তিনি শিক্ষক না অপরাধী?

আক্তার বেগ, পেশায় শিক্ষক না অপরাধী-এই নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। তিনি ১৯৯৯ সাল থেকে মুন্সীগঞ্জ সদরের মাকহাটী জিসি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। বছরের অধিকাংশ সময়ই তিনি থাকেন জেলে বা গ্রেফতার এড়াতে থাকেন আত্মগোপন করে। আবার শিক্ষকতা পেশায় থেকেই ১৯৯৭ ও ২০১১ সালে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে দুইবার মেম্বার হয়েছেন। ২২ বছরে তার বিরুদ্ধে হত্যা, বিস্ফোরক, লুটপাটসহ অন্তত ডজনখানেক মামলা হয়েছে।

কিছু মামলা নিষ্পত্তিও হয়েছে। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে হত্যা, বিস্ফোরক, লুটপাটসহ ৪-৫টি মামলা রয়েছে। দেড়মাস জেল খেটে কয়েকদিন আগে মুন্সীগঞ্জ কারাগার থেকে শিক্ষক আক্তার বেগ জামিনে মুক্ত হয়েছেন। তিনি স্কুলে না গিয়ে নিয়মিতই বেতন নিচ্ছেন শিক্ষকতা পেশার শুরু থেকে। থাকেন মুন্সীগঞ্জ শহরের কোর্টগাঁও গ্রামে। একজন শিক্ষক জনপ্রতিনিধি হয়ে, একের পর এক মামলার আসামি হয়ে এবং স্কুলে না গিয়ে কিভাবে নিয়মিত বেতন নিচ্ছেন-এই নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ঝড় উঠেছে।

মামলা ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের রাজারচর গ্রামের মৃত রোশন বেগের ছেলে আক্তার বেগ ১৯৯৬ সালে আধারার কালাই মোল্লার ছেলে মন্নাফ মোল্লা হত্যা মামলার আসামি হয়ে দুইমাস কারাবাস হন। এরপর থেকেই তিনি গ্রাম্য দলাদলিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। মামলা হয় একের পর এক। কখনও ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষ আবার কখনও পুলিশকে ম্যানেজ করে মামলা থেকে অব্যাহতি পান। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে হত্যা, বিস্ফোরক ও লুটপাটসহ ৪-৫টি মামলা রয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ৩রা জানুয়ারি ভোর সাড়ে ৬টার দিকে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের চৈতারচর গ্রামে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে গোলাগুলি, ব্যাপক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে মানিক কাজী নামে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হয় এবং ঘটনার তিনদিন পর ৬ই জানুয়ারি দুপুরে চৈতারচরের নদীরপাড়ে মানিকের মরদেহ পুলিশ উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় নিহত মানিক কাজীর ছেলে মো. রানা কাজী বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মুন্সীগঞ্জ থানায় মামলা করেন। এই মামলার ৫৬ নম্বর আসামি করা হয়েছে মাকহাটী মাকহাটী জিসি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক আক্তার বেগকে। মুন্সীগঞ্জ থানার মামলা নং-১৪, ১৪৩/৩২৩/৩০২/২০১/১১৪/৩৪ পেনাল কোড তৎসহ বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ১৯০৮ (সংশোধনী/২০০২) এর ৩ ধারা। দ-বিধি, তারিখ ০৭.০১.২০১৮ইং। একইদিন সকালে মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের মহসিনা হক কল্পনার আমঘাটার বাড়িতে হামলায় দুই-তিনজন হয় গুলিবিদ্ধ। এ সময় চেয়ারম্যানের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়।

এ ঘটনায় চেয়ারম্যানের স্বামী আব্দুল হক দেওয়ান বাদী হয়ে মুন্সীগঞ্জ থানায় বিস্ফোরক ও লুটপাটের একটি মামলা করেন। মামলা নম্বর-২১, ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩২৪/৩২৬/৩০৭/৩৮০/৪২৭/১১৪/৩৪ পেনাল কোড তৎসহ বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ১৯০৮ (সংশোধনী/২০০২) এর ৩-এ। তারিখ-১০.০১.২০১৮ইং। এই মামলায়ও আক্তার বেগকে আসামি। এই দু’টি মামলায় শিক্ষক আক্তার বেগ দেড়মাস কারাবাসের পর কয়েকদিন আগে জামিনে মুক্ত হন। এছাড়া ২০১৪ সালের ২৭ শে আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩টায় মহেশপুর গ্রামের বারেক মল্লিকের বাড়িতে মৃত্যুবার্ষিকীর দোয়া মাহফিলে যাওয়ার সময় পূর্ব শক্রুতার জেরে হামলায় মহেশপুর গ্রামের নাসির মৃধাসহ কয়েকজন গুলি ও ককটেলের আঘাতে আহত হয়। এ ঘটনায় মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় পরদিন নাসির মৃধা বাদী হয়ে বিস্ফোরক আইনে মামলা করেন। এই মামলায় শিক্ষক আক্তার বেগকে ২১ নম্বর আসামি করা হয়। মামলা নম্বর-৭০, ধারা ১৪৩/৩৪১ দ-বিধি তৎসহ বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ১৯০৮ এর ধারা।

একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, কারাবাস ও বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকে মাসক বেতন-ভাতা উত্তোলন এবং ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রধান শিক্ষক হিসেবে ব্যবস্থা নেয়া বা কোথাও অভিযোগ দিয়েছেন কিনা-প্রশ্ন করা হলে মাকহাটী জিসি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ফারুক আহমেদ বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটির ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার। আমি মিটিং-এ আছি।

অভিযুক্ত শিক্ষক আক্তার বেগ জানান, গত দুই বছর ধরে আমি এলাকায় যাই না। আমাকে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। মিথ্যা মামলায় দেড়মাস কারাগারের থাকার পর গত নয়দিন আগে জামিনে বের হয়েছি। গত ১৫ বছর ধরে মুন্সীগঞ্জ শহরের কোর্টগাঁও গ্রামে বসবাস করছি। ১৯৯৮ ও ২০১২ সালের দুই মেয়াদে মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের তিন নম্বর ওয়ার্ডের দুইবার নির্বাচিত মেম্বার ছিলাম। জনপ্রতিনিধি হলে শিক্ষকতা করা যায় কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করাতো অবশ্যই যায়। না করা গেলে ম্যানেজিং কমিটি বা সংশ্লিষ্টরাতো ব্যবস্থা নিতোই।

জেলা শিক্ষা অফিসার মো. ফরিদুল ইসলাম জানান, এই বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটি ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার আছে। আইনি প্রয়োগে তাকে বহিস্কার করা যেতে পারে। এই বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটি কোন ব্যবস্থা না নিলে বিষয়টি তদন্ত করে আমরা ব্যবস্থা নেবো বলে তিনি জানান। এদিকে, এই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মুক্তার মন্ডল কাতার প্রবাসী হওয়ায় তার বক্তব্য নেয়া সম্বব হয়নি। ম্যানেজিং কমিটির সদস্য সদস্য জাহাঙ্গীর সরকার অস্ত্র ও বিস্ফোরকসহ একাধিক মামলায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

পূর্ব পশ্চিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *