মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল: ময়লায় পা পিছলে পড়েও পরিষ্কার করেন না ক্লিনার

অ্যাম্বুল্যান্সও সিন্ডিকেটে
মো. মাসুদ খান: মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল নিয়ে কালের কণ্ঠে পর পর দুই দিন সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশের পর গতকাল বৃহস্পতিবার হাসপাতালের চিত্র ছিল ভিন্ন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অস্ত্রোপচারকক্ষের (ওটি) সামনের বারান্দায় বাতি লাগাতে দেখা গেল কর্মচারী ফয়সালকে।

সকাল পৌনে ১০টার দিকে তিনি ১১৯ নম্বর ড্রেসিং রুমের বেসিনে পানির নতুন টেপ লাগান।
তবে নিচতলায় নারী ডাক্তারদের চেম্বারের সামনে জরুরি বিভাগের জানালার পাশে গতকালও আলোর অভাব দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই অবস্থা।

হাসপাতালটির দ্বিতীয় তলার অভ্যন্তরীণ রোগীদের সেবা প্রদানের বোর্ড দেখলেই বোঝা যায় সেবার মান কী রকম। সর্বশেষ গত ৭ মার্চ এই মনিটরিং বোর্ডের আপডেট ছিল। আট মাসেও আর কোনো আপডেট হয়নি।

এ ছাড়া হাসপাতালের সামনের নতুন ভবন নির্মাণের সময় পুরনো ভবন বরাবর গেটের জন্য খালি জায়গা রাখা হলেও সেখানে কোনো গেট নির্মাণ না করায় যে কেউই ঢুকে পড়ছে ভেতরে। রাতে এখান দিয়ে নতুন ভবনে মাদকসেবীরা আড্ডা বসায়।

সকাল ১০টার দিকে হাসপাতালের মূল হলের পথে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে মেঝেতে কে যেন খাবার ফেলে গেছে।

ওই পথ দিয়ে যেতে বাবলা নামের এক ক্লিনার নিজেই পিছলে পড়ে যান। এর পরও তিনি সেগুলো পরিষ্কার করলেন না।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দেখা গেছে, এক মাদকাসক্ত শুয়ে আছে হাসপাতালের ড্রেসিং রুমের সামনের বেঞ্চে। মুখ থেকে লালা বেরিয়ে ফ্লোরের অনেকটা জায়গা মেখে গেছে।

এরপর দ্বিতীয় তলার মহিলা ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ১৩ নম্বর শয্যার নিচে আশ্রয় নিয়েছে একটি বিড়াল। ওয়ার্ডের রোগীরা জানায়, বিড়ালের আনাগোনা এখানে অনেক বেশি।

এ ছাড়া খোঁজ নিয়ে জানা গেল, জেলার প্রধান এই হাসপাতালের অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিসের নাজুক অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে। অ্যাম্বুল্যান্স আছে দুটি, তাও ভাঙাচোরা। এক সিন্ডিকেটের খপ্পরে রয়েছে এই জরুরি সেবা। অ্যাম্বুল্যান্সচালক জমিস ও মনিরই এই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ আছে।

সম্প্রতি মারা যাওয়ার আগে মুন্সীগঞ্জের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সুখেন ব্যানার্জীকে ঢাকায় নিতে এই হাসপাতালের কোনো অ্যাম্বুল্যান্স পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া এই হাসপাতালের বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়ও রয়েছে নানা গাফিলতি ও অনিয়ম। সরকারি এই হাসপাতালে উচ্চক্ষমতার জেনারেটর রয়েছে। অথচ সেটি ব্যবহার করা হয় না। ছোট আকারের যে জেনারেটর আছে সেটিও সব সময় চালানো হয় না। তাই বিদ্যুৎ চলে গেলে জরুরি অস্ত্রোপচারও অনেক সময় বন্ধ রাখা হয়। রোগীরা বিড়ম্বনায় পড়ে। অথচ এই জেনারেটরের নামে বিল-ভাউচার করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

এদিকে হাসপাতালটিকে ১০০ থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার কাজ চলছে। জাইকার অর্থায়নে এখানে নতুন ভবনের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।

নতুন এই ভবনের মূল নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে দুই থেকে আড়াই বছর আগে। কিন্তু আনুষঙ্গিক আরো কিছু কাজ বাকি থাকায় হস্তান্তর পেছানো হয়েছে। গত জুলাইয়ে হস্তান্তরের কথা থাকলেও এখন বলা হচ্ছে, ভবনটি আগামী বছর জুলাই নাগাদ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৈদ্যুতিক সংযোগ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, রান্নাঘর, পানির পাম্প ও পাওয়ার স্টেশন স্থাপনসহ অন্য কিছু কাজ বাকি থাকায় নতুন ভবন ব্যবহার উপযোগী হয়নি।

এ ব্যাপারে গণপূর্ত বিভাগের মুন্সীগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মশিউর রহমান জানান, জাইকার অর্থ বরাদ্দ না থাকায় ভবনটির কিছু কাজ ঝুলে ছিল। এখন বরাদ্দ পাওয়া গেছে। কাজ শুরু হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী জুলাইয়ে ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া যাবে।

সিভিল সার্জন মো. হাবিবুর রহমান জানান, নতুন ভবনসংক্রান্ত কোনো ফাইলই নেই তাঁর দপ্তরে। এটি বুঝে পেলে আইসিইউ, সিসিইউসহ একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল চালু করা সম্ভব হবে জেলাবাসীর জন্য।

তবে সিভিল সার্জন বলেন, শুধু ভবন বুঝিয়ে দিলেই হবে না; এখানে ডাক্তার ও স্টাফদের থাকার জন্য কোনো আবাসিক ভবন নেই। শুধু আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার (আরএমও) জন্য একটি ভবন রয়েছে। ২৫০ শয্যায় হাসপাতাল উন্নীত হলে সেখানে জনবল বেড়ে যাবে।

জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা বলেন, নতুন ভবনটি চালু হলে জেলাবাসীর চিকিৎসাসেবা পেতে আর ঢাকায় তেমন একটা যেতে হবে না।

এদিকে প্রায় ১৫ লাখ জনসংখ্যার এই জেলায় পুরনো ১০০ শয্যার হাসপাতাল প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এর মধ্যে আবার বর্তমানে হাসপাতালের লোকবল অর্থাৎ সক্ষমতা রয়ে গেছে সেই আগের ৫০ শয্যারই।

বিভিন্ন রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বহির্বিভাগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ডাক্তার দেখাতে হয়। অতিরিক্ত রোগীর চাপে প্রায় সময়ই ডাক্তার রোগীকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারেন না। অনেক সময় রোগীদের মেঝেতে বিছানা করে থাকতে হয়। তাই নতুন ভবনটি উদ্বোধন করে সেবা বাড়ানোর দাবি তাদের।

কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *