মুন্সিগঞ্জে প্রায় লক্ষ টাকা ব্যয়ী ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি গুলো কোথায়?

মোঃ রিয়াদ আহমেদ : সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর প্রথম নির্দেশ- পড়। পড়ার সবচেয়ে প্রাচীন, জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে বই। বই জ্ঞানের আধার। পৃথিবীর সকল জ্ঞান বইয়ের পাতায় ঘুমিয়ে থাকে। কোনো পাঠক যখন বইয়ের পাতা খোলে তখন ঘুমন্ত জ্ঞান জেগে ওঠে, কথা বলতে শুরু করে পাঠকের সাথে। জ্ঞানের আলো তখন পাঠককে আলোকিত করে, পাঠকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ব চরাচরে। কবি জসিমউদ্দীন যথার্থই বলেছেন, বই জ্ঞানের প্রতীক, বই আনন্দের প্রতীক। মনীষী লিও টলস্টয় শুধু এতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি বলেছেন, পৃথিবীতে মানুষের তিনটি জিনিস প্রয়োজন, বই, বই, বই। এফ টরুপার বলেছেন, একখানি ভালো বই শ্রেষ্ঠ বন্ধু, আজ এবং আগামীকালের জন্য। সেই জ্ঞানের প্রতীক, মানুষের পরম ভালো বন্ধুকে ২০১৫ সালে মুন্সিগঞ্জবাসীকে উপহার দেন সাবেক জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল।

২০১৫ সালে ১৯ই ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জ জেলায় ৬৯টি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির যাত্রা শুরু হয়। জেলার ৬৭টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় একটি করে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি তৃণমূলপর্যায়ে মানুষের ঘরে ঘরে বই পৌঁছবে বলে আশাব্যক্ত করেন উদ্যোক্তা সাবেক মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল।কিন্তু উপকৃত হয়নি ইউনিয়ন পর্যায় বই প্রিয় মানুষ গুলো। কেউ কেউ আজও দেখেনি প্রায় লক্ষ টাকা ব্যয়ী সেই ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি গুলো। পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে আছে ইউপি ভবনের পাশে কোনোটা ইউপি চেয়ারম্যানের বাসায়। খোঁজখবর রাখেনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ। প্রতিটি ইউনিয়নের নিজস্ব অর্থায়নে এই লাইব্রেরি গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়।প্রতিটি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির ভ্যানটি তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা। বইকেনা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকার। লাইব্রেরিয়ানকে মাসিক অতিরিক্ত বেতন দেয়া হচ্ছে ১৫শ’ টাকা। প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে এই লাইব্রেরির যাবতীয় খোঁজ-খবর ও বইয়ের চাহিদা রেজিস্ট্রার তদরাকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো ইউপি সচিবকে। আর এই লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো ইউপি চৌকিদারকে। দায়িত্ব অবহেলা ও নজরদারীর অভাবে আজ মুন্সীগঞ্জের মানুষ পাচ্ছে না তাদের, কবি জসিমউদ্দীনের মতে জ্ঞানের প্রতীক, এফ টরুপারের মতে মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু, আর রবীন্দ্রনাথের মতে আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ উপায় বইকে।

যসলং ইউনিয়নের বাসিন্দা ফারুক মোল্লা বলেন, কিছুদিন আগে ইউনিয়ন পরিষদের সামনে একটি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির ভ্যান দেখেছি, কিন্তু তার মধ্যে কোনো বই দেখিনি, আর তার সেবা পাবো দূরের কথা।

সেরাজাবাদ রানা শফিউল্লাহ কলেজে পড়ুয়া ফাহিম ইসলাম জানান, তার ইউনিয়ন কামারখাড়া এখনো সে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির কার্যক্রম দেখেননি, এবং সে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সুবিধা না পাওয়া আক্ষেপ প্রকাশ করেন।

মহাখালী ইউনিয়নের রাকিব হাসান বলেন, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সুযোগ- সুবিধা ও বই পড়ার থেকে বঞ্চিত আমরা। কখনো এরকম কিছু দেখিনি আমাদের ইউনিয়নে।

শিলই ইউনিয়নের সৌরভ বেপারি জানান, আমাদের ইউনিয়নের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির ভ্যানটি ইউপি চেয়ারম্যানের বাসায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। তার থেকে কোনো সেবা পায়নি আমরা।

মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের ফিরোজ হোসেন জানান, এই রকম কোনো ভ্যান আমাদের গ্রামে বই নিয়ে আসেনি। আমরা ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির থেকে সেবা পেতে আগ্রহি।

তরুন লেখক, সাংবাদিক ও সংগঠক শেখ রাসেল ফখরুদ্দীন বলেন, সর্বসাধারণের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি জাতির মেধা মনন ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারণ ও লালনপালনক করে পাঠাগার । মুন্সীগঞ্জের ইতিহাস পাঠ করে দেখা যায় শত বছর পূর্বেও হাসাইল বানারীতে একাধিক সমৃদ্ধশালী পাঠাগার ছিলো। কিন্তু বর্তমানে জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার যুগে এসেও সেই হাসাইল বানারীতে একটিও পাঠাগার নেই তা সত্যিই আমাদের ব্যথিত করে।

এরকম ভাবে দিঘীরপাড়, বাংলাবাজার, কে-শিমুলিয়া সহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বই পড়ুয়া মানুষ গুলো তাদের প্রতিক্রিয়া জানান। তারা দাবি এবং প্রত্যাশা করেন আন্তর্জাতিক বই মেলার মাস ও জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসের মাস ফেব্রুয়ারি মাস, এই মাসেই বর্তমান জেলা প্রশাসক ও প্রত্যেক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এবং দায়িত্ববান ব্যক্তিগণ খুব শীঘ্রই একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে যাতে আবারও বই উৎসব সৃষ্টি হয় সকল ইউনিয়নে। বই পড়ুয়া মানুষ গুলো যাতে বঞ্চিত না হয় ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সেবা থেকে। কিন্তু অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির দৃষ্টান্ত মূলক ভূমিকা রেখে জ্ঞানের অালো ছড়িয়ে দিচ্ছে মুন্সীগঞ্জ পৌরসভায়। মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সদস্য হয়েছে সরকারি হরগঙ্গা কলেজে পড়ুয়া আবির ও মেহেদী তারা নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির থেকে বই নিয়ে পড়েন।

জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানরে কাছে বিষয়টি অবগত করলে তিনি জানান, ভ্রম্যমান লাইব্রেরীগুলো সাবেক জেলা প্রশাসক সাইফুল হাসান বাদল, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রদের সহযোগিতায় চালু করেছিলেন। ভ্যান ড্রাইভারদের বেতনের ব্যবস্থা করার কথা ছিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়রম্যানদের। ড্রাইভারদের বেতনের ব্যবস্থা না করার কারণেই ভ্রাম্যমান লাইব্রেরীগুলো দেখা যাচ্ছে না। আগামী মাসের মাসিক মিটিংয়েে চেয়ারম্যানদের সাথে আলোচনা করে লাইব্রেরীগুলো কিভাবে নতুন পরিসরে পরিচালনা করা যায় তার ব্যবস্থা গ্রহণ করার আশ্বাস দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *