স্লুইসগেট আছে খাল নেই!

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু: বছরের পর বছর ধরে দখল করে দোকানপাট, বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করায় মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের মাওয়া-গোয়ালীমান্দ্রা খালটি বিলীন হয়ে গেছে।

সরকারি অনুদানে বোরো স্কিমের জন্য নির্মাণ করা স্লুইসগেটই বর্তমানে শত বছরের পুরনো এ খালের একমাত্র চিহ্ন বহন করছে।

পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়ায় বছরের অর্ধেক সময় দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল, উত্তর মেদিনীমণ্ডল ও মাহমুদপট্টি নামের ৩টি গ্রাম জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত থাকে। ফলে হাজার হাজার গ্রামবাসী দুর্ভোগের মধ্যে জীবনযাপন করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে মেদিনীমণ্ডল ইউপি সদস্য আব্দুল হালিমের নেতৃত্বে সড়কের মাটি কেটে বোরো স্কিমের স্লুইসগেট সংলগ্ন খালের জায়গা ভরাট শুরু করায় শত বছরের পুরনো খালটির অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বর্তমানে খালের যেটুকু অস্তিত্ব আছে তাও বিলীন হয়ে গেলে এবং পানি প্রবাহিত হওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ওই তিন গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সরেজমিন দেখা যায়, অর্ধশত শ্রমিক নিয়ে ওই ইউপি সদস্য খাল ভরাট করে ভিটাবাড়ি তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে স্থানীয়রা বাধা দিলেও কোনো কাজ হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে গত ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির উপজেলা শাখার সভাপতি কাজী আলাউদ্দিন আল আজাদ ওই তিন গ্রামবাসীর পক্ষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর স্মারকলিপি দেন। স্মারকলিপিতে খালটি উদ্ধার করে পুনঃখননের দাবি জানানো হয়।

ওই স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, ১৯২১ সালে তৎকালীন জমিদার ফটিক চক্রবর্তী মাওয়া পুরাতন বাজার থেকে গোয়ালীমান্দ্রা পর্যন্ত খনন করে এ খাল তৈরি করেন। পরে মেদিনীমণ্ডল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইউছুফ মিয়ার আমলে খালটি পুনঃখননসহ সংস্কার করা হয়। এর পর কৃষি কাজে পানি সরবরাহের সুবিধার লক্ষ্যে সরকারি অনুদানে বোরো স্কিমের জন্য দুটি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়।

দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, মাওয়া-গোয়ালীমান্দ্রা খালের পাঁচ কিলোমিটার এলাকার বেশিরভাগই প্রভাবশালীরা স্থানীয় ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে ভরাট করে বসতবাড়ি, দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে ভোগদখলে রয়েছেন। দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল গ্রামে খাল দখল করে ভরাটের পর সেখানে পাকা ভবন নির্মাণ করে হৃদয় প্রি-ক্যাডেট অ্যান্ড জুনিয়র হাইস্কুল পরিচালিত করছেন এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। এভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি দখলের পর ঘরবাড়ি নির্মাণ করে পরিবার-পরিজন নিয়েও বসবাস করছেন খালের সম্পত্তিতে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ইউপি সদস্য আব্দুল হালিমও নেমেছেন খাল দখল উৎসবে। তিনি শুধু খাল ভরাটই করছেন না, খালের পাশের সড়কের মাটি কেটে অন্যত্র বিক্রি করছেন বলেও জানা যায়।

ইউপি সদস্য আব্দুল হালিম জানান, সরকারি ম্যাপে খালের কোনো চিহ্ন নেই। খালের মধ্যে তার শ্বশুরের জমি থাকায় তিনি তা ভরাট করছেন। বোরো স্কিমের স্লুইসগেট থাকলেও তা কৃষকের কোনো কাজে আসছে না। বিগত চেয়ারম্যানদের আমল থেকেই খাল দখল করে বাড়িঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনসহ সবাই অবগত আছেন বলে তিনি দাবি করেন।

মেদিনীমণ্ডল ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, দক্ষিণ ও উত্তর মেদিনীমণ্ডল এবং মাহমুদপট্টি এলাকায় সওজের সড়ক থাকলেও খালের অস্তিত্ব দেখা যায়নি। তার পরও বিষয়টি খোঁজ-খবর নিয়ে দেখবেন। তবে খাল উদ্ধারে উপজেলা প্রশাসন থেকে কোনো নির্দেশনা তিনি পাননি।

ইউএনও মো. মনির হোসেন মোবাইল ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, দাখিল করা স্মারকলিপিতে উল্লিখিত বিষয়টি তদন্ত করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

সমকাল