রক্তাক্ত মোল্লাকান্দি : অস্ত্র-গুলিসহ সন্ত্রাসী জাহাঙ্গীর গ্রেপ্তার

মুন্সিগঞ্জের চরাঞ্চলের মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের ত্রাস জাহাঙ্গীর হোসেন সরকার (৩৯)-কে অস্ত্র ও গুলিসহ গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এ সময় তার কাছ থেকে ১ টি বিদেশি পিস্তল, ১টি ম্যাগাজিন, ৩ রাউন্ড পিস্তলের গুলি এবং ১ টি ১২ বোর শর্টগান উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছে জাহাঙ্গীর সরকারের সহযোগী আমির হোসেন বেপারী (৪৮)-কে।

সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে র‌্যাব-১১ সিপিসি-১ এর মুন্সিগঞ্জ ক্যাম্পের কোম্পানি অধিনায়ক সহকারি পরিচালক মো. নাহিদ হাসান জনি। গত রোববার বিকেল সাড়ে ৪টায় তাদের মাকহাটি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

র‌্যাবের সহকারি পরিচালক মো. নাহিদ হাসান জনি জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের মাকহাটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে মহেশপুর গ্রামের মৃত আবুল কাশেম সরকারের ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেন সরকার ও তার সহযোগী ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি মাকহাটি গ্রামের মৃত জয়নাল আবেদীন ছনু বেপারির ছেলে আমির হোসেন বেপারিকে আটক করা হয়েছে। এ সময় জাহাঙ্গীর হোসেন সরকারের কাছ থেকে ওই অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মুন্সিগঞ্জ সদর থানায় অপরাধিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সন্ত্রাসী জাহাঙ্গীরকে আটকের পর তাকে ছাড়িয়ে নিতে বাঁধা সৃষ্টি করে। এই ঘটনার পেছনে কাজ করে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মহসিনা হক কল্পনা। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মাকহাটি জেসি স্কুল ছুটি দিয়ে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করে তাদের গাড়ির গতিরোধ করতে এবং সন্ত্রাসী জাহাঙ্গীরকে ছাড়িয়ে নিতে।

মুন্সিগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আলমগীর হোসাইন জানান, গ্রেপ্তারকৃত চিহ্নিত সন্ত্রাসী জাহাঙ্গীর সরকারের বিরুদ্ধে দুইটি মামলার ওয়ারেন্ট ছিলো।

পুলিশ জানায়, জাহাঙ্গীর হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরকসহ ৪টি এবং আমির হোসেন বেপারির বিরুদ্ধে বিস্ফোরকসহ ৫টি মামলা রয়েছে।

এদিকে, গত ৩রা জানুয়ারি সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থেমে থেকে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের চরডুমুরিয়া, আমঘাটা, কংসপুরাসহ কয়েকটি গ্রামে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মহসিনা হক কল্পনা গ্রুপের গামছা ইউসুফ, জাহাঙ্গীর সরকার, মিল্টন মল্লিক ও স্বপন দেওয়ানের নেতৃত্বে এবং সাবেক চেয়ারম্যান রিপন পাটোয়ারি গ্রুপের তার ভাই শিপন পাটোয়ারি, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজহার মোল্লার নেতৃত্বে সংঘর্ষকালে ব্যাপক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয় এবং কয়েকশ’ ককটেল ও গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটে। গুলি ও বোমার আঘাতে ২০ জন আহত হয় এবং মানিক কাজী (৫০) নামে একজন নিখোঁজ হয়। পরে ৬ই জানুয়ারি চৈতারচর খালে মানিকের মরদেহ ভেসে উঠলে পুলিশ তার মরেহ উদ্ধার করে।

এঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে এবং অজ্ঞাতনামা ২০০-৩০০ জনকে আসামি করে সদর থানায় মামলা করেন।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত ইউপি নির্বাচন থেকে মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন অশান্ত হয়ে উঠেছে। ওই নির্বাচনে জাহাঙ্গীর সরকার ও ইউসুফ ফকির ওরফে গামছা ইউসুফ গং নৌকার প্রার্থী রিপন পাটোয়ারি বিপক্ষে কাজ করে। এতে করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী মহসিনা হক কল্পনা জয়ী হয়। ওই ইউপি নির্বাচনের দিন থেকে প্রায় প্রতিদিনই মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ককটেল ও প্রকাশ্যে অস্ত্রের যুদ্ধ চলছে। প্রতিটি সংঘর্ষেই জাহাঙ্গীর ও গামছা ফকিরের নেতৃত্বে চলে এই অস্ত্র যুদ্ধ।

পাশাপাশি প্রতিপক্ষের নৌকার পরাজিত চেয়ারম্যান রিপন পাটোয়ারির ভাই শিপন পাটোয়ারি, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজহার মোল্লার গ্রুপ নেতৃত্ব দেন রিপন পাটোয়ারির পক্ষে। সাবেক চেয়ারম্যান রিপন পাটোয়ারি ও বর্তমান চেয়ারম্যান মহসিনা হক কল্পনা গ্রুপের শেল্টারে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের বিভাজন দুই গ্রুপের দুই শীর্ষ নেতা। ওই শীর্ষ নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মোল্লাকান্দি উত্তপ্ত হয়ে রক্তাক্ত জনপদে পরিণত হয়েছে। বিএনপি আমলেও সেখানে একই অবস্থা বিরাজ করছিলো। মাঝপথে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের এম ইদ্রিস আলী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে মোল্লাকান্দি পাঁচ বছরের মতো শান্ত অবস্থা বিরাজ করছিলো। দলীয় নেতাদের শেল্টার আর আধিপত্য বিরাজ নিয়ে মেল্লাকান্দির সাধারণ মানুষ সন্ত্রাসীদের কাছে এখন পুরোপুরি জিম্মি। ভয়ে আতঙ্কে কোমলমতি শিশুদের পড়াশুনা বন্ধ হয়ে পড়েছে।

মহসিনা হক কল্পনা ইউপি চেয়ারম্যান হওয়ার পর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে গামছা ইউসুফ, জাহাঙ্গীর সরকার ও তাদের গ্রুপের সদস্যরা। এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসারও বিস্তার ঘটনায়। সন্ত্রাসী গ্রুপটি মোল্লাকান্দি ছাড়াও পাশ্ববর্তী কাঠাদিয়া-শিমুলিয়া এবং দিঘীরপাড় ইউনিয়নের গিয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকা- করে চলেছে।

স্থানীয়রা আরও জানিয়েছেন, মোল্লাকান্দিতে রিপন পাটোয়ারি ও কল্পনা গ্রুপের সন্ত্রাসীদের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এবং ককটেল মজুদ আছে। তাদের মদতদাতাসহ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারে আইনপ্রযোগকারী সংস্থার যৌথ অভিযান না হলে মোল্লাকান্দি অশান্তই থেকে যাবে।
এদিকে, জাহাঙ্গীর ও তার সহযোগী আমির গ্রেপ্তারে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সাময়িক স্বস্থি ফিরে এসেছে।#

মোজাম্মেল হোসেন সজল
ব্রেকিং নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *