হতাশ মুন্সীগঞ্জের রণাঙ্গনের বীর যোদ্ধারা

মোজাম্মেল হোসেন সজল: বিজয়ের ৪৬ বছরেও মুন্সীগঞ্জের বধ্যভূমিগুলোর স্মৃতি সংরক্ষণ, মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম না উঠা এবং বিভিন্ন দলীয় সরকারের আমলে অমুক্তিযোদ্ধাদের নাম তালিকাভুক্ত হওয়ায় জেলায় একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধারা হতাশ। তারা আজও বিজয়ের স্বাদ পাননি। কিছু বধ্যভূমি সনাক্ত করা হলেও তা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।

১৯৭১ সালে মুন্সীগঞ্জ সদরের সাতানিখীল, কেওয়ার চৌধুরী বাড়ি, টঙ্গীবাড়ী উপজেলার আব্দুল্লাহপুরের পালবাড়ি, গজারিয়া উপজেলার গোসাইচর, লৌহজংয়ের গোয়ালী মান্দ্রা, সিরাজদিখানের মেছো বাজারসহ অনেক জায়গাতেই হানাদার বাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালায়। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও এসব জায়গার বধ্যভূমিগুলো আজও সংরক্ষণ করা হয়নি। মুন্সীগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা কমা- কাউন্সিলের অন্তবর্তীকালীন কমা-ার ও জেলা প্রশাসক বলেছেন, মুন্সীগঞ্জে যে সব বধ্যভূমি আছে তার একটি তালিকা মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এদিকে, মুন্সীগঞ্জ পৌর এলাকার আব্দুর রউফ নামে এক স্বাধীনতা বিরোধীর নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নথিভুক্ত রয়েছে।

কিন্তু এই স্বাধীনতা বিরোধী এখন মুক্তিযোদ্ধা বলে প্রচার-প্রচারণা থাকায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষিপ্ত। অভিযোগ উঠেছে, ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের জমানায় মুন্সীগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সভাপতি শাহজাহান সিকদারের হস্তক্ষেপে ওই স্বাধীনতা বিরোধী মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম লেখায়। বর্তমানে প্রয়াত শাহজাহান শিকদারও ছিলেন অমুক্তিযোদ্ধা। বিএনপি ও তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রসেস হওয়ার পর ২০০৯ সালের প্রকাশিত গেজেটেও তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মুক্তিযোদ্ধা জানিয়েছেন। ২০০৫ সালের পর আর নতুন মুক্তিবার্তা তৈরি না হওয়ায় মুক্তিবার্তায় (লালবার্তা) এই স্বাধীনতা বিরোধীর নাম উঠেনি। নতুন করে মুক্তিবার্তা হলে সেখানে তার নাম উঠানোর জন্য চেষ্ঠা তদবির করছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে, শ্রীনগর, লৌহজং, গোয়ালীমান্দ্রা, মুন্সীগঞ্জ থানাসহ বিভিন্নস্থানে সম্মুখযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের একের পর এক সফল অপারেশনের ফলে সরকারি হরগঙ্গা কলেজ ক্যাম্প থেকে ১১ ই ডিসেম্বর ভোরে পাকবাহিনী সমস্ত আস্তানা ঘুটিয়ে শহর থেকে চলে গেলে হানাদার মুক্ত হয় মুন্সীগঞ্জ। এরআগে ১৯৭১ সালের ৯ মে ২০০ পাকবাহিনীর সদস্য এক মেজরের নেতৃত্বে শহরে প্রবেশ করে হরগঙ্গা কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে। এই ক্যাম্পে বিভিন্ন জায়গা থেকে বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষদের ধরে এনে নির্যাতন শেষে তাদের গুলি করে হত্যা করার পর কলেজের দক্ষিণ পূর্বে একটি ডুবায় মরদেহগুলো ফেলা হতো। ১৯৭২ সালে এই জায়গাটি বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নত করা হয় এবং একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়। কিন্তু জেলার একমাত্র কেন্দ্রীয় এই বধ্যভূমিটি সারাবছরই অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে।

মন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মহাকালী ইউনিয়নের কেওয়ার চৌধুরি বাড়ি থেকে শিক্ষক, আইনজীবীসহ ১৪ বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে কেওয়ার সাতানিখীল গ্রামের খালের পাড়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার আব্দুল্লাহপুরের পাল বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে ওই বাড়ির মালিক অমূল্যধন পালসহ ১৬ জনকে হত্যা করে মরদেহগুলো পাল বাড়ির পুকুরে পাড়ে ফেলে দেয় পাকসেনারা। পাকবাহিনী গজারিয়ার উপজেলার গোসাইচর গ্রামে ঢুকে ৩৫০ জন গ্রামবাসীকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে। এভাবে জেলার বিভিন্নস্থানে পাকবাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালায়।

এদিকে, বাংলাদেশ নামে একটি নতুন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র লাভের ৪৬ বছরেও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই তাদের নাম লেখাতে পারেননি। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এই বছর তারা শেষবারের মতো অনলাইনে আবেদন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে এমনই দুইজন জানালেন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত না হওয়ার কষ্টকথা।

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চিতলিয়া বাজারের মৃত শ্রী রমেশ চন্দ্র নাগের ছেলে শ্রী জগদীশ চন্দ্রনাগ। তিনি একজন কবি ও লেখক। ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা এবং সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি কখনও নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মনে করেন না। দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন-এটাই তার প্রাপ্তি। কিন্তু মেয়ের আবদার আর কান্নায় মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম উঠানোর আগ্রহ জন্মে তার।

তিনি জানালেন, মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট র‌্যালিগুলোতে তিনি থাকেন প্রথমভাগে। ১৯৯৬ প্রথম তালিকাভুক্তি হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করা পর থেকে আর খবর নেননি। এরপর শেষবারের মতো এই বছর তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন।

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার তাতিকান্দি গ্রামের মৃত ময়েজউদ্দিনের ছেলে আমির হোসেন খান। পাকিস্তানি আমলে তিনি বিমান বাহিনীর বাবুর্চি ছিলেন। আগরতলা থেকে ৬ মাস ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়েন। ২২ জনের একদল মুক্তিযোদ্ধা কুমিল্লা থেকে ঢাকার যাওয়ার পথে ঘোড়াশাল ব্রিজের কাছে পাকবাহিনীর গ্রেনেট হামলায় তিনি পঙ্গু হন। তার গ্রেনেট বিস্ফোরণে সহযোদ্ধাদের ২০ জনই মারা যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিএনপি জমানায় ১৯৯১ সালে ভাতাভুক্ত হওয়ার কথা বলে এলাকার এক বিএনপি নেতা তার কাগজপত্র নিয়ে দেড়লাখ টাকা দাবি করেন। এরপর তিনি কয়েকদফা চেষ্ঠা করেও তালিকায় নাম লেখাতে পারেননি। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ১২ হাজার টাকা সম্মানি পান বলে জানান। এছাড়া, মুক্তদিবসসহ মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে ডাকা হয়।

মুক্তিযুদ্ধকালীন বিএলএফ’র মুন্সীগঞ্জের তিন থানার কমা-ার ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাজী মোহাম্মদ হোসেন বাবুল জানালেন, হরগঙ্গা কলেজের পাশের কেন্দ্রীয় এই বধ্যভূমিটি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে, দেখভাল করার কেউ নেই। অনেক স্বাধীনতা বিরোধী ও তাদের সন্তানেরা আওয়ামী লীগে প্রবেশ করেছে। মুক্তিযোদ্ধা বান্ধব জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের নামফলক স্মৃতি স্তম্ভ জেলায় জেলায় করতেন, তাহলে ওইসব স্বাধীনতা বিরোধী ও তাদের সন্তান এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনরা আওয়ামী লীগে প্রবেশ করতে পারতো না।

মুক্তিযুদ্ধে বিএলএফ’র মুন্সীগঞ্জ জেলা কমা-ার (৬ থানার কমা-ার) কমা-ার, জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমা-ের দুই মেয়াদের নির্বাচিত সাবেক কমা-ার ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনিস উজ্জামান আনিস জানালেন, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকার গঠন করায় তারা তাদের মনমতো মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে নিয়েছে। তারা আদৌ মুক্তিযোদ্ধা ছিলো কিনা-সন্দেহ করছেন। সরকারের অনুমোদন ও আর্থিক সহযোগিতা ছাড়া জেলার বধ্যভূমিগুলোর স্থাপনা বা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না বলে তিনি এই বীর মুক্তিযোদ্ধা জানান।

মুন্সীগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা কমা- কাউন্সিলের অন্তবর্তীকালীন কমা-ার ও জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা জানান, যেসব বধ্যভূমিতে স্থাপনা তৈরি হয়নি, সে স্থাপনা তৈরির দায়িত্ব নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেয়া হলে, নির্দেশনা মতে কাজ শুরু করা হবে। যথাযথ মর্যাদার সাথে ১১ই ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জ হানাদারমুক্ত দিবসও পালন করা হবে জানান তিনি।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জানিয়েছে, বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলায় সরকারি ভাতা পাচ্ছেন ২ হাজার ৩০৪ জন মুক্তিযোদ্ধা ও ভাতাবিহীন আছে ২৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা। এইবছর মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য অনলাইনে আবেদন করেছেন আরও ৩৮৩ জন।

পিবিডি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *