মুন্সীগঞ্জ-২: আ. লীগের মনোনয়নে ‘বিশেষ বিবেচনা’, বিএনপি ‘নির্ভার’

মো. মাসুদ খান: মুন্সীগঞ্জ-২ সংসদীয় আসনটি লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত। লৌহজংয়ের মাওয়ায় তৈরি হচ্ছে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর অন্যতম পদ্মা সেতু। এ কারণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাছে আসনটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে দলের নেতাকর্মীরা।

জাতীয় সংসদের ১৭২ নম্বর নির্বাচনী এলাকা লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত। ২০০৮ সালে আসনটি দখল করে আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আসনটি ধরে রাখতে সক্ষম হয় ক্ষমতাসীন দলটি।

আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এলাকায় চলছে মনোনয়নকেন্দ্রিক আলোচনা। বিভিন্ন দলের বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের নির্বাচনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডও শুরু হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগে প্রার্থী মনোনয়ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় নাকি ‘বিশেষ বিবেচনায়’ দেওয়া হবে সেটা নিয়ে বেশ আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি নেতাকর্মীদের ভাবনায় আসনটি পুনরুদ্ধার। এখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন আলোচনায় পাঁচজনের নাম শোনা যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম বর্তমান সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। বিএনপিতেও একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী আলোচনায় আছেন।

আওয়ামী লীগ : ১৯৯৬ সালে সংরক্ষিত মহিলা আসনে সংসদ সদস্য হওয়ার পর সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি এলাকায় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন। অত্যন্ত পরিশ্রম আর বছরের পর বছর সময় দিয়ে দলের শক্ত ভিত তৈরি করেছেন তিনি। তৃণমূলে নিজের অবস্থানও অনেক সুদৃঢ় করেছেন। তিনি সপ্তাহে দুটি উপজেলায় পাঁচ-ছয় দিন করে জনগণের মাঝে সময় দিচ্ছেন, যোগ দিচ্ছেন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌড়ে সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির অবস্থান অনেক শক্ত। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের সরাসরি মনোনয়ন পেয়ে বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান সিনহার কাছে পরাজিত হন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি আবারও দলীয় মনোনয়ন লাভ করেন এবং সেবার প্রতিদ্বন্দ্বী মিজানুর রহমান সিনহাকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার ৩৩ বছর পর আসনটি দখল করে আওয়ামী লীগ। এমিলির কর্মতৎপরতায় খুশি হয়ে ২০১৪ সালের নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয় তাঁকে। দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছে, সংসদ সদস্য এমিলির সবচেয়ে বড় অবদান পদ্মা সেতুতে। পদ্মা সেতুর শুরুর দিকে যখন ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হয়, তখন এ অঞ্চলের মানুষ তাদের বাপ-দাদার ভিটামাটি ছেড়ে দিতে চাচ্ছিল না। তারা আন্দোলন করে শুরুতেই পদ্মা সেতুর কাজ বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু রাজনীতিতে দক্ষ এমিলি যখনই যেখানে আন্দোলনের আভাস পেয়েছেন, সেখানেই ছুটে গেছেন। গ্রামবাসীকে নিয়ে উঠোন বৈঠকে বসেছেন। তিনি মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এমিলি এবারও দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন। তিনি গুছিয়ে রেখেছেন লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগকে। মনোনয়ন দৌড়ে তিনি একধাপ এগিয়ে রয়েছেন।

সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া দায়িত্ব আমি সততার সাথে পালন করে চলেছি। একটা সময় ছিল যখন এখানকার নারী ভোটারদের মাঝে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা ছিল। আমি ১৯৯৬ সাথে থেকে নারীদের নিয়ে বাড়ি বাড়ি উঠোন বৈঠক করেছি। তাদেরকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা সম্পর্কে বুঝিয়েছি। টঙ্গিবাড়ীর আড়িয়লে আমরা কখনো নারীদের ভোট পেতাম না। উঠোন বৈঠকের পর এখানে এখন আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোটব্যাংক তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের ধারা দেখে তারা এখন আওয়ামী লীগের পক্ষে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে এখন আর আগের নেতিবাচক অবস্থান নেই।’

সংসদ সদস্য এমিলি আরো বলেন, ‘স্থানীয় আওয়ামী লীগকে একটি পরিবারের মতো করে গড়ে তুলেছি। জেলা থেকে শুরু করে প্রতিটি উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক গড়ে তুলেছি। পুরনো আওয়ামী লীগারদের দলে মূল্যায়ন করে তাদের নিয়ে এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করে যাচ্ছি। আশা করছি, আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে দল তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও আমাকে জনগণের সেবা ও এলাকায় উন্নয়নের সুযোগ দেবেন।’

এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি এবার এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। প্রায় প্রতি সপ্তাহে শুক্র ও শনিবার এলাকায় স্কুল-কলেজ ও মাদরাসায় বইসহ নগদ অর্থ বিতরণ করে চলেছেন। শীতের সময় তিনি গরিব-দুঃখীর মাঝে কম্বল বিতরণ করেছেন। নির্বাচন করতে চান বলে ঘোষণা দিলেও তিনি এখনো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে তাঁর অবস্থান জোরালোভাবে তৈরি করতে পারেননি। তবে তিনি রাজনৈতিক শক্ত ভিত তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মাহবুবে আলমকে নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তারা বলছে, যদি আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রার্থী মনোনয়ন দেয় তবে এমিলি এদিক থেকে অনেক এগিয়ে রয়েছেন। নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, দলের প্রধান শেখ হাসিনা প্রার্থী নির্বাচনে কোনো ভুল করবেন না।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘আমি মনোনয়ন পেলে সমাজের চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ ও টাউট-বাটপারদের নিকট থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করব। আইনজীবী হিসেবে পার্লামেন্টের ওপর হায়ার স্টাডিজ আছে আমার। ৯ বছর অ্যার্টনি জেনারেল থাকায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। ভুলভ্রান্তি ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছি। আমার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নাই। বাকিটা সময় আমি জনগণের সাথে থাকতে চাই।’

এক প্রশ্নের জবাবে মাহবুবে আলম বলেন, ‘ভোট দেওয়ার মালিক জনগণ। জনগণ চায় ভালো লোক। আমি ভালো হলে ভোটারদের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা অবশ্যই থাকবে।’

এ আসনে আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী লৌহজং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ শিকদার। তরুণ এ নেতা প্রার্থী হতে চান—এমন ঘোষণা দেওয়ার পর তাঁর সমর্থকরা নানাভাবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

রশিদ শিকদার এশিয়ান হকি ফেডারেশনের কার্যকরী পরিষদের পরিচালক, বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সহসভাপতি ও ঊষা ক্রীড়াচক্রের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সন্মেলনে ঘোষণা দিয়েছেন, মনোনয়ন না পেলে তিনি বর্তমান সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির পক্ষে কাজ করবেন।

রশিদ শিকদার বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তরুণদের মূল্যায়ন করছেন। আমি দলের জন্য কাজ করে চলেছি। লৌহজং উপজেলা আওয়ামী লীগ এখন অনেক শক্তিশালী। তাই তরুণ প্রার্থী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর মূল্যায়নের অপেক্ষায় আছি।’

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলা পরিষদের দুইবারের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ। তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার আগেই দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে আর্থিক সহায়তাসহ নানা জনহিতকর কাজ করেছেন, এখনো করে যাচ্ছেন। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হওয়ার বদৌলতে কাজী ওয়াহিদ এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আরো বেশি সহযোগিতা করছেন। রাজনীতির বাইরেও তাঁর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি এলাকায় একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ঢালী মোয়াজ্জেম হোসেনও এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে তিনি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনেও দলের কাছে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু দলীয় বিবেচনা তাঁর পক্ষে যায়নি। এবার তিনি সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিএনপি : এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহা একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। এলাকায় তাঁর পরিচিত ও ভাবমূর্তির কারণে তিনি মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন। তিনি এলাকায় কাজ করে যাচ্ছেন। তবে কমিটি গঠন নিয়ে সিনহার ব্যাপারে নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা সমালোচনা আছে। তবে তারা বলছে, এ আসনে তাঁর চেয়ে আর বেশি গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বিএনপিতে নেই।

মিজানুর রহমান সিনহা বলেন, ‘আমি দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন হয়ে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে কাজ করছি। নেতা বা দল পরিবর্তনের কোনো ইচ্ছা কখনো ছিল না বা আজও নেই। বিএনপি বৃহৎ দল। কমিটি গঠনে সবাইকে খুশি করা যায় না। তবে পর্যায়ক্রামে সকলেই যোগ্যতা অনুযায়ী পদ পাবেন। কেউ মনে কষ্ট পেলেও সেটা সাময়িক। যদি দল আমাকে মনোনয়ন দেয়, আর যদি স্বচ্ছ ভোট হয়, তবে ওপরে আল্লাহ আর নিচে খালেদা জিয়া ছাড়া আমাকে কেউ ফেল করাতে পারবে না।’

মিজানুর রহমান সিনহা ছাড়াও জেলা বিএনপির সহসভাপতি আলী আজগর মল্লিক রিপনও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। তিনিও এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। এ ছাড়া সাবেক তথ্যমন্ত্রী এম শামসুল ইসলামের ছেলে প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বাবুও এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন।

জাতীয় পার্টি : এ ছাড়া জাতীয় পার্টির মুন্সীগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মো. কুতুবুদ্দিন আহম্মেদ, কেন্দ্রীয় নেতা মো. নোমান মিয়া ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. জামাল হোসেনও দলীয় মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।

কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *