মুন্সীগঞ্জ-২ আসন : মাঠে আওয়ামী লীগ, অনুপস্থিত বিএনপি

ব্যাপক সাংগঠনিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গীবাড়ী) আসনে আওয়ামী লীগে নির্বাচনী হাওয়া বইছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রতিদিনই মাঠে-ময়দানে সভা-সমাবেশ করছেন।

এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে বিএনপি। বিএনপির প্রার্থীর তালিকায় একাধিক সম্ভাব্য নাম শোনা গেলেও তারা মাঠে নেই। দলীয় কোন্দলে কর্মীদের সঙ্গেও প্রার্থীদের যোগাযোগে ভাটা পড়েছে। এক্ষেত্রে এই আসনে এখন আওয়ামী লীগের সুদিন বইছে। মুন্সীগঞ্জ-২ নির্বাচনী এলাকা এক সময় বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিলো।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ-২ আসনটি প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। ওই নির্বাচনে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার ১৩টি ও লৌহজং উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান সিনহাকে প্রায় ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি ১৯৯৬ সালে মুন্সীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হওয়ার পর বিএনপির এই দুর্গে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে হাল ছাড়েননি।

এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাবেক এসপি মাহবুব উদ্দিন আহম্মেদ, বীর বিক্রম।

বিএনপির টিকেটে ১৯৯৬ সালে এই আসনে প্রথম সংসদ সদস্য হন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান সিনহা। এরপর ২০০১ সালে সংসদ সদস্য হওয়ার পর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০৪ সালে বি. চৌধুরী বিএনপিচ্যুত হওয়ার পর মুন্সীগঞ্জ জেলার বিএনপির রাজনীতিতে একক আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে দলকে ফেলেছেন ভাঙনের মুখে। লৌহজং এবং টঙ্গীবাড়ী উপজেলাতেই বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠন ভাগে ভাগে বিভক্ত। তার নিজের লৌহজং উপজেলার কলমা ইউনিয়ন বিএনপিকে সামাল দিতে পারেননি। বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ একযোগে পদত্যাগের ঘটনাও ঘটেছিলো।

এরপর কেন্দ্রীয় বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহা কলমা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক হয়েছিলেন নিজেই। কমিটি গঠন করতে গিয়ে তার বাড়িতে একাধিকবার দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে হামলা, চেয়ার-টেবিল ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। দলীয় কোন্দল আর নড়বড়ে অবস্থানের কারণে এই আসনটি বিএনপি পুনরুদ্ধার করতে পারবে কিনা- এ নিয়ে আলোচনা রয়েছে সচেতন মহলে।

তবে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগে সৃষ্টি হচ্ছে কোন্দল। প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে ক্রমাগত। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়ে উঠে। তবে, তৃণমূলে বিএনপির এক বিশাল সমর্থকও রয়েছে। সবমিলিয়ে প্রার্থী ঘিরে বড় দুই দলেরই কোন্দল থাকায় আগামী নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যেই মর্যাদার লড়াই হবে। এখানে জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, বামদলসহ অন্যান্য দলের তেমন ভোট ব্যাংক বা জনসমর্থন নেই।

আগামী নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হচ্ছেন মিজানুর রহমান সিনহা। তিনি এলাকায় দানশীল হিসেবে পরিচিত। মাঝে মধ্যে এলাকার বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তাকে অংশ নিতে দেখা যায়। তবে, তাঁর সাংগঠনিক তৎপরতায় ক্ষুব্ধ অনেক নেতা। জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর মল্লিক রিপনের সঙ্গে অতি সম্প্রতি জেলা কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। সদ্য জেলা বিএনপির কমিটিতে তার সাধারণ সম্পাদক পদ কেড়ে নেয়ার জন্য রিপন মল্লিক সিনহাকে দায়ী করেছেন। জেলা বিএনপির কমিটিতে রিপন মল্লিককে সহ সভাপতি পদে রাখা হলেও তিনি সন্তুষ্ট নন। সর্ব কনিষ্ট সহ সভাপতি পদে রাখা হয়েছে রিপন মল্লিককে। আগামী নির্বাচনে জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটির সহ সভাপতি আলী আজগর মল্লিক রিপন রয়েছেন প্রার্থী তালিকায়।

টঙ্গীবাড়ীতে মল্লিক পরিবারের রয়েছে ব্যাপক আধিপত্য ও ভোট ব্যাংক। লৌহজং উপজেলার চেয়ে টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় ভোটও বেশি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মিজানুর রহমান সিনহা তার নিজ উপজেলায় দাঁড়াতে পারেননি। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর চেয়ে লৌহজং উপজেলায় সিনহা ১৯ হাজার কম ভোট পেয়েছিলেন।

এছাড়া বিএনপি থেকে প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন, কেন্দ্রীয় বিএনপির বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ। তবে, এলাকায় তাদের নির্বাচনী তৎপরতা নেই।

এদিকে, জেলা বিএনপির সহ সভাপতি আলী আজগর মল্লিক রিপন বলেছেন, তিনি দলীয় টিকেট চাইবেন। তাকে না দেয়া হলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়বেন।

তার সমর্থকরা জানিয়েছেন, মিজানুর রহমান সিনহাকে হারাতে যা করণীয় তারা তা করবেন।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন, বর্তমান সংসদ সদস্য সাবেক হুইপ সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, অ্যাটর্নী জেনারেল মাহবুবে আলম, লৌহজং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ শিকদার, টঙ্গীবাড়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ।

সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি প্রায় প্রতিদিনই দুই উপজেলায় সরকারি কর্মসূচিসহ দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের এনেও দলীয় জনসভা করছেন। জনসভাগুলোতে ব্যাপক কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি ঘটছে।

সম্ভাব্য প্রার্থী রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মাঝে মধ্যে এসে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আগামী নির্বাচনে প্রার্থীর হওয়ার ঘোষণা দিলেও টঙ্গীবাড়ী ও লৌহজং উপজেলার দলীয় নেতাকর্মীদের আস্থাভাজন হতে পারেননি। তবে, তিনি হাল ছাড়েননি। এলাকার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে ধীরে ধীরে এলাকার ভোটারদের মাঝে পরিচিতি লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে, প্রার্থী তালিকায় শক্ত অবস্থানে রয়েছেন লৌহজং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ শিকদার। তিনি প্রার্থীর হওয়ার ঘোষণা দিলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নড়েচড়ে বসে। দলের বাইরেও এলাকায় রয়েছে তাঁর বিশাল ইমেজ। দল ও কর্মীদের মাঝে দুই হাত খুলে খরচ করছেন, দিচ্ছেন নানা সুযোগ-সুবিধা। আর এসব কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ তরুণদের কাছে প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছেন আব্দুর রশিদ শিকদার। প্রায়দিনই তিনি এলাকায় নির্বাচনী গণসংযোগ, দলীয় কর্মসূচিসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন। রশিদ শিকদার এশিয়ান হকি ফেডারেশনের কার্যকরী পরিষদের পরিচালক, বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ও ঊষা ক্রীড়া চক্রের সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন।

শিকদার সমর্থকদের দাবি, রশিদ শিকদার লৌহজং উপজেলা আওয়ামী লীগে সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর সেখানে দলকে শক্তিশালী করেছেন নিরলসভাবে।

প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন, জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলা পরিষদের দু’বারের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ। তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার আগেই দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে আর্থিক সহায়তায়সহ নানা জনহিতকর কাজ করেন এবং বর্তমানে তা অব্যাহত রেখেছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার বদৌলতে ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আরও বেশি সহযোগিতা করছেন। দলের বাইরেও ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ঢালী মোয়াজ্জেম হোসেন এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়া, জাতীয় পার্টির জেলা কমিটির সভাপতি মো. কুতুবউদ্দিন আহম্মেদ, কেন্দ্রীয় নেতা নোমান মিয়া ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জামাল হোসেনও দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌঁড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।

অবজারভার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *