প্রত্যয়ী প্রিয়তা

ছোট্ট প্রিয়তা তখন সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। স্কুল আর পড়াশোনা একদম ভালো লাগত না। স্কুলের পুরো সময়টা ভ্যা ভ্যা করে কাঁদত সে। তাই সঙ্গে যেতেন দাদি, বড় বোন আর চাচাতো বোন। ঢাকায় জন্ম হলেও প্রিয়তার শৈশব কেটেছে গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। একান্নবর্তী পরিবারে বড় হওয়া প্রিয়তা সবার আদরের। কে জানত, যে প্রিয়তা পড়তেই চাইত না, বড় হয়ে সে-ই পড়াশোনার জন্য স্বর্ণপদক পাবে!

প্রিয়তা—রুবাইয়া জাবিনের ডাকনাম। পড়াশোনা নয়, ছোটবেলা থেকে তাঁর ঝোঁক ছিল নাচের প্রতি। প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই জাগরণ খেলাঘর আসর, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, থিয়েটার সার্কেল, শিল্পকলা একাডেমির সদস্য হয়েছিলেন। থানা, জেলা, বিভাগীয় পর্যায়ে নাচ, কবিতা আবৃত্তি, অভিনয়ে নিয়মিত পুরস্কার পেয়েছেন। মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর স্বীকৃতিও আছে তাঁর ঝোলায়। সুন্দর এই সময়টা থমকে যায় বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে। পারিবারিক কারণে নিজের প্রিয় শৈশব, কৈশোরের স্মৃতি ছেড়ে মাকে নিয়ে বড় বোনের কাছে চলে আসতে হয়। নতুন জায়গায় নতুনভাবে জীবন শুরু করাটা খুব একটা আনন্দের ছিল না। প্রতিদিন ভালো থাকার জন্য কষ্ট করতে হয়েছে। অভাবের কারণে একসময় স্কুলে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সপ্তম শ্রেণির বই নিয়ে বাসায় বসে পড়তেন। ভাবতে পারেননি আর কখনো স্কুলে যেতে পারবেন। কিন্তু পরিবারের লোকজন অনেক কষ্ট করে তাঁকে আবার স্কুলে ভর্তি করায়।

ভালো নম্বর থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে পারেননি শুধু পড়ার ব্যয়ভার বহন করতে পারবেন না বলে। মানবিক বিভাগে পড়েও বিন্দুমাত্র দুঃখ বা আফসোস নেই প্রিয়তার। আনন্দ নিয়ে পড়েছেন। পেট ভরে ভাত খেতে পারায় নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেছেন।

পড়াশোনায় মন দিয়েই নিজের ভাগ্য ফিরিয়েছেন। ২০০৮ সালে সাভার রেডিও কলোনি মডেল স্কুল থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ-৫ এবং সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি অর্জন করেন। বোর্ডের বই ছাড়া আর কোনো বই তাঁর ছিল না। বন্ধুদের কাছ থেকে বই ধার করে পড়তেন। এসব বিষয় খেয়াল করে স্কুলের শিক্ষকেরা তাঁকে পড়াশোনার জন্য নানাভাবে সাহায্য করতেন।

২০১০ সালে সাভার মডেল কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৪.৮০ পান। কলেজে কখনো দ্বিতীয় না হওয়া প্রিয়তার এই ফলাফল নিজের কাছে সন্তোষজনক মনে হয়নি। তারপর? ‘হাল ছাড়িনি। দূরে কোথাও পড়ালেখার খরচ চালাতে পারব না বলে ঢাকার মধ্যে মাত্র দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে’, বলছিলেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগরের বাতাসেই বোধ হয় একটু বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ হলো। ২০১৫ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে ১০০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ভারত সফর করেছেন, ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা করেছেন। স্নাতকে ‘কলা ও মানবিকী’ অনুষদে চার বছর প্রথম স্থান অর্জন করে ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক-২০১৫’ পেয়েছেন। সেই স্বর্ণপদক প্রাপ্তি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সামনে বক্তব্য দেওয়ার জন্য নির্বাচিত হন তিনি। অনুষদে পরপর চার বছরই লিখিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ২০১৫ সালে তাঁকে মেধাবৃত্তি প্রদান করে। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পূরক বৃত্তিও পান। স্নাতকে চার বছরই প্রথম হওয়ায় বিভাগ থেকেও তিনি বৃত্তি পেয়েছেন।

এখন পেছনের কথা বলতে গেলে প্রিয়তার গলা ধরে আসে। এসএসসি পরীক্ষার পর থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ নিজেই চালিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পাঠ্যবই কেনার মতো টাকা ছিল না বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইব্রেরিতে বসে থাকতেন। লাইব্রেরিতে বসে থাকতে থাকতেই পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতার বইয়ের সঙ্গে তাঁর সখ্য হয়েছে।

বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে পারেননি, পড়েছেন নাটক ও নাট্যকলা বিভাগে। অনেকে কটু কথা বলেছেন, প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর মেধা নিয়ে। প্রিয়তা বলেন, ‘তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তাঁদের ওই কথাগুলো আমাকে প্রতিদিন প্রেরণা দিত। আমি দেখিয়ে দিতে চেয়েছি, এই বিভাগ থেকেও ভালো ফল করা যায়।’

প্রিয়তার সব সুখ লুকিয়ে আছে পরিবারের মানুষগুলোর হাসিমুখের মাঝে। বলছিলেন, ‘মা যখন আমার স্বর্ণপদকটা যত্ন করে মুছে রাখেন—এই দৃশ্যটাই আমার সবচেয়ে প্রিয়।’ গবেষণা আর পড়ালেখার সঙ্গেই থাকতে চান তিনি। বিভাগের একাডেমিক প্রযোজনাগুলোতে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে নিয়মিত মঞ্চনাটক করেন। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রথম আলো
সৈয়দা সাদিয়া শাহরীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *