ইয়াবাসেবী থেকে ব্যবসায়ী : ৪৯ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার এএসআই রুবেল

মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় কনস্টেবল থাকাকালীন ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় কর্মরত এএসআই আলম সরোয়ার্দি রুবেল। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ পিস ইয়াবা লাগত তার। কর্তব্যরত অবস্থায় টহল গাড়িতেও করতেন ইয়াবা সেবন। ধীরে ধীরে ইয়াবাসেবী থেকে পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন রুবেল। গোটা থানা এলাকায়ই গড়ে তোলেন শক্তিশালী ইয়াবার সিন্ডিকেট। শুধু তাই নয়, নিজের বাসাকেও বানিয়ে ফেলেছিলেন মাদকের মোকাম।

গত বুধবার গভীর রাতে রুবেলকে গ্রেপ্তারের পর তার বাসা ও কর্মস্থল থেকে নগদ টাকাসহ ৪৯ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে নারায়ণগঞ্জ জেলার গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের এসআই মো. মাসুদ রানা বাদী হয়ে রুবেল ও জিম্মিদশা থেকে মুক্তিপণের ৫ লাখ টাকা দিয়ে ফিরে আসা সাবিনা আক্তার রুনুসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করেছেন। মামলা নম্বর ২৪।

জানা গেছে, এএসআই রুবেল নারায়ণগঞ্জের একাধিক ফ্ল্যাট বাসায় গড়ে তুলেছিলেন মাদকের মোকাম। বন্দরের ৫টি ঘাটে তার রয়েছে ২০ থেকে ২৫ জন সোর্স। খালেক নামে চট্টগ্রামের এক মাদকের ডিলার সিন্ডিকেটকে ইয়াবা সরবরাহ করত। চট্টগ্রাম থেকে আনা সেসব ইয়াবা সংরক্ষণ করা হতো এসব ফ্ল্যাটে। তার অন্যতম সোর্স হলেন সিলেটের জামাই রতন। তিনিই মূলত দেখভাল করেন। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী কাইল্লা জনি, উজ্জল, জুয়েল ও এএসআই রুবেলের পালিত ছেলে গোলাপের ছেলে রিফাত তার মাদক সাম্রাজ্যের দেখভালে নিয়োজিত ছিলেন। চাকরিতে মন ছিল না তার। রাতের ডিউটিতে কর্মস্থলে না থেকে রিফাতের মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়াতেন থানাময়। এই নিয়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক জিডিও হয় বিভিন্ন সময়ে।

মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় কর্মরত অবস্থায় এএসআই রুবেলের সঙ্গে পরিচয় হয় সেখানকার মাদক ব্যবসায়ী আবুলের। এর পর নেশার জন্য রুবেলকে আর বেগ পেতে হয়নি। প্রথম স্ত্রীকে ছেড়ে আবুলের মেয়ের সঙ্গে ঘর বেঁধে তিনি বনে যান পুরোদস্তুর মাদকসেবী। এর পর একটি মামলার সূত্র ধরে রুবেলের পরিচয় হয় মুন্সীগঞ্জ পঞ্চসার এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম আরিফ ওরফে বাবা আরিফের সঙ্গে। ইয়াবার নতুন জোগান পেয়ে তার সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন রুবেল। মাদকসেবী থেকে হয়ে ওঠেন মাদক ব্যবসায়ী। এভাবেই চলছিল। একপর্যায়ে বাবা আরিফের স্ত্রী সাবিনা আক্তার রুনুর প্রতি আকৃষ্ট হন। ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন পরকীয়ায়। বিষয়টি জানাজানি হলে এএসআই রুবেল ও বাবা সাইফুল দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এ ঘটনা বছর তিনেক আগের।

গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর মুন্সীগঞ্জে মালিরপাথর এলাকায় কারেন্টজাল ভর্তি একটি ট্রাকে ডাকাতি করতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়ে গণপিটুনির শিকার হন বাবা আরিফ। উত্তেজিত জনতা সেদিন উপড়ে ফেলে তার এক চোখ। সেই থেকে চিকিৎসাধীন আরিফ। এই সুযোগে ঘরে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রেখে আরিফের স্ত্রী রুনুর সঙ্গে পুরনো সম্পর্ক নতুন করে ঝালাই করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন রুবেল। সুযোগ আসে গত বুধবার। হাসপাতালে থাকা স্বামীকে দেখতে যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জে রুনুকে পেয়ে যান এএসআই রুবেল। রুবেলের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় রুনুকে আটকে থানায় না নিয়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানাধীন রূপালী আবাসিক এলাকায় ভাড়া বাড়ির দ্বিতীয় তলায় নিয়ে আসেন রুবেল। মাদক মামলা দেওয়া ছাড়াও ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। রুনু মুন্সীগঞ্জে তার বাড়িতে টাকার জন্য ফোন দিলে ছোট বোন লীমা নিজের স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে ধারকর্জ করে ৫ লাখ টাকা রুবেলের হাতে তুলে দিয়ে বোনকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। মুক্তিপণের পুরো ঘটনার মধ্যস্ততা করে এএসআই রুবেলের সোর্স মোর্শেদ।

এদিকে জিম্মিদশা থেকে ছাড়া পেয়ে পুলিশের এক ডিআইজিকে ঘটনার বিস্তারিত জানায় রুনু ও লিমা। ডিআইজি বিষয়টি অবহিত করেন আইজিপি মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীকে। এর পর তোলপাড় সৃষ্টি হয় নারায়ণগঞ্জের জেলা পুলিশে। পরিচালিত হয় ত্রিমুখী অভিযান। বুধবার গভীর রাতে রুবেলকে গ্রেপ্তারের পর তার বাসা ও কর্মস্থল থেকে নগদ টাকাসহ ৪৯ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করে আভিযানিক দল। পরে মুন্সীগঞ্জের পঞ্চসার থেকে আটক করা হয় মুক্তিপণ দিয়ে রুবেলের জিম্মিদশা থেকে ছাড়া পাওয়া সেই সাবিনা ইয়াসমিন রুনু ও এএসআই রুবেলের সোর্স মোর্শেদকে। বৃহস্পতিবার রুবেলের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে তার স্বজনদের হাতে তুলে দিয়ে ঘরে তালা লাগিয়ে দিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। বাসাটিতে রুবেল তার দ্বিতীয় স্ত্রী মিতুকে নিয়ে বসবাস করতেন। তার প্রথম স্ত্রী থাকেন রুবেলের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানাধীন উজানপাড়ায়।

মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় কনস্টেবল পদ থেকে তিনি যোগদান করেন বন্দরের মদনগঞ্জ ফাঁড়ির ইনচার্জ হিসেবে। এর ৬ মাস পর সদর থানায় যোগদান করেন। গত বছরের মার্চে বন্দরের সৈয়দপুর খেয়াঘাটে শালিকে নিয়ে বিনা ভাড়ায় নদী পার হয়ে বন্দরের বাসায় আসার সময় মাঝির সঙ্গে হট্টগোল হয় এএসআই রুবেলের। এর পর মাদক ব্যবসায়ীদের নিয়ে তিনি ওই মাঝিকে শিক্ষা দিতে গেলে মাঝিরা একজোট হয়ে তাকে ও তার সহযোগীদের গণপিটুনি দিয়ে ওয়াকিটকি রেখে দেয়। এ ঘটনায় সহকর্মী এএসআই ইলিয়াস হোসেন তাকে উদ্ধার করে আনতে পারলেও উদ্ধার করতে পারেননি ওয়াকিটকি। সেটি এখনো উদ্ধার হয়নি। ঘটনার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর পর রুবেলকে পোস্টিং দেওয়া হয় র‌্যাবে। সেখানকার অনুশাসনে মন টেকেনি। ৩ মাস থাকার পর তদবির বাণিজ্যের মাধ্যমে ফিরে আসেন ফের সদর মডেল থানায়।

নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অ্যাডমিন) মোস্তাফিজুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। অভিযুক্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। এই চক্রের অন্য সদস্যদের খুঁজে বের করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

আমাদের সময়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *