খনা ও খনার বচন: লোকসংস্কৃতির আকর্ষণীয় উপাদান

কখনও কখনও আধুনিক যুগে এসেও প্রাচীন সময়ের কিছু মানুষকে বর্তমানের চাইতেও বেশি আধুনিক বলে মনে হয়, তেমনই একজন- খনা। কী খুব পরিচিত লাগছে তো নামটা? প্রাচীন ভারতের এই নারীর নাম ভারতীয় উপমহাদেশের কারোরই অজানা নয়। আজ সেই খনারই জানা-অজানা কিছু গল্পে ডুবে যাওয়া যাক!

খনার পদধূলি পেয়েছে জ্যোতির্বিদ্যা, বিজ্ঞান, দর্শন ও কৃষিশাস্ত্র। এ সকল বিষয়ে তার পর্যবেক্ষণ কিংবা গবেষণালব্ধ জ্ঞান তিনি তুলে ধরতেন তার বিভিন্ন বচনের মধ্য দিয়ে, যেগুলো বহুকাল ধরে লোকের মুখে মুখে খ্যাতি লাভ করেছে ‘খনার বচন’ নামে। খনার বচনগুলো খনাকে করে তুলেছিল একজন কবিও। ‘খনার বচন’-কে কেউ কেউ আবার ভবিষ্যদ্ববাণী বলতেও ভালোবাসেন, কারণ তার দ্বারা নির্ধারিত আবহাওয়ার পূর্বাভাসগুলো কৃষি ও রাষ্ট্রকার্যে অনেক সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। খনা তাই ছিলেন প্রাচীন ভারতের একজন আবহাওয়াবিদ- এ কথা বললেও ভুল হবে না।

সেই খনা

খনার কর্ম যতটা নিশ্চিত, ততটা নিশ্চিত নয় তার জীবন ও জন্ম। এ নিয়ে চালু রয়েছে কিছু মতভেদ। বাংলা ও উড়িয়া ভাষায় এই মতভেদের আলোকে কিছু গল্পও কালক্রমে তাই আবির্ভূত হয়েছে।

খনার জীবন নিয়ে প্রচলিত ধারণা
তার আবির্ভাবকাল ৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অনুমান করা হয়। তিনি এ সময়কার তথা মধ্যযুগের কবি ছিলেন (এখানে খনার বচনকে কবিতা হিসেবে ধরে খনাকে মধ্যযুগের কবি বলা হচ্ছে)। একটি ধারণা অনুযায়ী খনার বাসস্থান ছিল পশ্চিমবঙ্গের চবিবশ পরগনা জেলার বারাসাতের দেউলি গ্রামে এবং তার পিতার নাম অনাচার্য। এই ধারণা অনুযায়ী তিনি চন্দ্রকেতু রাজার আশ্রম চন্দ্রপুরেও বহুকাল বাস করেন।

বিক্রমাদিত্যের সভার দশম রত্ন

রাজা বিক্রমাদিত্য

বরাহ ও মিহির রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাসদ ছিলেন। একবার জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি জটিল সমস্যা সমাধান করার জন্য দেওয়া হয় এই পিতা-পুত্রকে। কিন্তু তারা কোনোভাবেই কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না, আকাশের তারা গোণায় বারবার ভুল করছিলেন। এই গভীর সমস্যায় এগিয়ে আসেন খনা। তিনিই একটি আবহাওয়া পূর্বাভাস তৈরি করেন এবং এ থেকে কৃষকেরা অত্যন্ত লাভবান হন। খনার এই আচমকা সাফল্য চোখ কাড়ে রাজা বিক্রমাদিত্যের এবং এ ঘটনার পর থেকেই তিনি খনাকে তার সভার ‘দশম রত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

বাংলা ও উড়িয়া ভাষায় খনা নিয়ে প্রচলিত গল্পে মিল ও অমিল
রাজা বিক্রমাদিত্যের সভার নবরত্নের একজন ছিলেন বরাহ। তার পুত্র মিহিরের জন্মের পর গণনার মাধ্যমে জানলেন তার আয়ুষ্কাল মাত্র এক বছর। এরপর তিনি তাকে একটি তাম্রপাত্রে করে ভাসিয়ে দেন নদীর স্রোতে এই বিশ্বাসে যে নবজাতক শিশুটি হয়তো বেঁচে যাবে! খনা ছিলেন মতান্তরে সিদ্ধলরাজের কন্যা (বাংলা মতানুসারে) কিংবা লঙ্কাদ্বীপের রাজকুমারী (উড়িয়া মতানুসারে)। নদীর সেই স্রোতের সাথে মিহির গিয়ে পৌঁছালো খনার পিতার কাছে। তিনি খনা ও মিহিরকে একত্রে লালন-পালন করতে লাগলেন। তারা একই সাথে জ্যোতিষশাস্ত্রে সিদ্ধিলাভ করলেন।

সতীর্থ বন্ধু হয়ে তারা একসময় বিবাহবন্ধনেও আবদ্ধ হলেন। একদিন নক্ষত্রগণনার মাধ্যমে খনা জানতে পারলেন যে বরাহ-ই হচ্ছেন মিহিরের পিতা এবং এ কথা জানার অব্যবহিত পরেই তারা দেখা করতে চাইলেন বরাহের সাথে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে। একজন অনুচরের সহায়তার ভারতবর্ষে যাত্রা করেন। উজ্জয়নীতে এসে খনা ও মিহির বরাহের নিকট আত্মপরিচয় দান করেন। কিন্তু প্রথমে বরাহ কিছুতেই মেনে নিতে চাইলেন না যে মিহির তারই পুত্র, কারণ এখনো তার মনে গেঁথে রয়েছে ভুল গণনার সেই ভবিষ্যদ্বাণীটি! খনা বরাহের ভুল শুধরালেন সঠিক গণনা দেখিয়ে এবং এতে ফলাফল বের হলো যে মিহিরের আয়ুষ্কাল ১০০ বছর! সেই প্রথম সাক্ষাৎকালে খনা বরাহকে যা বলেছিলেন তা ছিল-

“কীসের তিথি কীসের বার, জন্ম নক্ষত্র কর সার/
কী করো শ্বশুর মতিহীন? পলকে আয়ু বারো দিন!”

খনার শ্বশুর বরাহ

খনার প্রজ্ঞা ও মেধা ক্রমেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকে এবং অনেকেই খনার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। রাজা বিক্রমাদিত্যের সভার দশম রত্ন হবার পর তো যেন স্বয়ং বরাহই খনার শত্রু হয়ে উঠলেন! বরাহ নিজের প্রতিপত্তি হারাবার ভয়ে এবং খনার খ্যাতি আর বাড়তে না দেওয়ার উদ্দেশ্যে এক নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি খনার বচন উৎপন্ন হবার যে স্থান সেটাই শেষ করে দিলেন। তিনি খনার জিহ্বা কেটে নিতে বললেন মিহিরকে! আর পিতৃভক্ত মিহিরও তাই করলেন! এই ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই অনবরত রক্তপাতের ফলে খনার মৃত্যু হয়, প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে লেখা হয় এক করুণ জীবনাবসান আর নিষ্ঠুরতার কাহিনী।

খনার দেওয়া উপদেশগুলোই খনার বচন

উড়িয়া ধারণা অনুযায়ী খনার আসল নাম ছিল লীলাবতী এবং তার জিহ্বাকর্তনের ফলে তিনি বোবা হয়ে যান এবং ‘খনা’ নামের আরেক অর্থ বোবা। উড়িয়া ভাষার গল্পে এটাও বলা হয় যে জিহ্বা কেটে নেওয়ার আগে নাকি মিহির খনাকে কিছু কথা বলবার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পিতার এই নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তে সব মিলিয়ে মিহির কোন স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সে কথা কোনোখানেই বলা হয়নি। খনার জন্য আদৌ মিহিরের মনে কোনো প্রেম বা সহমর্মিতা ছিল কিনা তারও উল্লেখ নেই এই গল্পগুলোতে।

খনার মৃত্যু নিয়ে একটি ছোট মিথ চালু আছে- খনার সেই জিহ্বাটি নাকি তখনই খেয়ে ফেলেছিল এক টিকটিকি এবং তখন থেকেই ঠিক কোনো কথা শুনলে দেয়ালে থাকা যেকোনো টিকটিকিই বলে ওঠে- “ঠিক ঠিক!” এই মিথ এটিই নির্দেশ করে যে জিহ্বা কেটে ফেলার পরও, ভারতের মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন হবার পরও ঠিক-ভুলের জ্ঞান খনা রেখে গেছেন এর আবহাওয়ায়।

অর্থবহ খনার বচন

খনার একটি বচন

খনার একটি বচন

“থাকতে বলদ না করে চাষ/ তার দুঃখ বারোমাস”

এরকম ছন্দবদ্ধরীতিতে যে শুভাশুভ, বিধিবিধান, নীতি ও উপদেশবাচক প্রতিপাল্য প্রাজ্ঞোক্তি খনা করে গিয়েছেন তা-ই হচ্ছে ‘খনার বচন’। বাংলা, ওড়িয়া ও অসমিয়া ভাষায় খনার বচনের খ্যাতি দেখা যায়। খনার বেশিরভাগ বচনই এমন কৃষিকাজ সংক্রান্ত দিককে নির্দেশ করে থাকে। আধুনিকায়নের এই যুগে এসেও কৃষির বহু ক্ষেত্রে খনার বচন এখনও অচল হয়নি, তার আবেদন এখনও রয়েছে অমলিনই। খনার বচনে আবহাওয়া, জ্যোতিষ, ঋতুভেদে শস্যের ক্ষয়ক্ষতি ও ফলন সম্পর্কে যে ধারণা দেওয়া হয়েছে, তার অনেকগুলিই বৈজ্ঞানিক সত্যের খুব কাছাকাছি। আবহমান কাল ধরে বাংলার কৃষিক্ষেত্র ও কৃষকদের এক প্রকৃত দিকনির্দেশক হয়ে খনা পথ দেখিয়ে যাচ্ছেন তার কালজয়ী বচনের মধ্য দিয়ে। খনার বচনে বেশ কিছু দুর্বোধ্য গাণিতিক পরিভাষাও পাওয়া গিয়েছে যার অর্থোদ্ধার সম্ভব হয়নি।

খনা ব্যবহারিকভাবে উপদেশ দিয়ে গিয়েছেন কিছুটা এমনভাবে-

“মঙ্গলে উষা বুধে পা/ যথা ইচ্ছা তথা যা”
কোন মাটিতে কোন ফসল ভালো ফলবে-

“শুনরে বাপু চাষার বেটা, মাটির মধ্যে বেলে যেটা/ তাতে যদি বুনিস পটল, তাতে তোর আশার সফল”

অথবা কোন ঋতুতে কোন বীজ বপন করতে হবে-

“আখ আদা রুই, এই তিন চৈতে রুই”

তার উপায় খুব সহজেই মেলে খনার বচনে।

শীতকালের বৃষ্টির প্রতি খনা বন্দনা গেয়েছেন-

“যদি বর্ষে মাঘের শেষ/ ধন্যি রাজা পুণ্যি দেশ”

যদিওবা কৃষিকাজেই খনার বচনের পরিসর বেশি বিস্তৃত, তবু জীবনের অন্যান্য অংশ নিয়েও কম বচন রেখে যাননি এই অনন্য পর্যবেক্ষক। এই কথাটি তো আমরা সবাই প্রতিনিয়ত ব্যবহার করি কিন্তু হয়তো জানি না যে এটি খনার বচন। দেখুন তো চিনতে পারেন কিনা?

“সূর্যের চেয়ে বালি গরম! নদীর চেয়ে প্যাক ঠান্ডা!” অথবা “সমানে সমানে কুস্তি, সমানে সমানে দোস্তি”
কর্মফল নিয়ে তিনি যেন আজ এইখানে দাঁড়িয়েই উপদেশ দিচ্ছেন-
“যা-ই করিবে বান্দা তা-ই পাইবে/ সুঁই চুরি করিলে কুড়াল হারাইবে”।

কি সহজ অথচ জীবনবোধে টইটুম্বুর খনার বচন, যেন ছন্দে ছন্দে গাঁথা জীবনের মানে! বাঙালি লোকসাহিত্যের একটি অন্যত্ম উপাদান হচ্ছে খনার বচন। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে রচনা করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর আবেদন আটকে থাকেনি শুধু সেই সময়টিতেই! আজও খনার বচন পড়লে আপনি আনমনে বলে উঠবেন-“ঠিকই তো!” আর সেই মিথ মেনে চলা টিকটিকিটিও খনার বচন শুনে আজ একবার বলে উঠতেই পারে- “ঠিক ঠিক!”

খনার বচন নিয়ে একটি বই

তথ্য ও ছবি উৎস
১। bn.banglapedia.org/index.php?title=%E0%A6%96%E0%A6%A8%E0%A6%BE
২। বই: কিংবদন্তি খনা ও খনার বচন- পূরবী বসু
৩। youtube.com
৪। allmagazine.in
৫। androidwikinsta.com

Anindeta Chowdhury
Sub-editor
ROAR

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *