মুন্সীগঞ্জ- ২: আসন ধরে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ, পুনরুদ্ধারে বিএনপি

মোজাম্মেল হোসেন সজল: ২৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মুন্সীগঞ্জ-২ নির্বাচনী এলাকা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত মুন্সীগঞ্জ-২ আসনটি প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। এরপর থেকেই এই আসনে আওয়ামী লীগের সুদিন বইছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার ১৩টি ও লৌহজং উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান সিনহাকে প্রায় ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি ১৯৯৬ সালে মুন্সীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হওয়ার পর বিএনপির এই দুর্গে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে হাল ছাড়েননি। এরপর ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনে আবারো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

তার সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আওয়ামী লীগের সাবেক এসপি মাহবুবউদ্দিন আহম্মেদ বীর বিক্রম। দীর্ঘ ২১ বছরে সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি টঙ্গীবাড়ী ও লৌহজং উপজেলা আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গসংগঠনের নেতৃত্বে এনেছেন দলের নিবেদিতদের। দুই উপজেলার আওয়ামী লীগ কমিটির নেতৃত্বের কাছে এখানে দাঁড়াতে পারছে না বিএনপি। একবার মাওয়ায় আন্দোলনে নেমে আক্রমণের শিকার হন লৌহজং উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান খান। ছুরিকাহত শাহজাহান খানকে ঢাকায় দীর্ঘদিন

চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এরপর লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ীতে কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়নি স্থানীয় বিএনপিকে। বিএনপির টিকিটে ১৯৯৬ সালে এই আসনে প্রথম সংসদ সদস্য হন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান সিনহা। এরপর ২০০১ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৪ সালে বি. চৌধুরী বিএনপিচ্যুত হওয়ার পর মুন্সীগঞ্জ জেলার বিএনপির রাজনীতিতে একক আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে দলকে ফেলেছেন ভাঙনের মুখে। লৌহজং এবং টঙ্গীবাড়ী উপজেলাতেই বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠন ভাগে ভাগে বিভক্ত। তার নিজের লৌহজং উপজেলার কলমা ইউনিয়ন বিএনপিকে সামাল দিতে পারেননি। বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ একযোগে পদত্যাগের ঘটনাও ঘটেছিল। এরপর কেন্দ্রীয় বিএনপির কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহা কলমা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক হয়েছিলেন নিজেই। কমিটি গঠন করতে গিয়ে তার বাড়িতে একাধিকবার দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে হামলা-চেয়ার টেবিল ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। দলীয় কোন্দল আর নড়েবড়ে অবস্থানের কারণে এই আসনটি বিএনপি পুনরুদ্ধার করতে পারবে কিনা-এ নিয়ে আলোচনা রয়েছে সচেতন মহলে। তবে, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগে সৃষ্টি হচ্ছে কোন্দল। প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে ক্রমাগত। তবে, কোন্দল নিরসনের চেষ্টা চলছে। এখানে জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, বামদলসহ অন্যান্য দলের তেমন ভোট ব্যাংক বা জনসমর্থন নেই।

আগামী নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির একমাত্র প্রার্থী হচ্ছেন, মিজানুর রহমান সিনহা। তিনি এলাকায় দানশীল হিসেবে পরিচিত। এলাকার বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তাকে অংশ নিতে দেখা যায়। তবে, তার সাংগঠনিক তৎপরতায় ক্ষুব্ধ অনেক নেতা। জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর মল্লিক রিপনের সঙ্গে অতি সম্প্রতি জেলা কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। সদ্য জেলা বিএনপির কমিটিতে তার সাধারণ সম্পাদক পদ কেড়ে নেয়ার জন্য রিপন মল্লিক সিনহাকে দায়ী করেছেন। জেলা বিএনপির কমিটিতে রিপন মল্লিককে সহ-সভাপতি পদে রাখা হলেও তিনি সন্তুষ্ট নন। সর্ব কনিষ্ঠ সহ-সভাপতি পদে রাখা হয়েছে রিপন মল্লিককে। আগামী নির্বাচনে জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি আলী আজগর মল্লিক রিপন রয়েছেন প্রার্থী তালিকায়। টঙ্গীবাড়ীতে মল্লিক পরিবারের রয়েছে ব্যাপক আধিপত্য ও ভোট ব্যাংক। লৌহজং উপজেলার চেয়ে টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় ভোটও বেশি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মিজানুর রহমান সিনহা তার নিজ উপজেলায় দাঁড়াতে পারেননি। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর চেয়ে লৌহজং উপজেলায় সিনহা ১৯ হাজার ভোট কম পেয়েছিলেন। এ ছাড়া বিএনপি থেকে প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন, কেন্দ্রীয় বিএনপির বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ। তৃণমূল থেকে রাজনীতিতে গড়ে উঠা আবদুস সালাম আজাদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন ঘরোয়া কর্মসূচিসহ সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।

এদিকে, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আলী আজগর মল্লিক রিপন বলেছেন, তিনি দলীয় টিকিট চাইবেন। তাকে না দেয়া হলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়বেন।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য সাবেক হুইপ সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, অ্যাটর্নী জেনারেল মাহবুবে আলম, লৌহজং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ শিকদার। এরমধ্যে সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি মনোনয়ন তালিকায় রয়েছে এক নম্বরে। সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি প্রায় প্রতিদিনই দুই উপজেলায় সরকারি কর্মসূচিসহ দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্ভাব্য প্রার্থী রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এসে এলাকার স্কুল-কলেজ ও মাদরাসায় বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীসহ বিভিন্ন ধরনের বইসহ উপহার এবং দান-অনুদান দিচ্ছেন। তিনি আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

এদিকে, লৌহজং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ শিকদার হঠাৎ প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নড়েচড়ে বসেন। দলের বাইরেও এলাকায় রয়েছে তার বিশাল ইমেজ। দল ও কর্মীদের জন্য দুইহাত খুলে খরচ করছেন, দিচ্ছেন নানা সুযোগ-সুবিধা। আর এসব কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ তরুণদের কাছে প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছেন আব্দুর রশিদ শিকদার। আব্দুর রশিদ শিকদার এশিয়ান হকি ফেডারেশনের কার্যকরী পরিষদের পরিচালক, বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ও ঊষা ক্রীড়া চক্রের সাধারণ সম্পাদক।

প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলা পরিষদের দুই বারের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ। তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার আগেই দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে আর্থিক সহায়তায়সহ নানা জনহিতকর কাজ করেন এবং বর্তমানে তা অব্যাহত রেখেছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার বদৌলতে ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আরো বেশি সহযোগিতা করছেন। দলের বাইরেও ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদের সামাজিক গ্রহণ যোগ্যতা রয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ঢালী মোয়াজ্জেম হোসেন এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ ছাড়া জাতীয় পার্টির জেলা কমিটির সভাপতি মো. কুতুবউদ্দিন আহম্মেদ, কেন্দ্রীয় নেতা নোমান মিয়া ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জামাল হোসেনও দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।

মানবজমিন