মুন্সীগঞ্জ-৩: জয় ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে আ’লীগ, স্বস্তিতে বিএনপি-জাতীয় পার্টি

আরিফ উল ইসলাম: জেলা সদর ও গজারিয়া উপজেলা নিয়ে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়েছে। নির্বাচনী মাঠে বিএনপি না নামলেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তবে কম বেশি দুই দলেরই দুশ্চিন্তার বড় বড় কারণ হচ্ছে কোন্দল। তবে চাওয়া পাওয়া নিয়ে শাসক দল আওয়ামী লীগে বিরোধটা একটু বেশিই। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত যদি এই বিরোধ অব্যাহত থাকে তাহলে এর খেসারত আওয়ামী লীগকে দিতে হতে পারে ভোটে। বিএনপি এখনও প্রচারে না নামলেও আওয়ামী লীগের অন্তত চারজন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির একজন করে মনোনয়ন প্রত্যাশী মাঠে আছেন।

এই আসনে জাতীয় পার্টিরও একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। আওয়ামী লীগ জাপার সঙ্গে জোটভুক্ত নির্বাচন করলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভালো ফলাফল আসতে পারে বলে ধারণা অনেকেরই। তবে এই সুযোগ আওয়ামী লীগ কতখানি কাজে লাগাতে পারবে, তা নির্ভর করছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল কতখানি মেটানো গেল তার ওপর। বিএনপিতে আবদুল হাইয়ের বিকল্প মাঠে না থাকলেও দলীয় কোন্দল রয়েছে। এদিকে জেলার রাজনীতিতে আসা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতনের সঙ্গে আবদুল হাইয়ের ঠাণ্ডা লড়াই দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। আর এ সুযোগে বিভক্ত হয়ে পড়ছে দলটি।

বিশেষ করে নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথম ১৯৯১ সালের ভোটে বিজয়ী হন জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও জয়ী হন আবদুল হাই। আগামী নির্বাচনে তিনি বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী। তবে কোনো কারণে তিনি নির্বাচন করতে না পারলে সে ক্ষেত্রে বিকল্প প্রার্থী দেয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে বিএনপির। তবে ২০০৮ সালের ভোটে আসনটি দখলে নেয় আওয়ামী লীগ, বিজয়ী হন এম ইদ্রিস আলী এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস এমপি হন। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ২০০৮ সালে বিএনপি পরাজিত হয়। আওয়ামী লীগে চারজনের বেশি প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। এরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান এমপি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, সাবেক এমপি এম ইদ্রিস আলী, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আনিছুজ্জামান আনিস ও গজারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান রেফায়েত উল্লাহ খান তোতা।

মৃণাল কান্তি দাস মাঠ চষে বেড়ালেও কোন্দল মেটানোর কোনো উদ্যোগ নেই। জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও তার ছেলে মুন্সীগঞ্জ পৌর মেয়র মোহাম্মদ ফয়সাল বিপ্লবসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতৃত্বের একটি বড় অংশের সঙ্গে মৃণাল কান্তির বিরোধ এখন প্রকাশ্যে। আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক চরাঞ্চল বিশেষ করে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে সহিংস ঘটনার জন্য মৃণাল কান্তিকে দায়ী করা হচ্ছে। এ নিয়ে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রিপন পাটোয়ারি জানান, মোল্লাকান্দির ঘটনা এমপি জিইয়ে রেখেছেন। তিনি একপক্ষের হয়ে কাজ করছেন। একটি মিথ্যা মামলায় দেড় শতাধিক গ্রামবাসী এখন জেলে। রামপাল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হাকিম বেপারি জানান, মৃণাল কান্তি দাস বিএনপির ছত্রছায়ায় টিকে আছেন। এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে মৃণাল কান্তি ফোনে বলেন, দেশের বাইরে যাচ্ছি এবং বাইরে থেকে এসে লিখিতভাবে এর জবাব দেয়া হবে। পরে তিনি ফোন রেখে দেন।

সাবেক এমপি ও সচিব এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি এম ইদ্রিস আলী যুগান্তরকে বলেন, নিজের জন্য কিছু চাই না। সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করতে চাই। সেটাই আমার জন্য বড় পাওয়া। সাধারণ মানুষ আমাকে ভুলে যায়নি। চরাঞ্চলের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেইনি, হানাহানি বন্ধ ছিল। জনগণের ভালোবাসার টানে এবং তাদের কল্যাণে কাজ করার প্রত্যয় নিয়ে আবার ফিরে আসা। তৃণমূলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী। নিজেকে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, তবে দল যাকেই মনোনয়ন দিক তার হয়ে কাজ করব।

আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী আনিছুজ্জামান আনিস ছাত্র রাজনীতি থেকে সক্রিয়। দুই দফায় সদর উপজেলা চেয়ারম্যান এবং মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকায় তৃণমূল পর্যায়ে তার যোগাযোগের পাশাপাশি ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। নির্বাচনী ভাবনা নিয়ে কথা হয় আনিছুজ্জামান আনিসের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে জানান, মাঠ পর্যায়ে তার প্রস্তুতি আছে। দীর্ঘদিন উপজেলা ও পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন এবং রাজনীতি করার কারণে জনগণের ভালোবাসা পেয়েছি। এমপি হয়ে জনগণের জন্য আরও কাজ করতে চাই। আশা করি দল তৃণমূলের কথা চিন্তা করে আগামী নির্বাচনে আমাকে মনোনয়ন দেবে। আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী গজারিয়া উপজেলা পরিষদের দু’বারের চেয়ারম্যান, এমপি মৃণাল কান্তি দাসের কাছের মানুষ রেফায়েত উল্লাহ খান তোতাও মাঠে সক্রিয়। জানতে চাইলে সদালাপি মিষ্টভাষী তোতা বলেন, গজারিয়া উপজেলা থেকে যদি প্রার্থী দেয়া হয় তাহলে গজারিয়ার ভোট ব্যাংক কাজে লাগিয়ে নির্বাচিত হওয়া সহজ হবে। তা ছাড়া দলীয় ভোট ও এলাকার মানুষের যে ভালোবাসা আমার প্রতি রয়েছে সেটা হবে বাড়তি পাওয়া। আমাকে মনোনয়ন দেয়া হলে ভোট কাস্টিং বেড়ে যাবে। মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদী।

নির্বাচনী মাঠে বিএনপি এখন পর্যন্ত সরব না হলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত। তিনি হলেন পাঁচবারের এমপি, সাবেক উপমন্ত্রী ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই। অন্য কোনো সমস্যা না হলেও তিনিই বিএনপির প্রার্থী। তবে বিকল্প হিসেবে মাঠে রয়েছেন সাবেক তথ্যমন্ত্রী এম শামসুল ইসলামের বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ইসলাম বাবু ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন। জানতে চাইলে আবদুল হাই বলেন, আমাদের টার্গেট নেত্রীকে জেল থেকে বের করে আনা। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে এলে বিএনপি অংশ নেবে। মুন্সীগঞ্জ বিএনপির ঘাঁটি, আমাদের দল গোছানো আছে। যখন নির্বাচন হবে তখনই আমরা প্রস্তুত আছি, জনগণকে নিয়ে এবং জনগণের ভোটে ধানের শীষ বিজয়ী হবে।

একক প্রার্থী নিয়ে স্বস্তিতে রয়েছে জাতীয় পার্টি। মুন্সীগঞ্জ জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল বাতেনের দলীয় মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত বলেও জানা গেছে। হাজী কল্যাণ পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল বাতেন জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করতে এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে জেলার একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে প্রতিনিয়ত ছুটে বেড়াচ্ছি। জানতে চাইলে আবদুল বাতেন বলেন, দলকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব নেতা আমাকে দিয়েছেন। সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি একক বা জোটবদ্ধ নির্বাচন করলে আমরা জয়ী হব। আবদুল বাতেন জানান, আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে, এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী দিলে জয়লাভ করা কষ্টকর হয়ে পড়বে। জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন দেয়া হলে জয় ছিনিয়ে আনা সহজ হবে।

যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *