আওয়ামী লীগে গৃহবিবাদ, বিএনপিতে আশার আলো : মুন্সীগঞ্জ-১

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু: মুন্সীগঞ্জ-১ (শ্রীনগর ও সিরাজদীখান) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে গৃহবিবাদ। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটানোর উদ্যোগ নেওয়ায় আশার আলো ফুটছে বিএনপিতে।

এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা বেশ দীর্ঘ। বর্তমান এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষ ছাড়াও দলের মনোনয়ন চাইছেন ঢাকা দক্ষিণ মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম সারোয়ার কবীর, সিরাজদীখান উপজেলা চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহম্মেদ, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. বদিউজ্জামান ভূঁইয়া ডাবলু ও শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের সভাপতি নুরুল আলম চৌধুরী।

একাধিক নেতাকর্মী জানিয়েছেন, প্রায় ২৫ বছর শ্রীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করায় সুকুমার রঞ্জন ঘোষকে নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে নিজস্ব বলয় তৈরির অভিযোগও রয়েছে। আগামী নির্বাচনে তাকেই শক্তিশালী প্রার্থী মনে করছেন দলের অনেক নেতাকর্মী। সুকুমার রঞ্জন ঘোষ বলেছেন, একটি মহল তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের দৌড়ে প্রধান প্রতিপক্ষ দলের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক গোলাম সারোয়ার কবির। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরেই নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে আসছেন। সুকুমার রঞ্জন ঘোষবিরোধী নেতাকর্মীরা গোলাম সারোয়ার কবিরের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন। কয়েকজন নেতাকর্মী বলেছেন, গোলাম সারোয়ার কবির এলাকায় নিজের অবস্থান মজবুত করতে সক্ষম হয়েছেন।

গোলাম সারোয়ার কবির বলেছেন, আওয়ামী লীগ সব সময়ই ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন এবং সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তার বিশ্বাস, দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় মনোনয়নের বেলায় তার ওপর আস্থা রাখবেন।

স্বাধীনতার পর সিরাজদীখান থেকে কোনো নেতাই এমপি নির্বাচিত হননি। এবার এই এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে আগাম নির্বাচনী প্রচারে নেমেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি বলেছেন, উপজেলাবাসীর প্রত্যাশা পূরণের জন্য তিনি নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। আগামী নির্বাচনে সিরাজদীখান থেকে প্রার্থী দেওয়া হলে নৌকা প্রতীকের বিজয় নিশ্চিত হবে।

ডা. বদিউজ্জামান ভূঁইয়া ডাবলু গ্রামে গ্রামে উঠান বৈঠকে সরকারের উন্নয়ন ও সাফল্য তুলে ধরে নৌকা প্রতীকে ভোট চাইছেন। এলাকায় তার স্বচ্ছ ইমেজ রয়েছে। তিনি প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের সমর্থনও পাচ্ছেন। তার দাবি, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশ পেয়েই তিনি সভা-সমাবেশ করছেন।

জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্রীড়া সংগঠক নুরুল আলম চৌধুরী নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তার বক্তব্য, তিনি আগেও দলের মনোনয়ন চেয়েছেন। আগামীতেও চাইবেন। আবার দল যাকে মনোয়ন দেবে, তার হয়েই কাজ করবেন।

এদিকে সিরাজদীখান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম সোহরাব হোসেন, শ্রীনগর উপজেলা সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন ও সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী আবদুল হালিম সবজল জানিয়েছেন, সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হলেও দল মনোনীত প্রার্থীকে সবাই মেনে নেবেন। আর নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে এই আসনে আওয়ামী লীগের বিজয় ঠেকিয়ে রাখা অসম্ভব।

বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ২২ জুলাই থেকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ নবায়ন ও সংগ্রহ অভিযান কর্মসূচির মাধ্যমে সাংগঠনিক অবস্থা শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে। এটি নিঃসন্দেহে আশার দিক বলে মনে করছেন শ্রীনগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু, শ্রীনগর উপজেলা চেয়ারম্যান মমিন আলী ও শিল্পপতি শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। শারীরিক অসুস্থতার কারণে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন প্রার্থী না হলে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস ধীরন দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি মীর সরাফত আলী সপু এই আসনে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। মীর সরাফত আলী সপু বলেছেন, জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যই তিনি দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। আর নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হলে এই আসনেও জয়ী হবে বিএনপি।

তবে দুঃসময়ে পাশে থাকায় আগামী নির্বাচনে তৃণমূল নেতাকর্মীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছেন দলের শ্রীনগর উপজেলা সভাপতি মমিন আলী। তিনিও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে শিল্পপতি শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বিএনপি প্রার্থী হওয়ার কথা থাকলেও দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। এরপরও নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছেন শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। তিনি বলেছেন, নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার পাশাপাশি তিনি নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। এবার নিশ্চয়ই দলের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারক নেতারা তাকে মূল্যায়ন করবেন।

মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে এক ধরনের আগ্রহ রয়েছে। জোটে এলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই দলটিকে ছাড় দিতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। আর নির্বাচনী জোট না হলে এই আসনে বিকল্পধারা বাংলাদেশও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিকল্পধারা বাংলাদেশের ব্যানারে নির্বাচনে লড়ে তৃতীয় হন অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এরপর গত ৯ বছরে তিনি আর এলাকায় আসেননি। তবে গত ২০ জুন বিকল্প যুবধারার উদ্যোগে শ্রীনগরের মজিদপুর দয়াহাটা গ্রামে ইফতার মাহফিলে আসেন দলটির যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী। এরপর তিনিও আর এলাকায় আসেননি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

২০০৮ সালের পর থেকে এ নির্বাচনী এলাকায় বিকল্পধারা বাংলাদেশের তেমন একটা তৎপরতা নেই। দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা ঢাকায় গিয়ে আগামী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা ও পরিকল্পনা করছেন। আবার কেউ কেউ বিএনপিতে ফিরে গেছেন। এই আসনে ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী কিংবা মাহী বি চৌধুরী বিকল্প ধারা বাংলাদেশের প্রার্থী হতে পারেন।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তিনি আগামী নির্বাচনেও দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের কোরবান আলী নির্বাচিত হলেও পরে এই আসনটি হাতছাড়া হয়ে যায় আওয়ামী লীগের। ১৯৭৯, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ২০০২ সালে উপনির্বাচনে তার ছেলে বিএনপির মাহী বি চৌধুরী নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের সুকুমার রঞ্জন ঘোষ নির্বাচিত হন।

এই আসনটি এক সময়ে বিএনপির দূর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল; কিন্তু বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে লাঞ্ছিত করায় সেই দুর্গের পতন ঘটে। বিভক্ত হয় বিএনপির ভোট ব্যাংক। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের উপনির্বাচনে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারার মাহি বি চৌধুরী দ্বিতীয় দফায় নির্বাচিত হন।

সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *