জগদীশ কমপ্লেক্সে পর্যটকের ঢল

পর্যটকের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠছে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু কমপ্লেক্স। প্রতিদিন শত শত মানুষ এ নান্দনিক কমপ্লেক্স দর্শনে ছুটে আসছেন। এখানে তারা সত্যিকারের প্রাকৃতিক পরিবেশ খুঁজে পাচ্ছেন। মনোমুগ্ধকর এ কমপ্লেক্সটির অবস্থান রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলায়। ঢাকা থেকে দূরত্ব ৩২ কিলোমিটার। এই কমপ্লেক্সে রয়েছে জগদীস চন্দ্র বসুর পৈতৃক বসতবাড়ি। বাড়িটিকে প্রকৃতির ছোঁয়ায় সাজানো হয়েছে। যেখানে রয়েছে প্রাণী ও পাখির ম্যুরাল, কৃত্রিম পাহাড়-ঝরনা এবং সিঁড়ি বাঁধানো সুবিশাল পুকুর। আরও রয়েছে বিশ্রাম নেওয়ার ত্রিকোণাকৃতির ঘর। রয়েছে জাদুঘর। একে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর স্মৃতি সংগ্রহশালা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জাদুঘরে জগদীশ চন্দ্র বসুর পোর্ট্রেট, গবেষণাপত্র, হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিও রয়েছে। রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তিতে তাঁকে লেখা চিঠি, জগদীশ চন্দ্র বসুর কাছে রবীন্দ্রনাথের লেখা চিঠি। তেল রং দিয়ে আঁকা ১৭টি দুর্লভ ছবিও রয়েছে জাদুঘরে। প্রসঙ্গত, স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু প্রথম সফল বাঙালি বিজ্ঞানী, যিনি উদ্ভিদের যে প্রাণ আছে— তা আবিষ্কার করেন। এ ছাড়া তিনি বেতারযন্ত্র আবিষ্কারের স্বপ্নদ্রষ্টাও। জগদীশ চন্দ্র বসুর বাড়িটি প্রায় ৩০ একর জমিতে বিস্তৃত। এখানে রয়েছে তাঁর কলেজ ও কমপ্লেক্স। জীবিত অবস্থায় তিনি পুরো জমি দান করে যান। সেখানে ১৯২১ সালে সুরুজ বালা সাহা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ১৯৯১ সালে নাম পরিবর্তন করে স্যার জগদীশ ইনস্টিটিউশন ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর একই স্থানে ২০১১ সালে জগদীশ চন্দ্র বসু কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। ৩০ একরের সব কিছু পরিচালিত হচ্ছে জগদীশ ইনস্টিটিউশনের উদ্যোগে। এ ছাড়া জাদুঘরে রয়েছে রয়্যাল সোসাইটিতে দেওয়া জগদীশ চন্দ্র বসুর বক্তৃতার কপি এবং নানা ধরনের দুর্লভ জিনিসপত্র। কমপ্লেক্স কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, শীত মৌসুমের চার মাস (নভেম্বর থেকে মার্চ) পর্যন্ত পর্যটকের ঢল নামে। এ সময় পিকনিকের জন্য তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। এ ছাড়া বছরের অন্যান্য সময় ঢাকাসহ আশপাশের জেলা ও উপজেলার ভ্রমণপিপাসু অগণিত মানুষ ছুটে আসেন। এ স্থানে পিকনিক করতে আসা বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবু সালেহ আকন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের সংগঠনের পাঁচ শতাধিক সদস্য তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে ফ্যামেলি ডে পালনে এখানে এসেছেন। এ জায়গাটি বেশ চমৎকার।

জগদীশ চন্দ্র বসুর পরিচয় : ক্ষণজন্মা এ পুরুষ ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল থেকে ১৮৭৫ সালে প্রবেশিকা (এসএসসি) পরীক্ষায় বৃত্তিসহ পাস করেন। এর দুই বছর পর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৮৮০ সালে বিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। একই বছর তিনি চিকিৎসা শাস্ত্র পড়তে লন্ডনে যান। সেখানে স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে ভর্তি হতে পারেননি। এরপর তিনি ক্যামব্রিজ ক্রাইস্ট কলেজে পদার্থ, রসায়ন ও উদ্ভিদ শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদ শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ১৮৮৪ সালে দেশে ফিরে আসেন। দেশপ্রেম ছিল জগদীশ চন্দ্র বসুর অনন্য বৈশিষ্ট্য। স্বদেশ প্রেম থেকে তিনি বিজ্ঞানী হন। তাঁর কাছে বিজ্ঞান-সাধনা ও স্বদেশপ্রীতি ছিল একই কথা। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞানের উন্নতি সাধন করেই পরাধীন জাতির উন্নয়ন সম্ভব। তার প্রচেষ্টায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথকভাবে বিজ্ঞান অধ্যয়ন করার ব্যবস্থা এবং বিজ্ঞানে এমএসসি চালু করা হয়। এ ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ ঘটে ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর। তিনি একজন বাঙালি পদার্থ বিজ্ঞানী, উদ্ভিদবিদ ও জীববিজ্ঞানী ছিলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন জগদীশ চন্দ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তেমনি বন্ধু ছিলেন বাংলার অমর কথাশিল্পী শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও ভাস্কর শিল্পী নন্দলাল বসু। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী লর্ড র‌্যালি ছিলেন তাঁর একনিষ্ঠ বন্ধু। জগদীশ চন্দ্রের প্রথম বৈজ্ঞানিক সাফল্য উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিজয় রক্ষীর প্রিয় পশ্চিম মন্দিরের নামে একটি কবিতা লেখেন। এ কবিতা ১৩০৪ সালের মাঘ মাসে প্রদীপ পত্রিকায় ছাপা হয়।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *