মিরকাদিমের হালখাতা : একাল – সেকাল

চেতনায় একাত্তরঃ এক সময় মিরকাদিম পৌর সভায় খুবই জাঁকজমকভাবে বাংলা নববর্ষ ১লা বৈশাখ যা এলাকায় হালখাতা বা গদি সাইদ নামে পরিচিত ছিল, সেকালে মিরকাদিমে এই হালখাতা খুবই জাঁকজমকভাবে উদযাপন করা হতো।

তৎসময় মিরকাদিম পৌরসভা ছিল না, ছিল রিকাবী বাজার ইউনিয়ন পরিষদ। রিকাবী বাজার ইউনিয়ন ছিল মূলত ব্যবসায়ী এলাকা। ইউনিয়নটি বিস্তৃত না হলেও ঘণবসতীপূর্ন ছিল।

অধিকাংশ লোকই ছিল ব্যবসায়ী এবং শ্রমজীবি, শ্রমজীবিদের একটা অংশ ছিল বহিরাগত, বিভিন্ন জেলা থেকে আগত তবে ফরিদপুর, বরিশাল ও রংপুর এলাকার থেকে আগত শ্রমিকদের সংখ্যাই ছিল বেশি।

এলাকার শ্রমিকদের চেয়ে বহিরাগত শ্রমিকদের বেতন কম ছিল এবং তারা ছিল পরিশ্রমী। বিশেষ করে রাইস মিলসমূহে তাদের সংখ্যা বেশী ছিল। অধিকাংশ ব্যবসায়ী স্থানীয় হলেও কিছু কিছু ব্যবসায়ী ছিল বহিরাগত। আগেই বলেছি রিকাবী বাজার ইউনিয়ন ছিল একটি ব্যবসায়ী এলাকা। এই ইউনিয়নে ঐতিহ্য কমলাঘাট বন্দর যা মিরকাদিম বন্দর নামে খ্যাতি লাভ করে। ঐতিহ্যবাহী মিরকাদিমের হাট সপ্তাহে দুইদিন বসতো, নিত্যদিনের সত্তদার পরসা নিয়ে রিকাবী বাজার ও রামগোপালপুর আড়তদারপট্টিতে বেচা-বিক্রি হতো, কাটের ব্যবসা কেন্দ্র ছিল কাটপট্টি, এই ব্যবসায়ী কেন্দ্রসমূহ নিয়েই রিকাবী বাজার ইউনিয়ন ছিল।

তবে রিকাবী বাজারের কাটপট্টি লঞ্চঘাটটি ছিল দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও মালামাল পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ লঞ্চঘাট। ইতিপূর্বে বৃট্রিস ও পাকিস্তান আমলে কমলাঘাট বন্দরের ষ্টিমার ঘাটটির গুরুপ্তও ছিল অপরিসীম, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও কলিকাতা ও বার্মার সাথে এই ঘাট থেকে মালামাল পরিবহন করা হতো।

সার্বিক বিবেচনায় রিকাবী বাজার ইউনিয়নটি মোগল, বৃটিশ আমল থেকেই ব্যবসায়ীক যোগসূত্র পাওয়া যায়। মোগল আমলে রেকাব মানে বাসনপত্র তৈরী ও বিক্রির জন্য সুখ্যাতি ছিল এলাকাটির, যাতে এলাকার নামকরণ হয় রেকাব থেকে রেকাবী বাজার পরবর্তীতে রিকাবী বাজার নামে প্রচার পায়। রিকাবী বাজার ইউনিয়নের পাঁচটি ব্যবসায়ীক এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন ধরণের ব্যবসা হতো। যেমন মিরকাদিম হাট সপ্তাহে দুই দিন বসতো পরবর্তীতে নিত্যদিনের বাজারে রূপ নেয়। যদি এখনও সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। কমলাঘাট বন্দরে বিভিন্ন ভূষা মালের আরত বা পাইকারী ব্যবসা হতো। তবে কমলাঘাট বন্দরে প্রচুর ভোজ্য তেলের মিল ছিল, ছিল ডাইলের কল। তবে পরবর্তীতে রাইস মিল ও ময়দার মিল প্রচুর সংখ্যায় গড়ে উঠে।

রিকাবী বাজার জেলার একটি বৃহৎ নিত্য দিনের বাজার, সবধরণের গৃহস্তী ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সকাল ৭.০০ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত এই বাজারে পাওয়া যায়। রামগোপালপুর আড়তদার পট্টিতে প্রচুর ধান বিক্রি হতো, এই ধান স্থানীয় রাইস মিল মালিকরা ও কুইটালী ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে চাইল তৈরী করে আরতদার সমূহের মাধ্যমে বিক্রি করতো, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত বিশেষ করে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ফরিদপুর এলাকার থেকে বেশী ধান আসতো তেমনী বৃহত্তম বরিশাল, ফরিদপুর এলাকার ব্যবসায়ীরা চাউল কিনে নিত। তবে শীত মৌসুমে বরিশালের, বানরী পাড়া, ইন্দ্রির হাট ও স্বরূপকাটি এলাকা থেকে বালাম, লক্ষ্মি বিলাস, পেগু চাউল পাইকাররা এনে রামগোপালপুর আড়তে বিক্রি করতো।

সঙ্গত কারণেই রিকাবী বাজার ইউনিয়নটি ছিল একটি জমজমাট ব্যবসায়ী এলাকা প্রানচাঞ্চলের মধ্যেই দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকলকে ব্যস্ততার মধ্যেই থাকতে হতো।

সার্বিক বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় দেশের কোথায়ও মুন্সীগঞ্জ জেলার মিরকাদিম পৌরসভা তথা রিকাবী বাজার ইউনিয়নের মতো বহুমুখী ব্যবসায়ীক এলাকা নাই, আমার ধারনা বিশ্বের কোথায়ও আছে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। সঙ্গত কারণেই এতো সুন্দর সুথ্যাতি নিয়ে ঐতিহ্যবাহী মিরকাদিম পৌরসভা তথা রিকাবী বাজার ইউনিয়নটি বহুমুখী ব্যবসায়ীক এলাকা হিসাবে গ্রিনেজ অব ওয়াল্ড রেকর্ড বইতে স্থান পাওয়ার দাবী রাখে বিষয়টি নিয়ে আমার স্নেহভাজন অতন্ত প্রিয় মানুষ কমর্ঠ ও দক্ষ সংগঠক মাসুদ ফকরী সহ উৎসাহীদের অনুরোধ করবো এই বিষয়টি নিয়ে তারা যেন কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

যাই হউক সেই বৃট্রিশ আমল থেকেই রিকাবী বাজারের ব্যবসায়ীরা খুবই ধুমধামের সাথে ১লা বৈশাখ নববর্ষ বা গদি সাইদ তথা হালখাতা উদযাপন করে আসতো যা তৎকালিন পাকিস্তান আমলে আরো বিস্তৃত লাভ করে, স্বাধীনতার পরবর্তীতে বাংলাদেশও এই ঐতিহ্য প্রায় নব্বই দশক পর্যন্ত একই ধারায় বাংলা নববর্ষে হালখাতা উদযাপন করা হতো।

পরবর্তীতে এলাকায় ব্যবসা বাণিজ্যে স্থবিরতা ও পরিবর্তনহেতু এবং সামাজিক পরিবর্তনহেতু নববর্ষ উদযাপনে সীমাবদ্ধতা লক্ষ্যণীয়। বর্তমানে সীমিত আকারে ১লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষে হালখাতা উদপাপন করা হয়।

মুন্সীগঞ্জ জেলা একটি কৃষি প্রধান এলাকা, এলাকার অধিকাংশ এলাকাবাসীকে গৃহস্ত বলা হতো। বিশেষ করে রিকাবী বাজার ইউনিয়ন তথা মিরকাদিম পৌর সভার আশপাশ ইউনিয়ন পঞ্চসার, রামপাল, বজ্রযোগিনী, মহাখালী থেকে দিঘীরপাড় পর্যন্ত এলাকার এমনকি আব্দুল্লাহপুর এর আশেপাশে এলাকার চরাঞ্চলের অধিকাংশ লোকই ছিল গৃহস্ত। তাদের প্রায় প্রতিটি বাড়ীতে দুধের গাই, হালের বলদ ছিল। অধিকাংশ গৃহস্ত সকাল বিকাল গরুর দুধ বিক্রি করার জন্য রিকাবী বাজার চলে আসতো। রিকাবী বাজার নূরপুর মোড়, বটতলায় ও মিরকাদিম বাজারে সকাল বিকাল দুধের বাজার বসতো পরবর্তীতে নূরপুর মোড়ের দুধের বাজারটি রামগোপালপুর স্থানান্তর হয়, গৃহস্তরা গরুর দুধ বিক্রি করে গরুর খাবার খৈইল, ভূষি, পাউডার ও সংসারী নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে বাড়ী ফিরতো। রিকাবী বাজার থেকে দুধ পাইকাররা কিনে নিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ আরতে বিক্রি করতো। তবে স্থানীয় লোকজনও তাদের নিত্য দিনের প্রয়োজনীয় দুধ কিনে নিতো।

সঙ্গঁতকারণেই রিকাবী বাজার গো-খাদ্য ভূষা মালের পাইকারী ও খুচরা দোকান গড়ে উঠে। যাই হউক স্বাধীনতার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময় চৈত্র মাস ঘরে আসলেই স্থানীয় মিল মালিক, আড়ৎদার ও দোকানদারদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চন্য দেখা যায়। বাকী টাকা আদায় ও দেনা পরিশোধ বিষয় তৎপরতা শুরু হয়। চৈত্র মাস যতই এগিয়ে আসে নববর্ষের আমেজ ততই বাড়তে থাকে। বড় বড় ব্যবসায়ীরা হাল খাতার নিমন্ত্রন পত্র প্রস্তুত ও বিতরণ শুরু করে দেয়। পাইকারদের বার বার তাগাদা দেওয়া হয় যাতে পুরাতন হিসাবপত্র পরিশোধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *