জটিল সমীকরনে মুন্সিগঞ্জ-০৩ আসন

আওয়ামী লীগ প্রার্থী বাঁছাইয়ে ভুল করলে খেসারত দিতে হবে
বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল আহাম্মেদ: স্বাধীনতার পরবর্তী সময় মুন্সিগঞ্জ-০৩ আসনটিতে ১৯৭৩ সালের জাতীয় নিরবাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আঃ করিম বেপারী জয় লাভ করে ছিল। তখন মুন্সিগঞ্জে চারটি আসন ছিল, আর ০৩ আসনটি ছিল টঙ্গিবাড়ী থানা ও মুন্সিগঞ্জ সদর থানার চারটি ইউনিয়ন রিকাবী বাজার,রামপাল, বজ্রযোগিনী নিয়ে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে রাজনৈতির ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর ১৯৭৫ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে আওয়ামী লীগের কোন প্রার্থী এই আসনে জিততে পারে নাই। ১৯৮২ সালে এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর ১৯৮৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোঃ মহিউদ্দিন এই আসনে জয় লাভ করে। ১৯৮৬ সালে পর থেকে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ২২ বছর আওয়ামী লীগ এই আসনে জয়ী হতে পারে নাই। যদিও ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোঃ মহিউদ্দিনকে জয়ী ঘোষনার পরও মধ্যরাতে এই আসনটির ৫টি ভোট কেন্দ্র স্থগিত করার মধ্য দিয়ে পুনরায় ৫টি আসনের ভোট গ্রহনের ঘোষনা দেওয়া হয়, পুনঃ নিরবাচনে তৎকালীন ক্ষমতাশীন বি এন পি প্রার্থী জয়ী হন।

২০০৮ সালের ওয়ান এলিভেন সরকারের অধিনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এম ইদ্রিস আলীর এই আসনে জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ আসনটি পুনরুদ্ধার করে। তবে এম.ইদ্রিস আলীর প্রতি মোঃ মহিউদ্দিনের সমর্থনের কারনে তৃনমুলের মতামত উপেক্ষা করে এম. ইদ্রিস আলীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তখন তৃনমুলের সমর্থন ছিল মোঃ মহিউদ্দিন এর আপন সহদর আনিসউজ্জামান প্রতি, দুই ভাইয়ের বিরোধ এম. ইদ্রিস আলীকে মনোনয়ন পেতে সুযোগ করে দিয়েছে।

২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি, জামাত নির্বাচন বয়কট করে এবং নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষনা দেয়, তখন আওয়ামী লীগ প্রার্থী এড.মিনাল কান্তি দাস এই আসনে বীনা প্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বচিত হন।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে মুনিসগঞ্জ-০৩ আসনের মোটামোটি একটি পরিসংখ্যা তুলে ধরা হলো।

আসলে মুন্সিগঞ্জ-০৩ আসটিতে প্রতিদ্বন্ধিতামুলক নির্বাচনে মোঃ মহিউদ্দিন পরিবারের,যেমন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান,বঙ্গবন্ধুর চীফ সিকিউরিটি অফিসার মোঃ মহিউদ্দিন, আপন সহদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, জেলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার মোঃ আনিসউজ্জান ও মুনিগঞ্জ পৌর মেয়র মোঃ মহিউদ্দিন এর বড় ছেলে মোঃ ফয়সাল(বিপ্লব) এর সর্মথন ছাড়া আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জয়লাভ দুস্করই বলা চলে। মোঃ মহিউদ্দিন এর আদি বাড়ী মুন্সিগঞ্জে চরাঞ্চলে, তাদের নেতৃত্বে চরের ৫টি ইউনিয়নের ৮০% থেকে ৯০% ভোট আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী পেয়ে থাকে। তারপরও আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে জয়লাভে অনিশ্চিত থাকতে হতো, এর মূলকারন মিরকাদিম পৌরসভায়(তৎকালীন রিকাবি বাজার ইউনিয়নে) আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য ভোট ৪০%, রামপাল ইউনিয়নে ৩০%, বজ্রযোগিনি ইউনিয়নে ২৫%, মহাখালী ইউনিয়নে ২০% থেকে ২৫%, পঞ্চসার ইউনিয়নে ৩৫% পেয়ে থাকে। এই সব এলাকাসমূহের লোকজন ইসলাম মাইন্ডেট বলা চলে, একটু ধর্মীয় ঘুড়ামী বেশী আর এই সব এলাকার ৯০% জনই মুসলিম ভোটার, যদিও অনেকের ধারনা এই সব এলাকায় আওয়ামী লীগের ভোট বেড়েছে, তবে আমার কাছে তেমন বেড়েছে বলে মনে হয়না, কারন এই সব এলাকায় ভোটার না বাড়ার কারন আওয়ামী লীগের দুরবল নেতৃত্ব, নেতাদের মেধা ও দুদর্শিতার অভাব আর স্থানীয এমপি ও নেতাদের নেতৃত্বের বিরোধ, নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বজায় রাখা অথবা ছিনিয়ে নেওয়ার মনমানসিকতা, আমি কি হনুরে এমন মনোভাব পোষন করা, সাধারন ভোটারদের বন্ধু না ভেবে, তাদের উপর কর্তৃত্ব ফলানো, আমি মনে করি আওয়ামী লীগ নেতা-এমপিদের এই সকল আচরনগত ভুলত্রুটি অতিসত্তর শোধরানো আবশ্যক, ভোটের বিষয় কোন প্রভাবশালীর উপর নির্ভর না করে প্রত্যেক ভোটারকে সম্মান মর্যাদা দিতে হবে, এমনকি শিশু-তরুন-যুবক সবাইকে আপন করে নিতে হবে, তাদের মতামতের প্রভাবও পরিবারের ভোটারের উপর প্রভাব ফেলে।

যাই হোক রিকাবী বাজার,রামপাল,বজ্রযোগিনি,মহাখালী,পঞ্চসার এই ০৫টি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের ঘারতি ভোট পুরনে চরাঞ্চলের ০৫টি ইউনিয়নের ৮০% থেকে ৯০% ভোট আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পেতে হয়। যা সম্ভব মোঃ মহিউদ্দিন, মোঃ আনিসউজ্জামান আর মোঃ ফয়সাল বিপ্লব ত্রয়ীর একত্রে নিরবিচ্ছিন্নভাবে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে যাওয়া। মুন্সিগঞ্জ পৌর সভায় বলা চলে আওয়ামী লীগ আর বিএনপি প্রার্থীর ভোটের হার প্রায় সমান সমান যদিও পৌর সভায় আওয়ামী লীগের মেয়র হওয়ায় কিছুটা ভোট আওয়ামী লীগের বাড়তে পারে, এই সব এলাকার এম.ইদ্রিস আলীর কিছুটা মুসলিম ভোট বাড়লেও হিন্দু ভোটাররা একচেটিয়াভাবে মিনাল কান্তিকে ভোট দিবে বলে আমার ধারনা।

গজারিয়া উপজেলায় আওয়ামী লীগের ভোটার ৫৫% হলে বিএনপির ভোটার ৪৫% বলা চলে এই ক্ষেত্রেও মোঃ মহিউদ্দিন পরিবারের ভুমিকা থাকতে হবে। তবে গজারিয়া থেকে প্রার্থী দেওয়া হলে তার ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতার প্রভাবে ভোটের হিসাব নিকাশ পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সবকিছুর বিবেচনায় মোঃ মহিউদ্দিন পরিবার থেকে আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী না হলে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে বিজয় লাভে মো মহিউদ্দিন পরিবারের আন্তরিকতার বিকল্প নাই। তাই প্রায় ১৫ লক্ষাধীর জনসংখায় অধিষ্ট এই জেলার মুন্সিগঞ্জ-০৩ আসনের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লক্ষাধীক যাহার ভোটার সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লক্ষাধীক, ভোটার সংখ্যা যত বাড়ছে নির্বাচনী মাঠের হিসাব নিকাশও তত পরিবর্তন হচ্ছে, যাই হোক মুন্সিগঞ্জ ০৩ আসনে যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে, জয় লাভে মোঃ মহিউদ্দিন পরিবারের জুড়ালো সমর্থন অপরিহার্য বলে আমি মনে করি।

বর্তমানে এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লাভে নির্বাচনী মাঠে প্রচার চালাচ্ছেন বর্তমান এম.পি এড.মিনাল কান্তি দাস, সাবেক এম.পি এম.ইদ্রিস আলী, মোঃ আনিসউজ্জামান এদের ছাড়াও যাদের পোষ্টার এই আসনের সর্বত্র শোভা পাচ্ছে তাদের মধ্যে অন্যতম গজারিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদক, মোঃ আমিরুল ইসলাম, গজারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান রেসালত উল্লাহ খান(তোতা মিয়া) মিরকাদিম পৌর সভার মেয়র, শহিদুল ইসলাম শাহীন, তবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যদি আগের ঘোষনা মতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মনোনয়ন না দেন তাহলে এই আসনে বর্তমানে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাসী থাকে তিনজন,মুন্সিগঞ্জ সদর থেকে বর্তমান এমপি এড. মৃনাল কান্তি দাস, সাবেক এমপি এম ইদ্রিস আলী ও গজারিয়া থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারন সম্পাদক মোঃ আমিরুল ইসলাম। বর্তমানে বিভিন্ন অন লাইন মাধ্যম গুজব রটাচ্ছে এই আসনে অমুক, তমুক আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছে,যা নিছক গুজব বৈই আর কিছুই নয়, আমার জানামতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়নের আবেদনপত্র বিক্রি করবে, যারা আবেদন পত্র খরিদ করবেন তাদের মনোনয়ন বোর্ড ইন্টারভিউ নিবেন, এর পূর্বে নির্বাচনী এলাকার তৃনমূল নেতাদের মতামত নেওয়া হবে, আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে জরিপের মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠের অবস্থান জানা হবে, নেওয়া হবে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোঃ মহিউদ্দিন এর মতামত সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে যিনি এগিয়ে থাকবেন তাকেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। তারপরও বিবেচনা করা হবে কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হবে, বিরোধী দলের নির্বাচনে অংশগ্রহন, জোটের প্রার্থীদের মধ্যে আসন বন্টন,এই সব বিষয়সমূহও মনোনয়ন বোর্ড বিবেচনায় নিবেন, তাই আমি বলবো এই জটিল সমীকরনে যিনি এগিয়ে থাকবেন,তিনিই হবেন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুন্সিগঞ্জ-০৩ আসনের আওয়ামী লীগ মনোনিত প্রার্থী।

বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল আহাম্মেদ
সম্পাদক, চেতনায় একাত্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *