অগ্নিঝরা দিনের সাথি রবি গুহ

অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনীর সন্তান রবীন্দ্রনাথ গুহ (১৯২৩-২০০২) তাঁর দীর্ঘ জীবন ব্যয় করেছেন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এবং উদ্বাস্তু মানুষের বেঁচে থাকা ও শিক্ষা-অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে। বালক বয়সেই সাম্যবাদে দীক্ষা নেন, মাত্র ১৬ বছর বয়সে লাভ করেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ। মুন্সিগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র থাকাকালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় তাঁর বিরুদ্ধে।

১৯৪২ সালে ১৯ বছর বয়সে তাঁর জীবনের দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার একটি ঢাকার ২০ নম্বর কোর্ট হাউস স্ট্রিটের প্রতিরোধ পাবলিশার্স থেকে কমরেড অনিল মুখার্জির সাম্যবাদের ভূমিকা বইটি প্রকাশ। অন্যটি যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে ঢাকা শহরে ফ্যাসিবাদবিরোধী সভার আয়োজন; সে সভায় যোগ দিতে এসে ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন কথাশিল্পী সোমেন চন্দ।

মুন্সিগঞ্জে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কার্যক্রম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু-মুসলিম ছাত্রদের মাঝে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে সামনের সারিতে দেখা গেছে তাঁকে। জীবনের প্রথম কুড়ি বছর পার হতে না হতেই রবি গুহ এভাবে সময়সমুদ্রের অস্থির তরঙ্গে ঝাঁপ দিয়ে বৃহৎ মানুষের মুক্তির প্রবাহে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন।

পরের পর্ব আরও কৌতূহলোদ্দীপক, আলোকের ঝরনাধারাময়। পুলিশি নজরদারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠের চেয়ে পৃথিবীর পাঠশালাতেই নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেছেন তিনি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে কমিউনিস্ট সংগঠন গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিষয়টি যথার্থ ব্যাখ্যাত হয়েছে নৃপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর্যবেক্ষণে, ‘যে বাংলা ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশ বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি সম্পূর্ণ পাল্টে দিল…তার সলতে পাকানো কিন্তু রবিদাদের হাতে শুরু হয়ে গেছে।’ তাঁর প্রগতি-সরণির মানুষদের মধ্যে ছিলেন মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, কাজী মোতাহার হোসেন, এ কে এম আহসান, আহমেদুল কবির, সৈয়দ নুরুদ্দিন, নাজমুল করিম, মোজাফ্ফর আহমেদ, আখলাকুর রহমান, সরদার ফজলুল করিম।
মাহবুব উল আলম চৌধুরী ও সরদার ফজলুল করিমের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, ১৯৪৫-এ চট্টগ্রামে বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র সম্মেলনে সুকান্ত ভট্টাচার্য, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঢাকা থেকে যোগ দিয়েছেন রবি গুহ। একই সালে নেত্রকোনায় সারা ভারত কৃষক সম্মেলনে রবি গুহ যোগ দিয়েছেন মুনীর চৌধুরী, আখলাকুর রহমান, সরদার ফজলুল করিম প্রমুখ বামপন্থী তরুণ তুর্কিদের সঙ্গে নিয়ে, তিনি তাঁদের অধিকাংশের বুকের ভেতর সাম্যবাদের অগ্নিশিখা প্রজ্বালনে ভূমিকা রেখেছেন।

মুনীর চৌধুরী তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সেই প্রতিভাদীপ্ত তীক্ষ্ণ-বুদ্ধি ছেলেগুলি আমায় আকর্ষণ করল। সেই রবি গুহ, দেবপ্রসাদ, মদন বসাক, সরদার ফজলুল করিম প্রত্যেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁদের সংস্পর্শে এসে দেখলাম, আমার এত দিনের আভিজাত্য, চাকচিক্যময় শৌখিনতা আর চালিয়াতি, দম্ভ সব অন্তঃসারশূন্য, সব ফাঁকি—এঁদের চোখে জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম।’

রবি গুহ ১৯৪৭-৪৯ পর্যন্ত চট্টগ্রাম, ফেনী, বাগেরহাটের বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন জ্ঞানের আলোকশিখা। কিন্তু অন্ধকার শক্তির আগ্রাসন তাঁর জীবনে নিয়ে এল দেশত্যাগের দুঃসহ বাস্তবতা। এই পরিবারের পরম সুহৃদ সন্‌জীদা খাতুনকে লিখিত পত্রে রবি গুহের কন্যা অলকানন্দা বাবার জীবন সম্পর্কে বলেছেন, ‘এটা বোধ হয় একটা গোটা প্রজন্মের গল্প! দেশহীন, বাস্তুহীন, এক পরিত্রাণহীন পরবাসের গল্প।’ মর্মন্তুদ দেশভাগের পরও রবি গুহ নিজ দেশের মাটি আঁকড়ে ছিলেন।

১৯৪৮ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে পূর্ববঙ্গের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে সরকারি আদেশে পাকিস্তান থেকে বহিষ্কৃত হলেন, পাড়ি জমালেন পশ্চিমবঙ্গে, কিন্তু আলোকমুখী লড়াই থেমে থাকল না তাঁর জীবনে।

১৯৫০ থেকে লাগাতার কয়েক বছরের শ্রমে ও ঘামে যেন হারানো স্বদেশকে নতুন করে নির্মাণ করতে শুরু করলেন যাদবপুরের উদ্বাস্তু কলোনিতে। তাঁর ভাবনায় আকার পেল সম্মিলিত উদ্বাস্তু বিদ্যালয়, তিনি স্লোগান ধরলেন ‘শিক্ষার জন্য প্রাণপণ করব, বাঁচবার জন্য প্রাণপণ লড়ব।’ হাজার হাজার ছিন্নমূল উদ্বাস্তুর জীবনে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে একটি আন্দোলনে রূপ দিলেন। তিনি আমৃত্যু যুক্ত ছিলেন শিক্ষকতায়, প্রগতিশীল রাজনীতি চর্চায় আর সবার ওপরে মানব-হিতব্রতে।

পূর্ব বাংলা আর বাংলাদেশ তাঁর ভাবনা থেকে কখনো দূরে থাকেনি। ১৯৬১ সালের ১ জুলাই রাজবন্দী শহীদুল্লা কায়সার কারাগার থেকে রবি গুহকে পাঠানো চিঠিতে লিখেছেন, ‘রেজিস্টার্ড বুকপোস্টে আপনার প্রেরিত নতুন সাহিত্য (রবীন্দ্রসংখ্যা) এল…।’

রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের বছর পাকিস্তান সরকার যখন রবীন্দ্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রসংগীতের বিরুদ্ধে খড়্গ শাণাচ্ছে, তখন পশ্চিমবঙ্গে থেকে রবি গুহ ঝুঁকি নিয়ে পুরোনো সহযোদ্ধার কথা মনে রেখে তাঁর জন্য কারাগারে পাঠিয়েছেন প্রগতিশীল সাহিত্যপত্রের রবীন্দ্রসংখ্যা।

রবি গুহ ১৯৯০ সালে স্ত্রী নিশা গুহসহ বাংলাদেশ ভ্রমণে এসেছিলেন, ফিরে গিয়ে সরদার ফজলুল করিমকে লিখেছেন, ‘এক কথায় ঢাকা যাওয়ায় আমার তীর্থ দর্শন হলো। এ নতুন জন্ম, নতুন জন্ম, নতুন জন্ম আমার।’

রবি গুহর স্মরণে এ মাসেই প্রকাশিত হয়েছে রবি গুহ: স্মরণ-বিস্মরণ নামে একটি বই। সে বইতে তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছ জানা যাবে।

পিয়াস মজিদ: কবি ও লেখক।
প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *