বাংলাদেশিদের উষ্ণ আতিথিয়তা কখনো ভুলার নয় – ইয়োশিনারি ক্যাসুও

অভিবাসীদের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করার মানবিক দায়িত্ব নিয়ে জাপান প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্যোগে টোকিওর ইতাবাসী ওয়ার্ডে ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটি (এপিএফবেস )। মূলত প্রবাসী বাংলাদেশি লিয়াকত হোসেন সহ কয়েকজন প্রবাসী মিলে নানান প্রতিকূলতার চরাই উতরে এই সংগঠনের গোড়াপত্তন করেন। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন স্থানীয় শ্রম আইন বিষয়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ও বাংলাদেশের পরম বন্ধু মানবতাবাদী জাপানি ইয়োশিনারি ক্যাসুও।পরবর্তীতে প্রবাসী বাংলাদেশি মাসুদ করিম এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হন। প্রতিষ্ঠার পরপর ই বাংলাদেশি অভিবাসীরা সংগঠনের কার্যালয়ে এসে ইয়োশিনারির সঙ্গে তাদের সমস্যা নিয়ে কথা বলতেন। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ এবং তাদের প্রতি সদয় ছিলেন। তার মূল্যবান পরামর্শে বেশিরভাগ প্রবাসীর সমস্যার সমাধান হয়। এ খবর ছড়িয়ে পরলে পাকিস্তান, ফিলিপাইন, চীন ও ইরানের অভিবাসীরাও বিনামূল্যে পরামর্শের জন্য তার কাছে আসতে থাকে। পরে সবার মতামত নিয়ে সংগঠনের নাম এশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটি বা এপিএফএস নামকরণ করা হয় ।

অলাভজনক এই বৃহৎ মানবাধিকার সংগঠনটি জাপানে অভিবাসীদের মর্যাদার সঙ্গে থাকবার জন্যে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। শ্রমিকদের কল্যাণে সরকারি সুবিধাগুলোর যথাযথ ব্যবহার, বেতন ও সুযোগ-সুবিধা আদায়, অসুস্থতা ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ আদায়, চিকিৎসা সুবিধা আদায়, বিনামূল্যে আইনি সহায়তা, বৈশ্বিক অভিবাসন, বহুজাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, ভিসা সুবিধা বঞ্চিত অভিবাসীরা জাপানের উন্নয়নে শ্রম দিয়েছে তাদের ভিসার ব্যবস্থার জন্য কাজ করে থাকে।

সম্প্রতি প্রবাসীদের এই অকৃতিম বন্ধু বাংলাদেশিদের সুহৃদ এপিএফএস এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়োশিনারি ক্যাসুওর মুখোমুখি হয়েছিলেন নিহন বাংলা ডট কম অনলাইন পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি জাপান প্রবাসী হাসিনা বেগম রেখা। সাক্ষাৎকারটির উল্লেখযোগ্য অংশ নিহন বাংলা ডট কম পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

নিহন বাংলা ডট কম:- APFS করার ইচ্ছা বা পরিকল্পনা কিভাবে শুরু করলেন?

ইয়োশিনারি ক্যাসুও:- এপিএফএস হচ্ছে এশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির সংক্ষিপ্ত রূপ। অর্থাৎ এশিয়ান দেশগুলো থেকে আগত নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে একত্রীকরণ করা। একক ভাবে আসলে কোনো কিছু করা সম্ভব হয়ে উঠে না । তাই সংগঠিত হয়ে সাংগঠনিক ভাবে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারলে তা কার্যত ভূমিকা রাখতে সহায়ক হয়। তাই এপিএফএস গড়ে তুলি।

নিহন বাংলা ডট কম:-এপিএফএস এর বর্তমান কার্যক্রম কি কি ? এবং কিভাবে চলছে ?

ইয়োশিনারি ক্যাসুও: এপিএফএস আসলে ভিসাহীনদের নিয়েই কাজ করে না বরং ভিসাধারীদের বিভিন্ন সমস্যায় কাজ করে থাকে। যেমন-স্বাস্থ্য বীমা, পেনশন আদায়, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ আদায় করা।

এপিএফএস এর সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয় পরিচালনা পর্ষদের সমন্বিত উদ্যোগ এবং সম্মতির ভিত্তিতে। আর পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হয় সংগঠনের সাধারণ সভায় সদস্যদের প্রত্যক্ষ সমর্থনের মাধ্যমে। প্রথমে স্টার্টিং মেম্বার হতে হয়। তারপর স্টিয়ারিং কমিটির মেম্বার। স্টিয়ারিং কমিটির মেম্বার মোট ২৫ জন। এই ২৫ জনের প্রত্যক্ষ ভোটে কমিটি গঠন করা হয়।

নিহন বাংলা ডট কম:-এপিএফএস প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর উল্ল্যেখ কোন কোন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছিল বলবেন কি?

ইয়োশিনারি ক্যাসুও:- হ্যা,প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর এপিএফএস এর ব্যানারে আমাদের প্রথম আয়োজনটি ছিল ইতাবাসী শহরের তাকাশিমাদাইরা প্রাইমারি স্কুলের মাঠ ভাড়া নিয়ে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন। উক্ত প্রীতি ম্যাচে ২টি টিম ছিলো। বাংলাদেশ একাদশ এবং জাপান একাদশ। কোন টিম জিতেছিল তা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। খেলা দেখতে ৪০০ এর বেশি দর্শক সেময়ম হয়েছিল বলে মনে পরে। বেশ সাড়া ফেলেছিলো সেই আয়োজনটি।

এরপর আমরা বিদেশিদের নিয়ে জাপানের মাটিতে “মে ডে” ৱ্যালির আয়োজন করেছি নিয়মিত ভাবে। আপনি জানেন যে, জাপানে মে ডে তে কোনো সরকারি ছুটি থাকে না। এখানেও বাংলাদেশিদের কর্মতৎপরতা এবং অংশগ্রহণ ছিলো সবচেয়ে বেশি।

নিহন বাংলা ডট কম:- তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন এপিএফএস -উল্ল্যেখ করার মতো বাংলাদেশিদের অবদান রয়েছে?

ইয়োশিনারি ক্যাসুও:- নির্দ্বিধায় তা বলতে পারি। বাংলাদেশিদের ছাড়া এপিএফএস এর কার্যক্রম এবং সংগঠন সম্ভব হতো না। এপিএফএস প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর প্রবাসী বাংলাদেশি মাসুদ করিম এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হন। এই ধারা আজ ও চলমান। অর্থাৎ এপিএফএস এর সাধারণ সম্পাদক বরাবর ই একজন বাংলাদেশি নির্বাচিত হয়ে আসছেন। বর্তমান সাধারন সম্পাদক হাসান ও একজন বাংলাদেশি।

নিহন বাংলা ডট কম:- মোট কত জনের মতো অভিবাসী এপিএফএস দ্বারা উপকৃত হয়েছিল?

ইয়োশিনারি ক্যাসুও:- প্রায় ৮০০ এর মতো কাজ আমরা করতে পেরেছি।

নিহন বাংলা ডট কম:- এশিয়ান ছাড়া অনান্য দেশের অভিবাসীরা কি এপিএফএস এর সদস্য হতে পারবেন?

ইয়োশিনারি ক্যাসুও:- আমরা এশিয়ানদের নিয়ে শুরু করলেও এখন আফ্রিকা, ইউরোপ,দক্ষিণ আমেরিকার অভিবাসীরা ও এর সদস্য রয়েছেন। শুধু যে অভিবাসীরা এর সদস্য তা কিন্তু তা নয়। জাপানিরা ও এর সদস্য রয়েছে।

নিহন বাংলা ডট কম:- সাধারণ সভা কিভাবে আহ্বান করা হয়ে থাকে?

ইয়োশিনারি ক্যাসুও:- গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি বছর সাধারণ সভা হয়ে থাকে। তবে নির্বাচন হয় প্রতি তিন বছর পরপর। অর্থাৎ পরিচালনা পর্ষদ ৩ বছর মেয়াদি হয়ে থাকে।

2

নিহন বাংলা ডট কম:- এপিএফএস এর সদস্য হতে হলে কি কি যোগ্যতা লাগে ?

ইয়োশিনারি ক্যাসুও:- কোনো পূর্ব যোগ্যতার প্রয়োজন নেই।ই চ্ছে করল; এ যে কেউ এপিএফএস এর সদস্য হতে পারবেন।

তবে কথা বলতে চাইলে আগে থেকে সাক্ষাৎ দেয়ার সময় নিয়ে রাখতে হবে। কারণ,সবসময় অফিস থাকা হয়না। আবার অফিস এ থাকলেও অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই আগে থেকে সময় নিয়ে রাখলে ভালো হয়।

4

নিহন বাংলা ডট কম:- আপনি কি কখনো বাংলাদেশে গিয়েছেন?

ইয়োশিনারি ক্যাসুও:- হ্যা,আমি একাধিকবার বাংলাদেশে গিয়েছি।

নিহন বাংলা ডট কম:- মোট কতবার বাংলাদেশে গিয়েছিলেন ? বাংলাদেশের কোন কোন এলাকায় গিয়েছিলেন?

ইয়োশিনারি ক্যাসুও:- ১৯৮৯ সালে প্রথম বাংলাদেশে গিয়েছি। ২০ বারের ও বেশি বাংলাদেশে গিয়েছি। প্রথম গিয়েছিলাম ঢাকা ও চট্টগ্রামে। এরপর ১৯৯৪ সালে খুলনায়। এরপর থেকে নিয়মিত ভাবেই যাচ্ছি। ২০১৫ থেকে মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর এলাকায়। সেখানে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। রিক্কিও বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপানে বাংলাদেশিদের আগমন এর কারণ, উত্থান, পতন এর উপর এক গবেষণা কাজের সাথে আমি জড়িত হয়ে যাই। রিক্কিও বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে মুন্সীগঞ্জের – বিক্রমপুর এলাকার জাপান প্রবাসীদের জাপান আসার কারণ, হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া আবার কমে যাওয়া, দেশে গিয়ে অর্জিত অর্থের ব্যবহার কিভাবে করেন সেই সব বিষয়ে গবেষণা।

নিহন বাংলা ডট কম:-বাংলাদেশের কোন বিষয়টি আপনার কাজে ভালো লেগেছে? আর কোনটি বা খারাপ লেগেছে?

ইয়োশিনারি ক্যাসুও:- বাংলাদেশিদের উষ্ণ আতিথিয়তা কখনো ভুলার নয়। এমন ও হয়েছে আমাকে চিনেন না, জানেন না অথচ আমাকে আপ্যায়ন করানোর জন্য নিজ আঙিনা থেকে মুরগি ধরে জবাই করে রান্না করে আমাকে খাইয়েছেন। আর বাংলাদেশের মুরগির মাংস যে একবার খেয়েছে, সে কোনোদিনই তা ভুলতে পারবে না।

আর মনে রাখার মতো খারাপ কিছুই আমার অভিজ্ঞতায় নেই। শুধু প্রথম যখন বাংলাদেশে যাই জিয়া বিমান বন্দরে (বর্তমানে হয়তো শাহজালাল) নেমে চারদিক অন্ধকার এবং বিমান বন্দরে ছিন্নমূল শিশুদের হাতপাতা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। যদিও শহরে প্রবেশ করার পর শহরের আলোক উজ্জ্বলতা দেখে তেমন খারাপ লাগেনি। তবে,এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অনেকটাই উন্নত হয়েছে।

নিহন বাংলা ডট কম:- বাংলাদেশের জন্য আপনার কিছু করার ইচ্ছা আছে কি?

ইয়োশিনারি ক্যাসুও:- ইচ্ছা অবশ্যই আছে। বাংলাদেশের নারীদের জন্য কিছু করার ইচ্ছা করার থেকে তাদের হাতে প্রস্তুত বিভিন্ন সরঞ্জাম (চটের ব্যাগ) জাপানে নিয়ে এসেছিলাম। যদিও সবটা আমরা বিক্রয় করতে পারিনি। কারণ,সে সময় প্রযুক্তি ততটা উন্নত ছিলো না। জাপানের মার্কেটে ব্যাগ গুলো ছিলো সেকেলে। এখন বাংলাদেশেও প্রযুক্তি অনেক উন্নত হয়েছে।

3

নিহন বাংলা ডট কম:- প্রবাসীদের প্রতি আপনার উপদেশ কি থাকবে?

ইয়োশিনারি ক্যাসুও:- প্রবাসীদের প্রতি আমার অনুরোধ জাপানে যদি থাকবেন তাহলে জাপানের আইনকে সম্মান করুন। আপনাদের প্রজন্মকে জাপানের সাথে মিশে যাওয়ার জন্য উদবুদ্ধ করুন। নিজেদের সংস্কৃতি চর্চা অবশ্যই করবেন কিছুই চাপিয়ে দিয়ে নয়।

নিহন বাংলা ডট কম:-নিহন বাংলা ডট কম অনলাইন পত্রিকার পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

ইয়োশিনারি ক্যাসুও:- ধন্যবাদ আপনাকেও ।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন -হাসিনা বেগম রেখা

বিশেষ সহযোগিতা রাহমান মনি এবং গোলাম মাসুম জিকো

বিঃদ্রঃ বিনা অনুমতিতে সাক্ষাৎকারটি কপি বা সংকলন না করতে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।

নিহন বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *