রঘুরামপুর এক অতি প্রাচীন জনপদের নাম

পদ্মা বিধৌত জনপদ মুন্সীগঞ্জ। অতি প্রাচীনকাল থেকেই এই জনপদে এসেছেন, থেকেছেন ও আলো ফেরি করে মানুষকে সভ্য করেছেন নানান জ্ঞানী গুণী মানুষ। মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার কাছে রামপাল ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম রঘুরামপুর। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের তত্ত্বাবধানে ঐতিহ্য অন্বেষণের গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এখানে প্রত্নতত্ত্ব গবেষণা কাজ শুরু করেন। খনন কাজে মুখ্য ভূমিকা রাখেন অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন নামের একটি সামাজিক সংগঠন। তিন বছর গবেষণার পর এখানে বৌদ্ধবিহারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তারপর আড়াই মাস নিরলস খনন কাজ চলে। এভাবেই আবিষ্কৃত হয় লুপ্তপ্রায় হাজার বছরের প্রাচীন রঘুরামপুর বৌদ্ধবিহার।

গবেষকদের ধারণা, ইতিহাসবিদরা এতদিন যে বিক্রমপুরী বৌদ্ধবিহারের কথা বলে এসেছেন, রঘুরামপুর বৌদ্ধবিহারটিই আসলে সেই বিক্রমপুরী বৌদ্ধবিহার। মুন্সীগঞ্জে অবস্থিত সুলতানি যুগের ঐতিহ্য বাবা আদমশাহী মসজিদ, মোগল ঐতিহ্য ইদ্রাকপুর কেল্লা, মীরকাদিমপুর, সোনারং জোড়া মঠ মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলের সমৃদ্ধ জনবসতির কথাই মনে করিয়ে দেয়! তাছাড়া রঘুরামপুর বৌদ্ধবিহারটির সঙ্গে বৌদ্ধভিক্ষু অতীশ দীপঙ্করের যোগসূত্র রয়েছে বলে গবেষকরা মনে করেন।

অতীশ দীপঙ্করের জন্মস্থান বজ্রযোগিনী আর রঘুরামপুর দুটি পাশাপাশি গ্রাম। এর পাশের গ্রামটির নাম হচ্ছে নাটেশ্বর। এখানে বছর দুয়েক আগেও কলা চাষ হতো। এখন সেখানে শুরু হয়েছে ইতিহাস উন্মোচনের কাজ। নাটেশ্বর দেল হচ্ছে মুন্সীগঞ্জ এলাকার সদ্য আবিষ্কার। প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধদের বিশাল স্মৃতিচি?হ্ন বা দেল রয়েছে এখানে। তারই খনন চলছে। রঘুরামপুর থেকে সোনারঙের পথে যেতে পড়বে নাটেশ্বর দেল। অথবা সোনারঙ নাটেশ্বর হয়ে রঘুরামপুর। নাটেশ্বর গ্রামের বিশাল আকারের প্রত্নতাত্তি্বক টিবির পশ্চিম পাশে একটি স্বতন্ত্র স্থাপত্য আবিষ্কার হয়েছে। দেখে মনে হয় বৌদ্ধমন্দির ও স্তূপের পাশে রয়েছে বৌদ্ধবিহার। এলাকায় প্রচলিত আছে এবং গবেষকদের ভাষ্যমতে, নাটেশ্বর দেল ছিল প্রাচীনকালে মন্দিরের শহর। পুরো বর্ষা ও শরৎ ঋতুতে এখানে খনন কাজ বন্ধ ছিল। শীত শুরু হতেই আবার এখানে খনন কাজ শুরু হয়েছে।

প্রায় সাত একর জমি নিয়ে এই নাটেশ্বর দেলের অবস্থান। বর্তমানে কাজ চলছে ২৫ ভাগ জমির ওপর। কী দেখবেন মুন্সীগঞ্জ পুকুরের জন্য বিখ্যাত। রঘুরামপুর বৌদ্ধবিহার যেতে যেতে এখানে ছোট-বড় নানা রকম পুকুর দেখে মুগ্ধ হবেন। এসব দেখতে দেখতে চলে যাবেন নাটেশ্বর বৌদ্ধবিহার। নাটেশ্বর বৌদ্ধবিহার খনন পর্যায়ে রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি সাইনবোর্ড আর কিছু কিছু জায়গা খনন হচ্ছে দেখতে পাবেন। দেখা যাবে মন্দিরের দেয়ালের অসাধারণ অলঙ্করণ, লাল রঙা ঝামা ইট। হাতে কাটা সে সব ইটের অপূর্ব জালি নকশা আপনাকে মুদ্ধ করবে। নাটেশ্বর বৌদ্ধবিহার ঘুরে চলে যান রঘুরামপুর বৌদ্ধবিহারে। এখানে প্রবেশমুখের পুকুর ঘাটটি দারুণ সুন্দর। পুকুরঘাটের পেছনেই বৌদ্ধবিহারের অবস্থান। এখানে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা বৌদ্ধবিহার থেকে বের হয়েছে পাঁচটি কক্ষ। গবেষকদের ধারণা এগুলো বৌদ্ধভিক্ষুদের কক্ষ। সাধারণ চোখে বৌদ্ধবিহারের কক্ষগুলোর স্থাপত্য চিহ্ন ছাড়া আর কিছু বোঝা যাবে না। ইটের দেয়ালের অংশ, পাথরের স্লাব আর এখানকার প্রতিটি প্রত্নতাত্তি্বক খনন খাদে দেখা যাবে ইটের পুরো স্তরের পাশাপাশি বেশকিছু বসতির নমুনা। খনন কাজ এগিয়ে চলেছে প্রতিদিন।

এখানে খনন কাজ চালাতে গিয়ে পাশেই পাওয়া গেছে আগ্নেয় কালো শিলা পাথরের তৈরি একটি বিশাল কালো মূর্তি। অবশ্য সে মূর্তিটি দেখার ব্যবস্থা এখন নেই। কারণ মূর্তিটি আপাতত বৌদ্ধবিহারের কোষাগারে জমা আছে। কোষাগারে এমন আরও কিছু নিদর্শন জমা আছে, পরে যখন একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘরে রূপান্তরিত হবে, তখন এসব নিদর্শন সেখানে প্রদর্শিত হবে।

ছবি ও তথ্য – ইন্টারনেট
নিউজজি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *