ফতুল্লায় বৃদ্ধি পেয়েছে শিশু-নারী নির্যাতন

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে যৌতুকের জন্য নারীরা প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে। এছাড়া ধর্ষিত হচ্ছে অনেক নারী।

সামাজিক ব্যবস্থার অবক্ষয়ের কারনে নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সমাজের সচেতন মহল মনে করছেন। তারা মনে করছেন, নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি করা হলেও নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই যাচ্ছে।

গত এক মাসে ধর্ষণসহ বেশ কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে আলোচিত ঘটনা হচ্ছে আপন বড় ভায়রার স্কুল মেয়েকে (১৪) নিয়ে পালিয়ে গেছে খালু। এছাড়াও স্বামী সন্তানকে ফেলে পরকীয়ায় প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গেছে এক গৃহবধূ। এদিকে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনসহ অনেক ঘটনা ঘটলেও লোকলজ্জার ভয়ে বিচারপ্রার্থী হয়ে থানায় মামলা করতে আসে না অনেকে। এতে অপরাধীরা বীরদর্পে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

সূত্রমতে, ফতুল্লার চরনবীনগর এলাকায় আপন বড় ভায়রার স্কুলছাত্রী মেয়েকে (১৪) নিয়ে পালিয়ে যায় খালু নবী হোসেন। গত ১১ অক্টোবর স্কুলছাত্রীর মা বাদী হয়ে নবী হোসেনসহ তিনজনের উল্লেখ করে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলায় উল্লেখ করা হয়, স্কুলছাত্রী মেয়েটি স্কুলে আসা-যাওয়ার সময় তার আপন খালু নবী হোসেন বিয়েসহ নানা ধরনের কু-প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। মেয়েটি রাজি না হওয়ায় নবী হোসেন ক্ষিপ্ত হয়। গত ২ অক্টোবর সন্ধ্যায় স্কুলছাত্রীটি তাদের বাড়ির পাশে বান্ধবীর বাড়িতে যাচ্ছিল। পথে নবী হোসেন তার সহযোগিদের নিয়ে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে যায়।

তবে ঘটনা নিয়ে এলাকাবাসী বলছে ভিন্ন কথা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী তারা প্রেমের সম্পর্ক করেই পালিয়ে গেছে। খালুর সাথে দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে পালিয়ে এখন অন্যত্র ঘর সংসার করছে।

গাবতলী টাগারপাড়ে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বাসা হতে ডেকে এনে সহযোগিদের নিয়ে প্রেমিক মিলে এক গার্মেন্ট কর্মী তরুণীকে গণধর্ষণ করেছে। এ ঘটনায় ৬ অক্টোবর দুপুরে ফতুল্লার কুতুবআইল এলাকা হতে ধর্ষক অপু চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর আগে একই ঘটনায় পুলিশ কায়কোবাদকেও গ্রেপ্তার করেছিল।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, কাশিপুর হোসাইনী নগর এলাকার গার্মেন্টকর্মী তরুণীর সাথে আনোয়ারের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। সেই সুবাদে আনোয়ার তরুণীকে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে গাবতলী টাগারপাড়ে নিয়ে আসে।

এ সময় টাগারপাড়ে কায়কোবাদের বাসায় নিয়ে প্রেমিকসহ তিনজন মিলে উক্ত তরুণীকে ধর্ষণ করে। পরে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে সংবাদ দিলে পুলিশ এসে তরুণীকে উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় তরুনীর ভগ্নিপতি বাদী হয়ে প্রেমিকসহ তিন ধর্ষকের বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা দায়ের করে।

আরেক ঘটনায় ফতুল্লার ইসদাইর বুড়ির দোকান এলাকা নিজের ধর্মের পরিচয় গোপন করে ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ভুয়া কাবিন করার কথা বলে গৃহবধূকে (২৫) ধর্ষণ করেছে হিন্দু সম্প্রাদায়ের চঞ্চল চন্দ্র সরকার (৪০)। এমনকি সে তার পূর্বের বিয়ের কথাও গোপন করেছে বলে ধর্ষণের শিকার গৃহবধূ অভিযোগ করেন। গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে চঞ্চলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এ ঘটনায় গৃহবধুর মা বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় ধর্ষণ আইনে মামলা দায়ের করে। গ্রেপ্তারকৃত চঞ্চল চন্দ্র সরকার বগুড়ার ধনট থানার সরকার পাড়া এলাকার সুশিল চন্দ্র সরকারের ছেলে। সে নারায়ণগঞ্জে একটি পরিবহনে চাকরী করতো।

জানা গেছে, গত তিন বছর বন্দর চৌধুরী বাড়ি (বর্তমানে ইসদাইর বুড়ির দোকানে বসবাস করে) এলাকার এক গৃহবধূ তার স্বামী সন্তান থাকা সত্বেও চঞ্চলের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। চঞ্চল নিজের ধর্ম হিন্দু পরিচয় গোপন রেখে গৃহবধূকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধভাবে দৈহিক সম্পর্ক মেলামেশা করে আসছিল। এক পর্যায়ে উক্ত গৃহবধূ জানতে পারে চঞ্চল হিন্দু। তার পর হতে সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার চেষ্টা করে।

পরে চঞ্চল ৩ থেকে ৪ জন বন্ধুর সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের আদালতে গিয়ে সুকৌশলে মেয়েকে একটি কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে বলে চঞ্চল মুসলিম হয়েছে এবং তাদের মধ্যে বিয়ে হয়েছে। এরপর বিভিন্ন সময় গৃহবধুর বাসায় গিয়ে দৈহিক মেলামেশা করে। কিন্তু চঞ্চল মুসলিম হয়েছে কিনা এবং তাদের মধ্যে বিবাহ হয়েছে কিনা তা জানতে চাইলে চঞ্চল কোন ধরনের কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।

ফতুল্লায় স্বামী সন্তানকে ফেলে প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গেছেন এক গৃহবধূ। ফতুল্লা বাসস্ট্যান্ড থেকে বেয়াইয়ের হাত ধরে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান গৃহবধূ বিথী রানী দাস (২৬)। এ ঘটনায় স্বামী প্রবাল চন্দ্র দাস থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং ৩২২) করেছেন।

জিডি সূত্রে জানা গেছে, দাপা ইদ্রাকপুর ঋষিপাড়ার বাসিন্দা পরান চন্দ্র দাসের ছেলে প্রবাল চন্দ্র দাস বিয়ে করেন মুন্সীগঞ্জ জেলার কাটাখালি ঋষিপাড়ার পলিন চন্দ্র দাসের মেয়ে বিথী রানীকে। তাদের ঘরে মিধি নামের ছয় বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। শ্বশুর বাড়ি মুন্সীগঞ্জ থেকে স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালক দিপ্ত দাসকে নিয়ে তিনি ফতুল্লার নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন।

সন্ধ্যায় ফতুল্লা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এলে আত্মীয় দিপ্ত এখান থেকে যাত্রাবাড়ি চলে যান। এ সময় প্রবালের স্ত্রী বিথী ওষুধ কেনার কথা বলে স্বামী-সন্তানকে দাঁড় করিয়ে নিরুদ্দেশ হন।

এরপর খোঁজ নিয়ে প্রবাল দাস জানতে পারেন, তার স্ত্রী পুরানো প্রেমিক সন্তোষ চন্দ্র শান্তর সঙ্গে পালিয়ে গেছেন।

ফতুল্লার পঞ্চবটিতে ৫ বছরের স্কুলছাত্রী এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। শিশুটির চিৎকারে তার মা ছুটে আসার পর হাকিম (৩৬) পালিয়ে যায়। শিশুটি হরিহরপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেনীতে পড়ে।

শিশুর মা জানান, তার স্বামী দিনমজুর ও সে গৃহিনী। তিনি ঘটনার দিন দুপুরে বাহিরে কাজ করছিলেন। সেই সুযোগে তার প্রতিবেশি হাকিম কৌশলে শিশুকে ঘরের ভিতর নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালায়।

পরে হাকিমকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ধস্তাধস্তি করে পালিয়ে যায়।

ফতুল্লার পিলকুনি এলাকায় তালাক দেয়া স্ত্রীকে পুনরায় বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে আবদুর রহিমের (৩২) বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ফতুল্লা থানায় স্ত্রী বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছে। এই মামলায় রহিমকে পুলিশ ১০ অক্টোবর রাতে গ্রেপ্তার করেছে।

জানা যায়, ফতুল্লার পিলকুনি এলাকার মো. দুলাল সরদারের মেয়ে শাহনাজ আক্তার (২৬)। তার সঙ্গে ৬ বছর আগে আবদুর রহিমের সাথে বিবাহ হয়। রহিম ঢাকা জেলার বাড্ডা থানাধীন পোস্ট অফিস সড়ক এলাকার আবদুর সোবাহানের ছেলে। সে ঠিকমত স্ত্রী সন্তানকে ভরণ পোষণ করে না। এমনকি কারণে অকারেণ সে নানা সময় স্ত্রীকে নির্যাতন করতো।

২০১৪ সালের ৯আগষ্ট রহিমকে শাহনাজ তালাক প্রদান করে। এরপর আবার সে তাদের মেয়ের অজুহাতে শাহনাজের সাথে যোগাযোগ করে সু সম্পর্ক গড়ে ২০১৫ সালে তাকে আবার রহিম নিয়ে যায়। মিথ্যা কাবিন দেখিয়ে রহিম প্রতারণা করে শাহনাজের সঙ্গে নিয়মিত মেলামেশা করে আসছে।

১০ অক্টোবর সে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে আবার শাহনাজকে ধর্ষণ করে। এক পর্যায় বিষয়টি পরিবারের মধ্যে জানাজানি হলে রহিমকে আটক ঘরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।

ইত্তেফাক/