজধানী বিক্রমপুর থেকে গৌঢ় বা লক্ষণাবর্তীতে স্থানন্তরিত করেন। তার রাজত্বকালে গৌড়ে প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন বাঙালী পশুপতি ও বৈদিক ব্রাহ্মণ হলায়ুধ। যাদের জন্মস্থান বিক্রমাপুর। গৌড়ে লহ্মণ সেনের রাজত্বকালে পুত্র বিশ্বরূপ সেন বিক্রমপুর পরগনার শাসনভার গ্রহণ করেন। ভারতব্যাপী তখন প্রজাবিদ্রোহ এবং সৈন্য বিদ্রোহ দেখা দেয় কিন্তু বিক্রমপুর তথা বঙ্গে সেই ধরনের কোন বিদ্রোহ দেখা দেয়নি। অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

লক্ষণ সেন স্বেচ্ছায় তীর্থযাত্রায় বের হলে কেশব সে বিক্রমপুরে আসেন এবং উদার মনের অধিকারী বিশ্বরূপ স্বইচ্ছায় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কেশব সেনের কাছে বিক্রমপুরের শাসনভার দিয়ে দেন। বিশ্বরূপের শাসনামলে শাসন, শৃংখলা ও কর আদায়ের জন্য একটি পরগনাতি ‘সন’ প্রচলিত ছিল। যার দ্বারা রাষ্ট্রের সব কাজ নিয়ন্ত্রিত হতো। বিশ্বরূপ সেনের পর সেন বংশের কেউই আর খ্যাতি অর্জন করতে পারেনি। এরপর দ্বিতীয় বল্লালসেন বিক্রমপুরের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে বিক্রমপুরের গৌরব আবার স্বর্ণ প্রদীপের মত জ্বালিয়ে তোলেন। প্রত্মতান্ত্রিক শিল্প ও ভাস্কর্যে বিক্রমপুর নগরীকে মহীয়সী করে তুলেছিল। ডঃ ওয়াইজের লিখিত এশিয়াটিক জার্নাল থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় বল্লালসেন যখন বিক্রমপুরের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তখন ১৩৭৮ সালে বাবা আদম নামে এক ইসলাম ধর্ম প্রচারক রামপালে উপস্থিত হন।

কথিত আছে তাপস শ্রেষ্ঠ বাবা আদমের সাথে রাজা বল্লাল সেনের যুদ্ধ বাঁধে এবং আত্ম রক্ষার জন্য বাবা আদম তার অনুচরসহ যুদ্ধে লিপ্ত হন। অষ্টাদশ দিবস যুদ্ধে রাজা বল্লালসেন পরাজিত হন। যুদ্ধক্ষেত্রে মাগরেবের নামাজ আদায়ের সময় বাবা আদম নামাজে মশগুল থাকলে সুযোগ বুঝে রাজা তরবারির আঘাতে তাকে হত্যা করে। আরও কিংবদন্তী আছে, বল্লালসেন শোণিত সিক্ত দেহ ধৌত করার জন্য নিকটবর্তী একটি সরোবরে যায় এবং সেখানে শিথিল বন্দনী থেকে কবুতর ছুটে রামপাল প্রাসাদে পৌছলে আত্মীয় পরিজন পরাজয়ের অনুশোচনায় কুন্ডলী জ্বালানো আগুনে আত্মাহুতি দেয় এবং রাজা দ্রুতবেগে ছুটে এসে তাদের রক্ষা করতে ব্যার্থ হয় এবং নিজেও আত্মীয় পরিজনের শোকে অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেন। অতঃপর কাজী কসবাগ্রামের দূর্গাবাড়ীতেই সুলতান আহম্মদ শাহের পুত্র জামাল উদ্দিন ওয়াদদন সুলতান আবুল মুজাফফর ফতেহ শাহের আসলে মহান মালিক কার্ফুর কর্তৃক হিজরী মাসের মাঝামাঝি বাবা আদমের মসজিদটি তৈরী করা হয়। আজও সেই মসজিদে নামাজ আদায় হয়।

সুলতানী আমলে বাংলা ও চৈতন্য মহাপ্রভুর আগমন

প্রাচীন বাংলা বা ভারতে মুসলিম বিজয়ের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে এখানকার বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যকার জাতীয় চেতনার অভাব, সমস্যাসংকুল জনপদ, বিভিন্ন ভাষার জাতি-উপজাতি মধ্যে সামাজিক সমন্বয়ের অভাব এবং কৌলিন্য প্রথা উন্মেষের ফলে সামমত্মশ্রেণীভুক্ত একটি বুদ্ধিভিত্তিক শ্রেণীর উদ্ভব বা জনসাধারণকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এই ব্যাপক জনসাধারণের বিচ্চিনতার কারণে রাষ্ট্রে আর্থ-সামাজিক অবস্থায় স্থবিরতা দেখা যায়।

মধ্যযুগে ভারতের এই ক্রামিত্মকালে মুসলিম বিজয় প্রাচীন বাংলা বা ভারতে সহজ হয়ে উঠে। মুসলিম রাজ-রাজড়াদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লোভ নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত বাড়িয়ে তোলে এবং ভারতে সর্বত্র রক্তপাত ঘটাতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে ভারত বা প্রাচীন বাংলায় মুসলিম ধর্ম উন্মেষের ফলে মুসলিম রাজারাও সমগ্র ভারত অধিকার করতে সমর্থ হয়নি। কিন্তু ইসলাম ধর্মের প্রভাব স্থায়ী হয়ে উঠে।

মুসলিম রাজনৈতিক শক্তিই প্রাচীন বাংলা বা ভারতে জাতি গঠনের প্রয়াস এবং জাতীয় চেতনার উদ্ভব ও বিকাশের পথকে সুগম করে। সংগঠিত রাজনীতি শুরুর আগে বা পরে সামন্তশ্রেনীর শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত ভারতীয় নিন্মবর্গের জনতার ভহমিকা প্রশংসনীয়।

মধ্যযুগ বলতে ভারতের ইতিহাসে সাধারণভাবে বোঝায় মুসলমান রাজত্বকাল। কিন্তু পূর্ববঙ্গ তখনও সেন রাজাদের রাজত্ব বিরাজমান। মুসলিম রাজত্বের উথানের পাশাপাশি ১২০০ সাল শেষ হতে না হতেই বাংলার ওপরে আফগান তুর্কী আক্রমণের ঝড় বয়ে যায়। দিল্লীতে তখন তুর্কী রাজা প্রতিষ্ঠিত। মগধ জয় ও বিধ্বস্ত করে পশ্চিবঙ্গ অধিকার করতে তুর্কীদের বিলম্ব হলো না। বাংলায় খিলজী (১২০০-১৩৫০), তুঘলুক(১২২৭-১২৮৭), বলবনী শ্যসক বংশের উথন-পতন ঘটল; তুর্কী রাজত্ব বলবনী বংশের আমলে লক্ষণাবতী (উত্তরবঙ্গ), সপ্তগ্রাম (মধ্যপশ্চিমবঙ্গ), সোনারগাঁও (মধ্যপূর্ববঙ্গ) ও চট্টগ্রামকে (পূর্ববঙ্গ), কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সুফি ফকির দরবেশ ও গাজীরা তখন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এসে নবজিবিত ভহমিতে ইসলাম ধর্ম বিস্তারের চেষ্টা চালায়।

কিন্তু তুর্কী অধিকার তখনো সর্বত্র পরিব্যাপ্ত নয়, আর লক্ষণাবতী সোনরগাঁ প্রভৃতি কেন্দ্রের তুর্কী শাসকদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ, পরস্পর পরস্পরে হানাহানি লেগেই থাকে। এ অবস্থার অবসান ঘটে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এর রাজ্যলাভে (১৩৪২-১৩৫৭)। তিনি বাংলাদেশে স্বাধীন রাজত্ব স্থাপন করেন।

বখতিয়ার খিলজী বাংলায় প্রথম মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে পঞ্চদশ শতকের শেষ (১৫৭৬) পর্যন্ত মোগল সম্রাট আকবরের বাংলা বিজয় পর্যন্ত সময়কে সুলতানী আমল ধরা হয়। এই সুলতানী আমলে বাংলার শাসনভারএককভাবে দখল করা সম্ভব হয়ে উঠেনি।

পূর্ববঙ্গে মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত বিক্রমপুরে তখনও রাজধানী ছিল। অবশেষে তুঘলুক পূর্ববঙ্গ বিজয়ের পর বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ে প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই বিক্রমপুরের সমৃদ্ধি অনেকটা পিছিয়ে পড়ে। তবে এ সময় বিক্রমপুরের ইসলাম ধর্মের ব্যাপক প্রসার লাভ করে। বিক্রমপুরের মানুষ এক সময়ে বৌদ্ধ ধর্মানুসারী ছিল, বাহ্মণ্যবাদ প্রসারিত হলে অনেকেই হিন্দু ধর্মরীতি গ্রহণ করে, বৌদ্ধ পরিচয় পরিবর্তন করে। আবার ইসলাম ধর্ম প্রসারিত হলে অনেক হিন্দু ও বৌদ্ধ ইসলাম ধর্ম প্রসারিত করে। তাই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনযোগ্য হলেও তিনটি যুগের সংস্কৃতির অব্যাহত গতি বিক্রপুর তথা বৃহত্তর বাংলায় একটি নৃত্যাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ও জাতিগত সত্তার ঐক্যের অভ্যুদ্বয় ঘটে। এই জাতিগত ঐক্যের নবজাগরণে পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি বাংলার শাসনকর্তা সৈয়দ হুসেন শাহের আমলে বৈষষ্হব ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাও মানবতাবাদী রাষ্ট্রচিন্তার নায়ক শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু নবদ্বীপ ছেড়ে বিক্রমপুরে অবস্থান নেয়।

ঐতিহাসিক মিনহাজের মতে এতয়োদশ শতাব্দীর গোড়ারদিকে সনে বংশের রাজা লক্ষণ সেন নদীয়াসহ বাংলার অধিপতি ছিলেন। তখন বাংলায় তুর্কীদের আক্রমণ অব্যাহত থাকে। সত্যি সত্যি তকন সমগ্র উত্তর ভারতে তুর্কীদের অধীনে চলে যায়। উত্তর ভারত সংলগ্ন বিহার বখতিয়ার খিলজী জয় করেন। লক্ষণ সেন অভিযান ঠেকাতে বিহার থেকে বাংলায় আসার পথে সেনা সমাবেশ করেন, কিন্তু লক্ষণ সেন যখন সংবাদ পেল শত্রুরা তার প্রসাদের পৌছেঁ তখন সপরিবারে পালিয়ে রাজধানী বিক্রমপুরে আশ্রয় নিলেন। তখন বখতিয়ার খিলজীর ধনসম্পদ এবং অনেক অর্থ হস্তগত হয় এবং রক্তপাতহীন যুদ্ধে বাংলায় মুসলিম শাসনের অভ্যুদয় ঘটে।

হরিমিশ্রের কুলজী গ্রন্থ অনুসারে দেখা যায় মুসলিম যোদ্ধাদের ভয়ে লক্ষণ সেনের পুত্র কেশব সেন গৌড় পরিত্যাগ করে চলে যান। লক্ষণ সেনের অন্য পুত্র বিশ্বরূপ সেন তখন বিক্রমপুরে রাজত্ব করেন। তিনি ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে গৌড়েশ্বর উপাধি ধারণ করেন। বিক্রমপুর এ সময় মুসলিম অভিযানের লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়। লক্ষণ সেন বিক্রমপুরেই মারা যান।

বখতিয়ার বাংলা জয় করে বাংলাকে দু’ভাগে বিভক্ত করে লক্ষ্মৌতীর বা গৌড়ে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। তার সময়ে পশ্চিমবঙ্গ দিল্লীর আফগান অধিপতিদের অধিকারে ছিল। পরবর্তীকালে এক বিশাল বাহিনী নিয়ে তিববত আক্রমণে ব্যর্থ হয়ে বখতিয়ারের বাহিনী রাজ্যলাভের আশায় বিপদসংকুল পথে পাড়ি দিয়ে কুচবিহারে উপস্থিত হন এবং যুদ্ধের ক্লান্তিতে শয্যাশায়ী হয়ে তার মৃত্যু ঘটে বলে জানা যায়।

১২৫৮ সালে ইখতার উদ্দিন তোগরল খাঁ লক্ষণাবতীর অধিপত্য দৃঢ় করে কামরূপ জয় করেন। তোগরল সুচতুর, সাহসী ও বুদ্ধিমান ছিলেন। ১২৭৯ সালে তিনি বাংলার স্বাধীন সুলতান ঘোষণা দিয়ে মঘিসউদ্দিন নামে পরিচিত হন। সম্রাট বলবন তোগরলের অবাধ্যতায় ও অন্যায় আচরণে ত্রুদ্ধ হয়ে অযোধ্যার শাসনকর্তা আসীন খাঁকে বঙ্গদেশের ক্ষমতা দিয়ে তোগরলের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। আমিন খাঁ তোগরলের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হন এবং তখন সম্রাট গিয়াসউদ্দিন বলবন স্বয়ং যুদ্ধে উপস্থিত হলে তোগরল কৌশলে বিক্রমপুর পালিয়ে যায়। তোগরল পলায়নের পর সুলতান সোনার গাঁয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। তখন কেশবসেনের পৌত্র রাজা দনৌজমাধব সেন সুবর্ন গ্রামের স্বাধীন রাজা ছিলেন। তিনি সম্রাটের সাথে ১২৮০ সালে সন্ধি করেন। সোনারগাঁও সে সময়ে পৈনাম নামে পরিচিত ছিল।

অবশেষে ১৩০০ সালে মুহাম্মদ তুঘলক পূর্ববঙ্গ স্থায়ীভাবে দখল করেন এবং সমসত্ম বঙ্গদেশকে লক্ষণাবতী, সাতগাঁ এবং ঢাকাসহ সোনারগাঁয়ে রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয়। সোনারগাঁও ধীরে ধীরে বিক্রমপুরের স্থান দখল করে।

অতঃপর বহরম খাঁ (১৩৩৫-১৩৩৮) সাল পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। তার মৃত্যুর পর ফকিরউদ্দিন আবুল মুজফফর মুবারক শাহ নাম ধারণ করে (১৩৩৮-১৩৪৯) সাল পর্যন্ত নিজেকে বাংলার স্বাধীন রাজা ঘোষণা করেন এবং শাসন পরিচালনা করেন। তখন প্রাচীন বাংলা বিভক্ত হয়ে পড়লে ১৩৫১ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এবং তার পুত্র সেকেন্দর শাহ পুনরায় পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ একত্র করেন। তথাপি সুবর্ণগ্রামের স্বাধীন রাজা আজমশাহের আমলে পূর্ববঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম প্রভৃতি অঞ্চল আরাকানের অধীনস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু ইলিয়াস শাহের বংশধর নাছিরউদ্দিন মুহম্মদ শাহ ১৪৪৫ সালে আবার উভয়বঙ্গ একত্রিত করেন এবং ১৪৮৭ সাল পর্যন্ত এই বংশ পূর্ববঙ্গে রাজত্ব করেন। ইলিয়াস শাহের আমলে বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামের এক ছোট ঘটনা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জাটিলতার সৃষ্টি করে ও ইলিয়াস শাহী বংশের ভবিষ্যতের উপর প্রভাব বিস্তার করে। দুগাঁচন্দ্র সান্যালের বাংলার সামাজিক ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ আছে সুলতান ইলিয়াস শাহ বিক্রপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে হঠাৎ এক সুন্দরী বিধবার দেখা পান এবং তাকে তার রাজপ্রাসাদে নিয়ে যান। হিন্দু অমাতার এতে আপত্তি জানালে সুলতান তাদের বলেন যে, হয় তাদের মধ্যে কেহ এই সুন্দরী বিধবাকে বিবাহ করবে অন্যথায় তিনি নিজেই তাকে বিয়ে করবেন।

অতঃপর বিদ্যোৎসাহী রাজা সৈয়দ হুসেন শাহ দেড়শত বচর যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করে বাংলার কাংক্ষিত গৌরব ফিরে আনেন। পাঠান অধিপতিদের মধ্যে হুসেন শাহই প্রজাদের উন্নতি বাংলা সাহিত্যের সৃজন এবং শিল্পের মুক্ত চর্চা অনুশীলনে বাংলার আত্মবিকাশের পথ তৈরী করেন। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মনের অধিকারী। তিনি চেয়েছিলেন বাংরঅর অধ্যুষিত হিন্দু ও মুসলমানের সমন্বয়ে একটি সংস্কৃতি চার্চকেন্দ্র।

সেই ধরণাকে ললন করেই নিরপেক্ষ শাসক হুসেন শাহ বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্য বিক্রমপুরের কায়স্থ পুরন্দর খাঁ, সনাতন গোস্বামী ও সুবুদ্ধি ভাদুড়ির মত জ্ঞানীদের তার রাজ কাজে নিয়োগ করেন। নবদ্বীপ থেকেও যখন বাংলার সামাজিক শ্রেনী বিন্যাস হ্রাস পেতে থাকে তখন ১৫০৬ সালে কলির দেবতা শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু গৌড় হতে বিক্রমপুরে উপস্থিত হন। চৈতন্য মহাপ্রভু নদী মেঘলা এলাকার পদ্মাচরে অবস্থান করেছিল। বৃন্দাবন দাস রচিত শ্রী চৈতন্য ভাগ্যবত এবং শ্রী শ্রী চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থে বলা হয়েছে।

‘‘এই মতে বিদ্যারস বৈকুন্ঠের পতি

বিদ্যারসে বিক্রমপুর করিলে স্থিতি ।।

অর্থাৎ তিনি পূর্ববঙ্গে প্রবেশ করে জ্ঞানের অমিয়ধারা বিতরণ করতে করতে বিক্রমপুরে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলেন।

মধ্যযুগের ব্রাহ্মণ্যবাদের সুকঠোর শ্রেণী বৈষম্য, কৃত্রিম জাতিভেদ, অস্পৃশ্যত্য ও ছোঁয়াছুয়ির অচলায়তন ভেঙ্গে সমস্তবাদী ধ্যানধারণকে মানবতন্ত্রী প্রেম ও ভালবাসার জাগরণে আন্দোলতি করে অবহেলিত ছোট জাতপাতের হাজার হাজার নরনারীকে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করে বাঙালীল ধর্মীয় ও সমাজ কাঠামোকে আধুনিক প্রগতিশীল চিন্তার বিকাশ ঘটান। তার অসংখ্য আউল-বাউলের প্রেম ও ভক্তিরসে আপ্লুত বৈষ্ণব গান একদিন বাংলার মাঠ-ঘাট-প্রান্তর মুখরিত করে তুলেছিল সেই কলির কৃষ্ণ শ্রী চৈতন্য গৌড়ের সকল মোহ পরিত্যাগ করে বিক্রমপুরে এসেছিল। বিক্রমপুরে তিনি দু’বছরের বেশি সময় অবস্থান করেন। তার উপস্থিতির কারণেই আমরা পরবর্তীকালে বিক্রমপুরে বহুসংখ্যক বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের উদ্ভব প্রত্যক্ষ করি। বিক্রমপুরের পন্ডিতগণ করজোড়ে তার কাছে এসে নিবেদন জানাতেনু

‘‘সবে এক নিবেদন করিয়ে তোমারে

বিদ্যাদানে কর কিছু আসা সভাকারে।

……………………………..

সাক্ষাতে শিষ্যকার আসা সভাকারে,

থাকুক তোমাদের কীর্তি সফল সংসারে’’

শ্রী চৈতন্য বিক্রমপুরে এসে যেমন খুশি হয়েছিল ঠিক তাপপেয়েও বিক্রমপুর ধন্য হয়েছিল। তার উপস্থিতিতে বিক্রমপুরের জাতিভেদ অনেকটা সিথিল হয়েছিল। সম্রাট আকবরের বাংলা বিজয়ের পূর্বে ১৫৩৮ সাল থেকে ১৫৭৬ সাল পর্যন্ত এই আটত্রিশ বছর বাংলায় আফগান রাজত্বের ইতিহাস।

সুলতানী আমলে তাজখানের ভাই সুলেমান খান করবানীর সময় রিকাবীবাজারে সুলেমান শাহী মসজিদ তৈরী করেন। সুলেমান করবানী ৯৭৬ হিজরী হতে ৯৮০ হিজরী বা ১৫৫৯ সাল পর্যন্ত বাংরা শাসন করেন। মসজিদের শিলালিপি মতে আমিন খাঁন ফকিরের পুত্র মালিক আবদুল্লাহ মিয়াই সুলেমান শাহ করবানী নামে পরিচিত। হয়রত আলী সুলেমানের রাজত্বকালে ৯৮০ হিজরী মোতাবেক ১৫৬৯ সালে এই মসজিদ নির্মান করেন। এই মসজিদটি সাধারণত কাজির মসজিদ নামে পরিচিত। এই অবদুল্লাহ মিয়াই বিক্রমপুরের কাজী এবং তার নামানূসারে আবদুল্লাপুর গ্রামের নামকরণ করা হয়। এছাড়া বিক্রমপুরে মুন্সীগঞ্জের কেওয়ার গ্রামে হযরত হোসেন শিকদাদ (রা:) এর মাজারে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়। আজ থেকে প্রায় ৮০০ বছর পূর্বে এই ধর্মপ্রাণ সাধক পুরুষ ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য সুদূর বাগদাদ থেকে বিক্রমপুরের কেওয়ার গ্রামে আসেন। বর্তমানে তা শিকদাদ সাহেবের মাজার নামে পরিচিত। পাঠান রাজত্বের সময় বিক্রমপুরে অর্থের ব্যবহারের পরিবর্তে ব্যসা বাণিজ্যে কড়িই বিনিময় মুদ্রা ছিল। ধান চাউলে বাণিজ্য সামগ্রী ছিল। শিক্ষার জন্য তখন এলাকায় আরবী, ফার্সী শব্দের প্রচলন ছিল। তবে প্রজা সাধরণ বাংলা ভাষায় মত বিনিময় করত।

সুলেমান করবানীর মৃত্যুর পর মোগল সম্রাট আকবর তার সেনাপতি মুনিম খান ও রাজা তোড়লমলকে বাংলা বিজয়ের জন্য প্রেরণ করেন এবং সেই সাথেই বিক্রমপুরে আফাগান শাসন অস্তমিত হয় এবং মোগল শাসনের রনতুর্য বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয়। সভ্যতার আরও একটি মেরুকরণ সংযোজিত হয়।

মোগল সভ্যতা ও বাঙালী চাঁদরায় কেদাররায়ের বিদ্রোহ

গৌতম ব্যানার্জী : মোগলদের আবির্ভাবের সাথে সাথে ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৫২৬ খৃষ্টাব্দে পানিপথের যুদ্ধক্ষেত্রে বাবরের বিজয়ের ফলে ভারতে মোগল শাসনের বিজয়ের ফলে ভারতে মোগল শাসনের গোড়া পত্তন হয়। কিন্তু ১৫২৬ খৃষ্টাব্দের পানি পথের দ্বিতীয় যুদ্ধ পর্যন্ত ত্রিশ বছর কাল ভারতের ইতিহাস প্রধানত আফগান মোগল সংঘর্ষের ইতিহাস।

ভারতে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলায় তখনও মোগল শাসনের সূর্য উদয় হয়নি। তখন বাংলায় শেরশাহী বংশের অভ্যুদ্বয় ঘটে। এই বংশ ১৫৩৯ তেকে ১৫৬৪ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা শাসন করে। শেরশাহী বংশের অবসানে বাংলায় কররানী বংশের অভ্যুদয় ঘটে। তারা ১৫৬৪ খৃষ্টাব্দ থেকে ১৫৭৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা শাসন করে। অতঃপর মোগল সম্রাট আকবর ১৫৭৬ খৃষ্টাব্দে বাংলা জয় করেন।

মোগল শাসকরা বাংলা দখল করে বাংলা শাসন পরিচালনা করার জন্য তখন এক একজন সুবেদার বা শাসন কর্তা নিয়োগ করেন। ১৫৮৯ খৃষ্টাব্দে রাজা মানসিংহ বাংলার ষষ্ঠ সুবেদার হিসেবে শাসনভার গ্রহণ করেন। তার সময়ে রাজমহলে বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার রাজধানী স্থাপিত হয়। মানসিংহের বাংলা শাসনভার গ্রহণ করার পূর্ব থেকেই বিহার ও উড়িষ্যার আফগান বিদ্রোহীরা বিভিন্নভাবে উৎপাত শুরু করে। সে সময়ে ধীরে ধীরে বাংলায় বিভিন্ন অংশে ভৌমিক বা ভূইয়াগণ স্বাধীনতা লাভের চেষ্টা চালায়। ভারত বা প্রাচীন বাংলায় দীর্ঘকাল বিভিন্ন সভ্যতার শাসনামলে বিভিন্ন সংস্কৃতির ঐক্যসমন্বয়ে বাঙালী জনগোষ্ঠী একটি স্বাধীন রাষ্ট্রগঠনের জাতীয়তাবোধ অনুভব করে। সেই জাতীয়তাবোধ থেকেই বাঙালী বার ভূইয়ারা মোগল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে থাকে। এই প্রতিবাদের ইচ্ছা থেকেই সংস্কৃতির নৃতাত্ত্বিক চেতানায় তাদের রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তির পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে এ সমুদয় ভৌমিকগণের অভহ্যদয় ঘটে এবং সেলিম বা জাহাঙ্গীর বাদশাহের শাসনামলে তারা পরাজিত হন।

পরবর্তীতে মোগল সম্রাট কর্তৃক নির্বাচিত শাসনকর্তারাই বাংলা শাসন করতে থাকেন। পলাশীর প্রন্তরে শাসন করতে থাকেন। পলাশীর প্রান্তরে বাংলা তখা ভারতের স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হবার পূর্ব পর্যন্ত এই ব্যবস্থাই অব্যাহত ছিল। মোগলদের শাসন ব্যবস্থা প্রধানতঃ আকবরেরই রচনা। এই সম্পর্কে এডওয়ার্ডস ও গ্যারেট মন্তব্য করেছেন ‘আধুনিক মোগল শ্রেষ্ঠ আকবরের শাসন প্রতিভার নিকট বাহ্যিকভাবে যতটা প্রতীয়মান হয় তার চেয়ে বেশি ঋণ।’ বাবর ও হুমায়ুন নব প্রতিষ্ঠিত সামাজ্যের বহুবিধি সমস্যায় ব্যাস্ত ছিলেন বলে তাদের কেহই শাসন ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দিতে পারেনি। ভারতয়ি ও বৈদেশিক মাসন ব্যবস্থার সমন্বয়ে মোগল শাসন ব্যবস্থা রচিত হয়েছিল। মোগল অধিপতিরা সম্ভবতঃ এশিয়ার বাসিন্দা। মোগল সভ্যতার বিজয় তোরণ যেমন ভারত তথা বাংলার জনসাধারণ স্মরণ করে তরুণ মেগল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিক্রমপুর থেকে প্রতিবাদের ঝড়ও বাঙালী জাতি তার আত্ম বিকাশের প্রথম ভিত্তি হিসেবে শ্রদ্ধা জানায়।

মোগল সাম্রজ্যের শাসন আমলে বাংলাকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে তদ্রুপ সাম্রাজ্য বিস্তারের নামে মগ, ফিরিঙ্গী ও জলদস্যুরা বাংলার সম্পদ লুন্ঠন করেছে। বিক্রমপুর সেই লুন্ঠনের হাত থেকে রেহাই পায়নি। জলদস্যুরা তার হাজার বছররের শ্রমসিক্ত শিল্প-ভাস্কর্যের উপরও নগ্ন থাবা দিয়েছে। বিক্রমপুর মোগল সাম্রাজ্যের যেমন ইতিহাস সমহিসায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ঠিক বিপরীতভাবে বাংলার শেষ নবাব সিরজাদৌল্লার হত্যাকান্ডের সাথে রাজা রাজবল্লভের জড়িত থাকার ঘটনা বিক্রমপুর বাসীর আত্মসচেতনতার পথে কালিমা লেপন করেছে।

মোগল সাম্রাজ্যের শাসনামলে সম্রাট শাহজাহা বিক্রমপুরে এসে যেমন ধন্য হয়েছেন বিক্রমপুরবাসীও তার পদার্পণে গৌরববোধ করেছে। বাংলার মোগল সাম্রাজ্যের বিশাল শাসনামলের পটভূমিকার ইতিহাস বিক্রমপুর চোখ নিবন্ধে দু’পূর্ব আলোচিত হবে। নতুন প্রজন্মদের এগিয়ে আসতে হবে। গৌরবদীপ্ত বাঙ্গালীর ইতিহাস নির্মাণে। মধ্যযুগের হীনমন্যতার চিন্তা পরিহার করে আমাদের ইলেকটো মাইক্রো আধুনিক সাম্রাজ্য ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

বিক্রমপুরের দুঃসহোদর চাঁদরায় কেদাররায় বাংলায় মোগল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সেই বিদ্রোহর দৃঢ়তাই বাঙ্গালীর আত্মচেতনার চির গৌরবময় ইতিহাস। সেই প্রতিবাদের অগ্নিস্ফহলিঙ্গ ভারত তথা প্রাচীন বাংলায় বাঙ্গালীর রাজনৈতিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছিল। মধ্যযুগে সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থায় শাসকগোষ্ঠীর অভুদ্যয় হলেও দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় তারা ছিল আপোষহীন। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, ভহমি বন্দোবস্ত, শিল্প ব্যবসা ও ধর্মীয় অনুভহতির কারণে শ্রেণীগত বৈষম্য সৃষ্টি হলেও বাংলার স্বাধীনতা সূর্য রুখতে শ্রেনী সমন্বয়ের চিন্তা ছিল এক ও অভিন্ন। শ্রেণী সমন্বয়ের এক ও একাধিক চিন্তা থেকে বাঙ্গালী অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক দীর্ঘতম চর্চার পথই শোষক-শোষিতের চরিত্রে জাতীয়তার ভিত্তি রচিত হয়। তাই মোগল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলার রাজ, কৃষক ও মেহনতি জনতার সুসংগঠিত বিদ্রোহর বহিশিখাই আমাদের জাতীয় ইতিহাস।

১৫৭৬ সালে মেদিনীপুর ও বালেশ্বরের মধ্যবর্তী মোগলমারি স্থানে মোগল পাঠানের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দাউদ খান পরাজিত হলে বাংলায় পাঠান রবি অস্তমিত হয় এবং মোগল শাসন বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে আকবর শাহের শাসনামলে বাঙলায় ভৌমিক বা ভহইয়াদের অভহ্যদয় ঘটে। সেই বার ভহইয়ার প্রাদেশিক শাসন কর্তাদের উৎপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে সমগ্র বাংলায় বিদ্রোহ করে। বার ভহইয়াদের মধ্যে বমোহরের প্রতাপাদিত্য, খিজিরপুরের ঈশা খাঁ ও বিক্রমপুরের অন্তর্গত শ্রীপুরের কেদাররায় চাঁদরায় মোগলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বাংলার ইতিহাস। সম্রাট আকবর ১৫৮০ খৃষ্টাব্দে রাজা টোডরমল্লকে বাংলার শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। রাজা টোডরমল্ল সমগ্র বাংলাকে ১৯ সরকার ও ৬৮ টি পরগনায় বিভক্ত করেন। বিক্রমপুর সোনার গাঁয়ের একটি পরগণা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তখন মেঘনা নদীর পূর্ব তীরব্যাপী শীলহাটের দক্ষিণ ও ত্রিপুরার পশ্চিমসীমা পর্যন্ত সোনারগাঁও বিস্তৃত ছিল।

ঐতিহাসিকদের ধারণা, কেদাররায় চাঁদরায় আদি পুরুষ নিমরায় কর্ণাট থেকে এসে বিক্রমপুরস্থ আড়ফুলবাড়িয়া নামক গ্রামে বসবাস করতেন। এই নিমরায়ের বংশেই দু’সহোদর বিপ্লবী জন্মগ্রহণ করেন। খিজিরপুরের ঈশা খাঁর সাথে এই রাজবংশের বন্ধুত্ব ছিল। সোনারগাঁয়ের ভুভাগ ষোষণা দিলেও চাঁদরায় কোদাররায় মোগলদের শাসন শৃংখল ছিন্ন করে বিক্রমপুরস্থ পদা তীরবর্তী শ্রীপুর স্বাধীন রাজা হিসেবে রাজ কাজ পরিচালনা ব্যাপ্ত থাকেন। ফলে বীরশ্রেষ্ঠ কেদাররায় তিন তিনবার মোগল বাহিনীর সাথে মাতৃভহমির স্বাধীনতা রক্ষার্থে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং বাঙ্গালীর শৌর্য-বীর্য ইতিহাসে প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রথমবারের যুদ্ধে কেদাররায় মানসিংহের সেনাপতি মন্দারায়কে পরাজিত ও নিহত করেন। দ্বিতীয়বার মানসিংহ স্বয়ং বিক্রমপুরে সৈন্য নিয়ে উপস্থিত হন এবং কেদারের অদ্ভহত রণকৌশলে মুগ্ধ হয়ে কেদাররায়কেই বিক্রমপুরের অধিপতি প্রতিষ্ঠিত করে চলে যান। অতঃপর কেদাররায় মোগল কর্তৃক সন্দ্বীপ পুনরুদ্ধারের জন্য কৃতসংকল্প হয়ে উঠেন। সন্দ্বীপের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাঙ্গালী, মগ ও ফিরিঙ্গীদের মধ্যে ঘোরতর যুদ্ধ হয় এবং সে যুদ্ধও বাঙ্গালীদের ইতিহাসকে বলিষ্ঠ করে তুলে। ১৬২০ খৃষ্টাব্দে কেদাররায় কার্ভালিয়ন এবং মার্টিন নামক ফিরিঙ্গীর সহায়তায় নৌযুদ্ধে মোগলদের পরাজিত করে সন্দ্বীপ উদ্ধার করেন এবং আরাকান রাজকে দু’বার পরাজিত করেন। কিন্তু পরিশেষে যুদ্ধে জয়লাভ করেও সন্দ্বীপ আরাকান রাজ্যের দখলে চলে যায়। এদিকে খিজিরপুরের ঈশা খাঁর সাথে কেদার রায়ের মতবিরোধ ঘটে। কথিত আছে ঈশা খাঁর শ্রীপুরে আতিথ্য গ্রহণের সময় কেদাররায় লাবণ্যবতী বিধবা যুবতী বোন সোনামণির রূপ দেখে বিমোহিত হয়ে পড়ে এবং তাকে পাবার প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করে। ঈশা খাঁ খিরিজপুরে পৌঁছে দূত মারফত কেদারের কাছে তার বোনকে বিয়ে কারার প্রস্তাব দেন। এতে কেদাররায় ঈশা খাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে খিজিরপুরে রওনা হয় এবং যুদ্ধে ঈশা খাঁর নগরী বিধ্বসত্ম করে কিন্তু কেদারের আমলা শ্রীমমত্ম খাঁ কৌশলে সোনামনিকে খিজিরপুরে ঈশা খাঁর হাতে অর্পণ করেন। চাঁদরায় বোনের কথা শোনে শয্যাশায়ী হয়ে মারা যায়।

মহারাজা মানসিংহ বাংলায় এসে যশোরের প্রাতাপদিত্যের সাথে জামাতা চন্দ্রদীপের রাজা রামচন্দ্রের, রামচন্দ্রের সাথে ভুলুয়ার লক্ষণ মানিক্যের, বিক্রমপুরাধিপতি কেদারের সাথে খিজিরপুরের ঈশা খাঁর দ্বন্দ্ব বিরোধ অবহিত হন। এই দ্বন্দ্ব বিরোধের দুর্বলতা এবং বিশ্বাসঘাতক ভবানন্দ মজুমদার ও শ্রীমন্ত খাঁর সহায়তায় বার ভহইয়াদের স্বাধীনতা মোগলদের হাতে তুলে দিল। অপরদিকে বাংলার স্বাধীনতা রুখতে মানসিংহের সাথে বিসর্জন দেয় মধুরায়। কিন্তু দুই মহাপুরুষ স্বাধীনতা রুখতে মানসিংহের সাথে যুদ্ধের আহববান জানায়। তারা মানসিংহের আধিপত্য স্বীকারে অস্বীকৃতি জানায়। প্রতাপের স্বাধীনতা ঘোষণার অব্যবহিত পরেই পদ্মার তটস্থিত বিক্রমপুরের রাজধানী কেদার রায়ের প্রিয়তম শ্রীপুর দুর্গ থেকে গৌরবের সাথে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়।

মেঘনার উপকূলে কেদারের সাথে মোগলের নৌযুদ্ধের পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে মানসিংহ বিরাট সৈন্যবাহিনী বিক্রমপুরের শ্রীপুরে পাঠায়। ১৬০৬ সালে প্রতাপাধিত্যকে পরাজিত করেন। প্রতাপের পরে মুকুন্দরায়ের রাজধানী ভহষণা নগরী বিধ্বস্ত ও হস্তগত করে মোগল বাহিনী বিক্রমপুরে পৌছেঁ। মানসিংহ শ্রীপুরে সৈন্য শিবির স্থাপন করে কেদাররায়ের কাছে দূত মারফত তরবারি, শৃখল ও একটি চিঠি প্রেরণ করেন।

চিঠিতে লেখা ছিল …

‘‘ত্রিপুর মঘ বাঙ্গালী কাককুলী চাকালী, সকল পুরুষ মেতৎ ভাগি যাও পালায়ী, হয় গজ নর নৌকা কম্পিত বঙ্গভহমি

বিষম-সমর হিংহো মানসিংহং

প্রযাতি।’’

কেদার রায় মানসিংহের মনোভাব বুঝে তরবারিখানা গ্রহণ করেন এবং শৃখংল ফেরত দিয়ে দূতের কাছে পত্রত্তোর লিখে পাঠান –

‘‘ভিনত্তি নিত্যং কবিরাজ কুম্ভং
বিভর্ত্তি বেগং পবনাতিরেকং।
করোতি বাসং গিরিরাজ শৃঙ্গে
তথাপি সিংহং পশুর নান্যঃ । ।’’

মানসিংহ কেদাররায়ের কাছ থেকে এই রকম পত্রের উত্তর পেয়ে তৎক্ষণাৎ শ্রীপুর নগরী অবরোধ করবার জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন। সেই যুদ্ধে কেদাররায় ৫ শত রণতীর নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কেদাররায় একটানা নয়দিন যুদ্ধ করে মোগল বাহিনীর নিকট আহত ও বন্দী হন। অতঃপর মানসিংহের কাছে তার অবসন্ন রক্তাক্ত দেহ পৌছাঁনোর অব্যবহতি পরই বাঙ্গালীর কাংক্ষিত অগ্নি পুরুষ কেদাররায়ের মৃত্যু ঘটে। অবশেষে বাংলার স্বাধীনতা মোগল অধিপতিদের দখলে চলে যায়।

যুদ্ধ জয়ের পর মানসিংহ কেদাররায়ের গৃহ অধিপতি শিলামাতাকে জয়পুরে নিয়ে যান। সেই শিলামাতা অদ্যবধি জয়পুর রাজ্যের প্রাচীন অম্বর নগরী প্রতিষ্ঠিত আছে। মানসিংহ কেদাররায়ের এক কন্যাকে বিয়ে করেন। বীরেন্দ্র মধুরায় এই যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করেন। মধুরায়ের বীরত্বের জন্য মুকুটরায় নামে পরিচিত। বিক্রমপুরে আজও মধুমুকুটরায়ের স্মৃতিচিন্হ বিরাজমান। মুকুটরায়ের যে স্থানে নিজস্ব বাসভবন (রাজধানী) নির্মাণ করেন তা এখনও মুকুটপুর নামে খ্যাতি রায়।

চাঁদরায় কেদাররায়ের শাসনামলে বিক্রমপুরের বহু উন্নতি সাধিত হয়। তারা ‘দে’ উপাধিধারী বঙ্গক্ত কায়স্থ ছিল। তারা কুলীন না হয়েও বিক্রমপুরে রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত ছিল। রায় রাজাগণের সময় বহু ব্রাক্ষণ, বৈদ্য ও কুলীন কায়স্থ বিক্রমপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। মালখানাগরের বসু পরিবার, শ্রীনগরের গুহ এবং কাঠালিয়ার দত্তগণ ঐ সময় এসে বসবায় করে।

বিক্রমপুরের দক্ষিণ পূর্বে চাঁদরায় কেদাররায়ের রাজধানী শ্রীপুর অবস্থিত ছিল। পরে পদ্মায় ভেঙে যায় এবং বাকী অংশ রাজাবাড়ী নামে পরিচয় লাভ করে। পরে রাজবাড়ীর মঠও তলিয়ে যায়। কেদাররায় বিক্রমপুর ও কার্তিকপুর এই উভয় পরগণার মধ্যস্থলে একটি বৃহৎ বাড়ী নির্মাণ করার জন্য ইট, সুরকী সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু অট্টালিকার মূলভিত্তি স্থাপন করা হলেও উহার কাজ শেষ করে যেতে পারেনি। তখন থেকেই প্রজাসাধারণ ঐ স্থানকে কেদারপুর বা কেদারবাড়ী বলে পরিচয় দিত।

পূর্বে বিক্রমপুরের মধ্যদিয়ে কালীগঙ্গা নদীর স্রোত প্রবাহিত ছিল। তখ কালীগঙ্গা বিক্রমপুরের নানাস্থানে নানা নামে অভিহিত হত। কোথাও কাথারিয়া কোথাও বা কালীগঙ্গা নামে ডাকা হত। এই কালী গঙ্গার তটদেশেই চাঁদরায় ও কেদারারায় ঐশ্বর্যশালী শ্রীপুর নগরী অবস্থিত ছিল। কোটীশ্বর নামক পল্লীতে তখন অসংখ্য সুন্দর সুন্দর দেবমন্দির শোভা পেত এবং সুউচ্চ সবুজ বৃক্ষ দাঁড়িয়ে রাজকীয় অনুভহতির পরিচয় বহন করতো। এই কোটীশ্বর পল্লীতেই দশমহাবিদ্যা এবং সুবর্ণনির্মিত দশভুক্তা দুর্গা মূর্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। আজ আর সেই স্বর্ণময়ী শ্রীপুর নগরীর অসিত্মত্ব টিকে নেই। কেদাররায় ও চাঁদরায়ের অমরকীর্তি ধ্বংস করেই পদ্মা কালিগঙ্গা নামে পরিচয় লাভ করেছে। ভট্ট কবিরা শত বছর আগেও পূজা পার্বণে গান করত

‘‘চাঁদ কেদাররায়ের কীর্ত্তি চমৎকার
ভেঙ্গে নিল কোটীশ্বর,
গোবিন্দ মঙ্গল, সোনার দেউল
খাকুটিয়ালি গ্রাম বহুতর।’’

বিক্রমপুরে কেদারায়ের ‘‘কাচকীর দরজা’’ জনসাধারণের কল্যাণে নির্মাণ করা হয়। ইদিলপুরের বুড়ীর হাট থেকে আরাম্ভ করে এই রাস্তাটি বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ধলেশ্বরীর নদীর তট পর্যন্ত বিস্তৃত। রাজবাড়ীর এই মাইল উত্তরে প্রায় আধা মাইল দীর্ঘ ও পোয়ামাইল প্রশস্ত কেশার মার দীঘি অবস্থিত। বিক্রমপুর অঞ্চলে কেশার মার দীঘি সম্পর্কে একটি জনশ্রুতি থেকে জানা যায় – রাজা কেদাররায় প্রজাসাধারণের কল্যাণে উক্ত দীঘি খননকালে পানি উথিত না হলে সবাই অবাক ও হতবিহবল হয়ে পড়েন। ঐ দিনই রাতে কেদার স্বপ্নে নির্দেশ পেলেন যে তার ধাত্রীমাতার গর্ভপ্রসূত পুত্র কেশা দীঘির মাঝপথ দিয়ে অশ্বারোহেণ করলে দীঘির চারদিক থেকে পানি ধারা বেরুতে থাকে ফলে কেশা পানিতে ডুবে মারা যায়। কেশার মা পুত্রের শোচনীয় মৃত্যু সংবাদ পেয়ে শোকবিহবল চিত্তে কেশা কেশা চিৎকার করে সেই দীঘির প্রবল ধারায় ঝাঁপিয়ে পড়ে মারা যায়। পুত্র ও মায়ের এই মর্মান্তিক আত্মবির্সজনের ঘটনায় প্রজাকুল বিস্মৃত হয়ে এই দীঘির নামকরণ করেন কেশার মার দীঘি।

কেদাররায়ের চাঁদরায়ের পরাজয়ের পর বিক্রমপুর মোগলদের দখলে চলে যায়। তখন থেকেই বিক্রমপুরে মগদস্যুদের বর্বরতা বেড়ে চলে।

লেখক, গৌতম ব্যানার্জী। দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ কৃষকলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি। এ প্রতিবেদনটি অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায় ১৯৯৩ সালের ২৮ মে থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। জনাব, গৌতম ব্যানার্জী মুন্সীগঞ্জ জেলার প্রথম অনলাইন পত্রিকা ‘মুন্সীগঞ্জ নিউজ ডটকম’ এ প্রতিবেদনটি পুন:প্রকাশের অনুমতি প্রদান করায় মুন্সীগঞ্জ নিউজ ডটকম পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে অভিবাদন জানাই।

=================================================

কালের সাক্ষী বিক্রমপুর-মুন্সীগঞ্জ

লিয়াকত হোসেন খোকন
মুন্সীগঞ্জ জেলার চারদিকে নদী বেষ্টিত। এই জেলার দক্ষিণে পদ্মা নদী, পূর্বে মেঘনা নদী এবং উত্তরে ধলেশ্বরী নদী। মুন্সীগঞ্জ জেলার নামকরণে বিভিন্ন জনশ্রুতি রয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইদ্রাকপুর কেল্লার ফৌজদারের নামানুসারে এই জায়গার নাম ছিল ‘ইদ্রাকপুর’। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় রামপালের কাজী কসবা গ্রামের মুন্সী এনায়েত আলী সাহেবের জমিদারীভুক্ত হওয়ার পর ইদ্রাকপুর মুন্সীগঞ্জ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে।

নদীবিধৌত মুন্সীগঞ্জের উর্বর মাটিতে অসংখ্য কৃতী সন্তানের জন্ম হয়েছে। এরা হলেন- বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, অতীশ দীপংকর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, গণিতবিশারদ অধ্যাপক রাজকুমার সেন, লেখক ও ভাষাবিদ হুমায়ুন আজাদ, ঔপন্যাসিক শীর্ষন্দু মুখোপাধ্যায়, বাংলার সিংহ পুরুষ চাঁদ, ইংলিশ চ্যানেল বিজয়ী ব্রজেন দাস প্রমুখ।

মুন্সীগঞ্জ এখনও বিক্রমপুর নামে সমধিক খ্যাত। এক সময় এক বিরাট এলাকা নিয়ে গঠিত ছিল বিক্রমপুর। সম্রাট বিক্রমাদিত্যের নাম থেকে বিক্রমপুর নাম হয়েছিল বলে লোকমুখে শোনা যায়। আবার কেউবা বলেন, দ্বিতীয় পাল রাজা ধর্মপালের উপাধি ছিল বিক্রমাদিত্য এবং তা থেকেই এ স্থানের নাম হয় বিক্রমপুর।

চন্দ্রসেন পালদের আমলে বাংলার রাজধানী ছিলো রামপালে। এরই সংলগ্ন মুন্সীগঞ্জ। এখানে রয়েছে ইদ্রাকপুর দুর্গ, বাবা আদমের মসজিদ, কাজী কসবার মসজিদ, মীর কাদিম সেতু ইত্যাদি। মুন্সীগঞ্জ আর রামপালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কসবা নয়নাভিরাম। সর্বত্রই যেন সবুজে ঢাকা। কাজী গ্রামে গেলে দেখা যায়- একটি প্রাচীন মসজিদ। এরই নাম কাজী কসবার মসজিদ। এটি পনেরো শতকে নির্মিত হয়েছিল।

বিক্রমপুর এক সুপরিচিত ঐতিহ্যমন্ডিত এলাকা, এখনও অনেকে বিক্রমপুরকে নিয়ে গর্ব করেন। বিক্রমপুরের প্রতœতাত্বিক ঐতিহ্যের সাথে জড়িত স্থানসমূহের মধ্যে বাবা আদমের মসজিদ, অতীশ দীপংকরের স্মৃতিস্তম্ভ, ইদ্রাকপুর দুর্গ, হরিশ্চন্দ্রের দীঘি, সোনার মন্দির, পাটপাড়া সতীদাহ মন্দির, রিকাবী বাজারের মসজিদ, বল্লাল সেনের দীঘি, কোদালধোয়া দীঘি উল্লেখযোগ্য।

রাজা হরিশ্চন্দ্রের দীঘি ছাড়াও বিক্রমপুরে ছড়িয়ে আছে আরও অনেক দীঘি। এগুলোর মধ্যে রামায়ণ দীঘি, রামদহ দীঘি, সুখবাসুদের দীঘি, মঘাদীঘি, টঙ্গিবাড়ি দীঘি, ভবগান রায়ের দীঘি, শানের দীঘি, বিশ্বেশ্বর দীঘি, সাগর দীঘি অন্যতম। বিক্রমপুরে আরও রয়েছে- সুখবাসর বাগানবাড়ি, পাটশাহীর পোড়া মঠ, মাকাস পুল, কমলাঘাটের পরিত্যক্ত লোহারপুল, শ্যাম সিদ্ধির মঠ, গোশাল নগরে পালের বাড়ি, ব্রজেন দাসের বাড়ি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি প্রভৃতি।

বর্মনদের রাজধানী ছিল এই বিক্রমপুরে। পালদের প্রাদেশিক রাজধানীও ছিল এখানে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী অতীশ দীপংকর ৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে মুন্সীগঞ্জ জেলার তথা বিক্রমপুর পরগনার ব্রজযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার স্মৃতিকে চিরঞ্জীব করে রাখার জন্য ব্রজযোগিনী গ্রামে তার ভিটায় স্থাপিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। সে সময় প্রখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত অবধূত জেতারির কাছ থেকে তিনি অংক ও ব্যাকরণ শাস্ত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এক সময় তিনি চীনে যান। চীনে গিয়ে তিনি যে বিদ্যান ব্যক্তি তা প্রমাণ করেন। সে জন্য চীন সম্রাট অতীশ দীপংকরের পাণ্ডিত্য ও বিজ্ঞতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে ‘অতীব শ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। অতীশ দীপংকর রচিত বহু মূল্যবান গ্রন্থ ইতালির টুপি ও পণ্ডিত হরপ্রসাদ আবিষ্কার করেন।

বিক্রমপুরের আরেক কৃতী সন্তান হলেন জগদীশ চন্দ্র বসু। বিশ্বে স্বীকৃতি অর্জনকারী প্রথম সফল বিজ্ঞানী হলেন তিনি। জগদীশ চন্দ্র বেতার বার্তার পথদ্রষ্টা ও উদ্ভিদের যে প্রাণ আছে তা তিনি প্রথম প্রমাণ করে গেছেন। তার পৈত্রিক আদি নিবাস বিক্রমপুরের শ্রীনগর থানার রাঢ়িখাল গ্রামে। এই গ্রামে তার বাড়িটি এখন স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু স্মৃতি জাদুঘর হিসাবে সংরক্ষিত হয়েছে। এ জাদুঘরে রয়েছে ১৭টি দুর্লভ ছবি, জগদীশ চন্দ্র বসুর ওপর উক্তি করা লেখা ও চিঠি। জাদুঘরের ভেতরে শোকেসগুলোর মধ্যে তার স্মৃতি বিজড়িত কিছু ব্যবহৃত বাসনপত্র রয়েছে।

মুন্সীগঞ্জের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন ইন্দ্রাকপুর দুর্গ। জলদস্যু ও পর্তুগীজদের আক্রমণ থেকে বাংলার রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ সমগ্র এলাকাকে রক্ষা করার জন্য এই দুর্গ নির্মিত হয়। বাংলার সুবেদার ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে মেঘনা, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীর সংগমস্থলের পশ্চিম তীরে ইন্দ্রাকপুর নামক স্থানে দুর্গটি নির্মাণ করেন। এটি মোঘল স্থাপত্যের অনন্য সাক্ষী। সুউচ্চ প্রাচীর বিশিষ্ট ইন্দ্রাকপুর দুর্গের প্রতিটি কোণায় রয়েছে একটি বৃত্তাকার বেষ্টনী। দুর্গের মাঝে মূল দুর্গ ড্রামের মতো দেখতে। এখানে দুর্গের মধ্যে শাপলা ফুলের পাপড়ির মতো কিছু ছিদ্র রয়েছে। এক সময় এই ছিদ্র দিয়ে শত্রুকে মোকাবিলা করার জন্য বন্দুক নিয়ে সৈন্যরা পাহরা দিতো। মূল প্রাচীরের পূর্ব দেয়ালের মাঝামাঝি অংশে একটি গোলাকার উঁচু মঞ্চ রয়েছে। দূর থেকে শত্রু চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল। একটি সুড়ঙ্গ রয়েছে এখানে। জানা যায়, এই সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢাকার লালবাগের দুর্গে যাওয়া যেতো। সৈন্যরা তাই করতো-মাঝে মধ্যে এই দুর্গ থেকে লালবাগ দুর্গে তারা চলে যেতেন। সেই কাহিনী এখন শুধুই ধূসর স্মৃতি ছাড়া কিছুই নয়।
—————————————

ঐতিহ্যের লীলাভূমি বিক্রমপুর

রাজীব পাল রনী
এক সময় ছিল ঢাকার দক্ষিণ থেকে বরিশালের উত্তর পর্যন্ত। পশ্চিমে পদ্মা থেকে মেঘনা, বহ্মপুত্র জলরাশি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। গুপ্তবংশ, চন্দ্রবংশ, বর্মবংশ, পালবংশ ও সেন বংশীয় পর্যায়ক্রমে রাজাদের রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে বিক্রমপুর নানা কারণে বিখ্যাত। বর্তমানে এ অঞ্চলটি মুন্সীগঞ্জ হিসেবে পরিচিত। এ জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে অনেক প্রাচীন নিদর্শন। বাংলার প্রাচীন রাজধানী বিক্রমপুরের সেই জৌলুস এখন তেমন আর নেই। কিন্তু ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এখনও প্রাচীন বিক্রমপুরের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই ঐতিহ্যের লীলাভূমি বিক্রমপুর শীতের এই ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন।

ইদ্রাকপুর দুর্গ : মুন্সীগঞ্জ শহরের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন ইদ্রাকপুর দুর্গ। জলদস্যু ও পর্তুগিজদের আক্রমণ থেকে বাংলার রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ সমগ্র এলাকাকে রক্ষা করার জন্য এই দুর্গ নির্মিত হয়। বাংলার সুবেদার ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার মেঘনা, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গমস্থলের পশ্চিম তীরে ইদ্রাকপুর নামক স্থানে দুর্গটি নির্মাণ করেন। এটি মোগল স্থাপত্যের অনন্য সাক্ষী। সুউচ্চ প্রাচীর বিশিষ্ট এই দুর্গের প্রতিটি কোনায় রয়েছে একটি বৃত্তাকার বেষ্টনী। দুর্গের মাঝে মূল দুর্গ ড্রামের মতো দেখতে। দুর্গের প্রাচীর শাপলা ফুলের পাপড়ির মতো ছড়িয়ে আছে ও প্রতিটি পাপড়িতে ছিদ্র রয়েছে। ছিদ্র দিয়ে শত্রুকে মোকাবিলা করার জন্য বন্দুক ও কামান ব্যবহার হতো। মূল প্রাচীরের পূর্ব দেয়ালের মাঝামাঝি অংশে ৩৩ মিটার ব্যাসের একটি গোলাকার উঁচু মঞ্চ রয়েছে, দূর থেকে শত্রু চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে। দুর্গের উত্তরদিকে প্রাচীর মূল বিশালাকার প্রবেশপথ রয়েছে। এই দুর্গের প্রবেশপথের পাশেই একটি সুড়ঙ্গ পথ রয়েছে। কথিত আছে, এই সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে ঢাকা লালবাগের দুর্গে যাওয়া যেত।

অতীশ দীপঙ্কর স্মৃতিস্তম্ভ : সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী অতীশ দীপঙ্কর ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে মুন্সীগঞ্জ জেলার তথা বিক্রমপুর পরগনার বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার স্মৃতিকে চিরঞ্জীব করে রাখার জন্য বজ্রযোগিনী গ্রামে তার ভিটায় স্থাপিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। সে সময় প্রখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত অবধূত জেতারির কাছ থেকে ব্যাকরণ ও অংক শাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। চীন সম্রাট দীপঙ্করের পাণ্ডিত্য ও বিজ্ঞতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে ‘অতীশ শ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তার রচিত বহু মূল্যবান গ্রন্থ ইতালির টুচি ও পণ্ডিত হরপ্রসাদ আবিষ্কার করেন। স্তম্ভটি দেখতে যেতে হলে মুন্সীগঞ্জ থেকে স্কুটারে অথবা রিকশায় যাওয়া যায়। মুন্সীগঞ্জ শহর থেকে বজ্রযোগিনী ৪ কিলোমিটার।

জগদীশ চন্দ্র বসু স্মৃতি জাদুঘর : বাংলাদেশের কৃতী সন্তান এবং বিশ্বে স্বীকৃতি অর্জনকারী প্রথম সফল বিজ্ঞানী হলেন স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। তিনি বেতার বার্তার পথদ্রষ্টা ও উদ্ভিদের যে প্রাণ আছে তিনি প্রথম প্রমাণ করেন। পৈতৃক আদি নিবাস বিক্রমপুরের শ্রীনগর থানার ঢ়াঢ়িখাল গ্রামে যা কিনা মুন্সীগঞ্জ শহর থেকে যেতে সময় লাগে ৫০ মিনিট। বিশ্ববরেণ্য এ বিজ্ঞানীর মৃত্যুর পর পৈতৃক বাড়িটি স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। এই বাড়ির মধ্যে রয়েছে ৬টি পুকুর। এছাড়া তার মধ্যে ১৯২১ সালে স্কুল ও পরে ১৯৯১ সালে কলেজ স্থাপন করা হয়। ৬ কক্ষবিশিষ্ট বিল্ডিংয়ের মধ্যে একটি কক্ষকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। এ জাদুঘরের মধ্যেও তেল রং দিয়ে আঁকা ১৭টি দুর্লভ ছবি রয়েছে। জাদুঘরে জগদীশ চন্দ্র বসুর উপর উক্তি করা লেখা ও চিঠি রয়েছে। জাদুঘরের ভেতরে শোকেসগুলোর মধ্যে তার স্মৃতি বিজড়িত কিছু ব্যবহৃত বাসনপত্র রয়েছে।

তাছাড়া বিক্রমপুরের ঐতিহ্যের মধ্যে রয়েছে সোনা রংয়ের জোড়া মঠ, বাবা আদমের মসজিদ, পোড়া মাটির নকশা করা এবং আদম মসজিদ সুলতানি আমলে তৈরি করা হয়েছে। উপমহাদেশের বিখ্যাত সাঁতারু ব্রজেন দাসের বাড়ি, বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি, রাজা বল্লাল সেনের দীঘি, ৮০০ বছরের ইটের পুল এবং সর্বোচ্চ মঠ শ্রীনগরের শ্যামসিদ্ধির মঠ ইত্যাদি বিক্রমপুরের ইতিহাসের পাতায় কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। ভ্রমণপিপাসুরা ঐতিহ্যের লীলাভূমি বিক্রমপুরকে একনজর দেখার জন্য ছুটে আসে। আপনিও ইচ্ছা করলে ঘুরে আসতে পারেন ঐতিহ্যের লীলাভূমি বিক্রমপুরে।

কীভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে ৩০ কিলোমিটারের পথ বিক্রমপুরের মুন্সীগঞ্জ। গুলিস্তান থেকে বাসে সময় লাগে এক ঘণ্টা। শঙ্খচিল, গাংচিল, নয়ন, ডিটিএল পরিবহনে মুন্সীগঞ্জে ঘুরে আসা যায়। মুন্সীগঞ্জ থেকে সিএনজিতে সারাদিনের জন্য রিজার্ভ করে ঘুরে আসতে পারেন। মুন্সীগঞ্জের ভেতরে আবাসিক ও অনাবাসিক হোটেল রয়েছে। তাছাড়া মুন্সীগঞ্জের পদ্মা রিসোর্টে থাকার সুব্যবস্থা আছে। এই রিসোর্টটিতে চারদিকে পদ্মা নদী প্রবাহিত হওয়ায় চরাঞ্চলের গ্রামজীবন ও পুরো চরজুড়ে চোখে পড়বে পদ্মা নদীর স্রোতধারা। দুপুর ও রাতের খাবারের জন্য রয়েছে পদ্মার টাটকা ইলিশ মাছ, সবজি, ঘন ডাল ও মুরগির মাংস। পদ্মা রিসোর্টে ঘুরতে চাইলে অথবা খাওয়া-দাওয়া করতে চাইলে যোগাযোগ করুন : মিলেনিয়াম ট্যুর অপারেটর, ৮৪ নয়া পল্টন, ঢাকা, মোবাইল : ০১১৯-৯৪২৮৩৫৪, ০১৯১-৩৫৩১৮২০ অথবা ০১৭১-৩০৩৩০৪৯।

3 Responses

Write a Comment»
  1. মুন্সিগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। এরকম লেখা আরো চাই। প্রজম্ম থেকে প্রজম্ম জানুক তার শিকরের কথা। – দেশ ফোরাম

  2. মুন্সীগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।যা আমরা যারা প্রবাসে বসবাস করি আমাদের ছেলে মেয়েদের কে আমরা দেখাতে পারি বুঝাতে পারি আমাদের মুন্সীগজ্ঞের অতিত ইতিহাস।

  3. ভালো লাগলো ইতিহাস জেনে, আমাদের মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের ইতিহাস সবাই জানবে এটাই প্রত্যাশ্যা। আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য আকৃষ্ট করবে আগামী প্রজন্মকে, বিক্রমপুর ঘুরে দেখার, বিক্রমপুরকে জানার বাসনা সঞ্চারিত হবে তাদের মনে, সে স্বপ্ন আমার মনে, ধন্যবাদ।