চতুর্থবারের মতো আবে প্রশাসনের যাত্রা শুরু

রাহমান মনি: মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও আগাম নির্বাচন দিয়ে বিপুল সমর্থন নিয়ে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করেছেন ক্ষমতাসীন জোট নেতা শিনজো আবে। সরকার গঠন করে আবে তার কার্যালয়ে প্রথমবারের মতো এক সাংবাদিক সম্মেলনে নির্বাচনে দেয়া তার প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন।

সংবাদ সম্মেলনে আবে বলেন, নির্বাচনে আমাদের অন্যতম ইস্যু ছিল উত্তর কোরিয়া কর্তৃক ক্রমাগত হুমকি মোকাবিলায় জাপানকে রক্ষায় প্রয়োজনে সংবিধান পরিবর্তন করে আধুনিক এবং যুগোপযোগী সংবিধান তৈরি এবং জাপানিজ জনসংখ্যা হ্রাসে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণসহ জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ কর্মক্ষম হাতকে কাজে লাগিয়ে জাপানকে আধুনিকীকরণ করাসহ জাপান এবং জাপানিদের রক্ষা করে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। এজন্য আমরা আপনাদের অর্থাৎ জাপানিজ জাতির সমর্থন পেয়েছি। এখন শুধু প্রয়োজন কাজ করা। আমরা সেটাই করব।

আবে আরও বলেন, চার বছর পূর্বে দেয়া আবেনোমিক্স-এর সুফল ইতোমধ্যে জাপানি জনগণ পেতে শুরু করেছেন। আমাদের আয় ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। বেকারদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। বিভিন্ন বয়সের লোকেরা এখন সাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারছেন। এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখতে হবে। কিছু হয়ে গেছে বলে বসে থাকলে চলবে না, তাকে চলমান রাখতে হবে।

আমরা যদি আমাদের জনগণের দেয়া করকে কাজে লাগাতে পারি সঠিকভাবে তাহলে প্রতি অর্থবছরে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ইয়েন বাঁচানো সম্ভব। এই উদ্ধৃত দুই ট্রিলিয়ন ইয়েন শুধু বয়োবৃদ্ধদের পেছনে নয়, সব বয়সের লোকদের জন্য বিশেষ করে শিশু এবং যুবসমাজের জন্য কাজে লাগিয়ে দেশকে আরও সমৃদ্ধশালী করা যেতে পারে। এজন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়ন। বয়স্কদের জীবনযাপন আরও সহজ করে তুলতে হবে। নিশ্চয়তা দিতে হবে।
ইতোমধ্যে আমার কেবিনেট কিন্ডারগার্টেনগুলোকে ফ্রি করে দেয়াসহ আরও বেশি বেশি কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। যাতে করে শিশুদের পেছনে খরচ হবার ভীতি দূর হয় এবং সন্তান নেয়ার আগ্রহ কাজ করে জনগণের মধ্যে। সেই সঙ্গে মায়েদের কর্মমুখী হাতকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক গতি বৃদ্ধিতে সহায়তার কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুত করা জরুরি।

তিনি বলেন, আবে সরকার মেধা থাকা সত্ত্বেও যারা অর্থাভাবে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে না তাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবৈতনিক করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিনা বেতনে পড়াশুনার সুযোগ পেলে মেধাবীরা তাদের মেধাকে কাজে লাগাতে পারবে এবং দেশ এগিয়ে যাবে।

সংবাদ সম্মেলনে আবে আরও বলেন, জাপানের রুগ্ন এবং মধ্যমসারির কোম্পানিগুলোকে আরও বেশি বেশি সরকারি সহায়তা দিয়ে তাদের সচল রাখাসহ নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা হবে, যাতে আরও বেশি বেশি মাঝারি শিল্প গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মক্ষেত্র তৈরিসহ মানসম্মত পণ্য উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করা হবে। মধ্যমসারির কোম্পানিগুলোতে কর্মক্ষেত্র তৈরি হয় বেশি। এই মাঝারি শিল্পই হচ্ছে আমাদের মেরুদ-।

আবে বলেন, আমাদের হাতে সময় নেই। উত্তর কোরিয়া কর্তৃক সম্ভাব্য হামলার মোকাবিলায় এখনই উদ্যোগ নিতে হবে চলমান সংবিধান সংশোধন করে। আমরা সে ম্যান্ডেটও পেয়েছি। এখন সংবিধান রিফর্ম করতে হবে। আমরা সাংবিধানিক বলেই তা রিফর্ম করতে চাই না। আমরা বিরোধী দলেরও সহযোগিতা চাই। দেশকে রক্ষায় বিরোধী দলের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। আমরা সবাই জাপানিজ জনগণ এবং জাপানকে রক্ষা আমাদেরই করতে হবে।

আবে বলেন, পরমাণুমুক্ত বিশ্ব গড়া যেমন আমাদের জন্য জরুরি তার চেয়ে বেশি জরুরি আমার দেশের জনগণের নিরাপত্তা রক্ষা। জাপানি জনগণ যে নিরাপদে থেকে সাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে সেই ক্ষেত্র তৈরি করা আমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

সংবাদ সম্মেলনে আবে বলেন, একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য আমরা আজ থেকে কাজ শুরু করে দিয়েছি। ব্যাংক অব জাপান-এর গভর্নর মি. হারুহিকো কুরোদার সঙ্গে আমার বৈঠক হয়েছে। আগামী বছরই তার মেয়াদ শেষ হবে। তাকে পুনঃনিয়োগ দেয়া হবে কিনা এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনও পর্যন্ত নেয়া হয়নি। বিবেচনায় রয়েছে। আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

আগামী ২০২০ সালে অনুষ্ঠিতব্য টোকিও অলিম্পিক এবং প্যারা অলিম্পিক আসর শুরুর আগেই জাপানকে ঢেলে সাজাতে হবে। তাই বিশেষ বিশেষ খাতকে প্রাধান্য দিয়ে, জাপানকে নিরাপদ রাষ্ট্র, অর্থনৈতিক শক্তিশালী, শিশুবান্ধব এবং যুবসমাজকে জাপান গঠনে কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই।
মন্ত্রিসভা গঠনের পূর্বে ৪৮তম সংসদে প্রথমেই স্পিকার নির্বাচন করা হয়।

বিগত সংসদের স্পিকার তাদামোরি ওশিমা (৭১) সর্বসম্মতিক্রমে ৪৮তম সংসদের নিম্নকক্ষের স্পিকার নির্বাচিত হন।

সংসদের ভাইস স্পিকার হিসেবে সংসদের বিরোধী দল কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব জাপান (সিডিপিজে) থেকে হিরোতাকা আকামাৎসুকে (৬৯) নির্বাচিত করা হয়।

জাপান সংসদের নিম্নকক্ষের ৪৬৫ ভোটের মধ্যে শিনজো আবে ৩১২ ভোট পেয়ে সংসদ নেতা অর্থাৎ এবং দলীয় (জোট) মনোনয়নে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন।
সিডিপিজে নেতা ইউকিও এদানো ৬০ ভোট পেয়ে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন। কিবো নো তো (পার্টি অফ হোপ) নেতা শু ওয়াতানাবে পেয়েছেন ৫১ ভোট। ডিপিজে (প্রাক্তন বিরোধী দল) নেতা কোহেই ওৎসুকা পেয়েছেন মাত্র ১৬ ভোট।

জাপানিজ কমিউনিস্ট পার্টি নেতা কাজুও শিই তাদের ১২টি ভোট ধরে রাখতে সক্ষম রয়েছেন। ২২ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনে এ দলটি ১২টি আসন পায়।
আবে কেবিনেটের চতুর্থ মন্ত্রিসভায় তৃতীয় মন্ত্রিসভার (৩ আগস্ট ২০১৭) সবাইকেই পুনঃনিয়োগ দিয়েছেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তারো আসোকে ডেপুটি প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি ফিন্যান্স ও ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের দায়িত্ব দেয়া হয়। তারো আসো (৭৭) আবে কেবিনেটের সবচেয়ে বর্ষীয়ান মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বরত।

এছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তারো কোনো (৫৪), প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে ইৎসুনোরি ওনোদেরা (৫৭), আইনমন্ত্রী হিসেবে ইয়োকো কামিকাওয়া (৬৪), ইকোনোমি ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রিমন্ত্রী হিসেবে হিরোশিগে সেকো (৫৪) এবং কৃষি, বন ও মৎস্যসম্পদ মন্ত্রী হিসেবে কেন গাইতো (৫৮)কে পুনঃনিয়োগ দেয়া হয়।

চিফ কেবিনেট সেক্রেটারি হিসেবে যথারীতি ইয়োশিহিদে সুগা (৬৮) পুনঃবহালসহ ২০২০ অলিম্পিক ও প্যারা অলিম্পিকের জন্য শুনিচি সুজুকি (৬৮) মন্ত্রীর পদমর্যাদার দায়িত্ব দেয়া হয়।

সব মিলিয়ে আবে কেবিনেটে মোট ২০ জন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে ২ জন নারী সদস্য অর্থাৎ ১০% নারী সদস্য রয়েছেন। গত নির্বাচনেও মোট আসনে ১০.১% নারী সদস্য জয়লাভে সক্ষম হন।
rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক