পদ্মা সেতুর রেল সংযোগে অর্থ দিচ্ছে চীনা এক্সিম ব্যাংক

অবশেষে সব জটিলতা কাটিয়ে চীনের এক্সিম ব্যাংকই বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ অবকাঠামো পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে অর্থ সংক্রান্ত ঋণচুক্তির খসড়া সরকারের কাছে পাঠাবে চীনা এক্সিম ব্যাংক।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো ওই ঋণচুক্তির খসড়া যাচাই-বাছাই, সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জন শেষে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে বা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। রেলপথ মন্ত্রণালয় ও ইআরডি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে খুলনার (রেলপথে) দূরত্ব কমবে ২১২ কিলোমিটার। এ রেলপথ দিয়ে খুলনা যেতে সময় লাগবে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টা।

এ বিষয়ে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম ফখরুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন,‘সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ একটি। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতোমধ্যেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। শুভ সংবাদ হচ্ছে- অর্থায়নের বিষয়ে চীনের সঙ্গে জটিলতা কেটেছে। তবে এখনও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। আশা করছি নভেম্বরের শেষ অথবা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ইতিবাচক সংবাদ পাবো। অর্থাৎ, চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে চীনের এক্সিম ব্যাংক।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রকল্পের মূল কাজ এখনও শুরু হয়নি। তবে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ বলা যায় শেষ পর্যায়ে। ঋণচুক্তি হলে কাজ পুরোদমে শুরু হবে।’

এ প্রসঙ্গে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পদ্মা সেতুতে রেলপথ চালু হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাতায়াতের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন হবে। এ লক্ষ্যেই এই মেগা প্রকল্পটি নিয়েছে সরকার। এর ফলে পরিবহন খাত এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটবে। আঞ্চলিক সংযোগ বিশেষ করে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হবে এ রুট।’

২০১৬ সালের ৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন করা হয় পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পটি। এতে ব্যয় ধরা হয় ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। শুরুতে এ প্রকল্পে শতভাগ অর্থায়নে সম্মত হলেও পরে চীনের এক্সিম ব্যাংক ২৪ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা ঋণ দিতে সম্মত হয়।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, অর্থায়ন নিয়ে জটিলতা থাকায় এতদিন ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়া প্রকল্পের কাজ সেভাবে শুরুই হয়নি। প্রথম ধাপে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরের একাংশে ভূমি অধিগ্রহণ চলছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরে অধিগ্রহণ করা জমি বুঝে পেয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় চারটি সেকশনে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত নতুন ব্রডগেজ লাইন নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে মাওয়া থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত কাজ শেষ করে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার প্রথম দিন থেকেই রেলপথও চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। নতুন রুটটি হবে ঢাকা থেকে গেন্ডারিয়া হয়ে মাওয়া-ভাঙ্গা-নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত। প্রকল্পটি ২০২২ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

চীনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গত অর্থবছরে এই প্রকল্পে দুই হাজার ৭৪২ কোটি টাকা ঋণের অর্থ পাওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি রাজস্ব খাত থেকেও দুই হাজার ৭১ কোটি টাকা রাখা হয়। চীনের ঋণের অর্থ না পাওয়ার কারণে সরকারের অংশও পুরোটা ব্যয় করা যাচ্ছে না। কারণ রাজস্ব খাতের বরাদ্দের ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণের টাকার পরিপূরক হিসেবে ধরা হয়েছিল।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে মাত্র এক হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা খরচের এখতিয়ার আছে। এর সবই জমি অধিগ্রহণ, বেতন-ভাতাসহ আনুষঙ্গিক কাজে খরচের জন্য। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে এই প্রকল্পে আরও সাত হাজার ৯০৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে ১৬৯ কিলোমিটার মেইন লাইন নির্মাণ, ৪৩ দশমিক ২২ কিলোমিটার লুপ ও সাইডিং, তিন কিলোমিটার ডাবলসহ মোট ২১৫ দশমিক ২২ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেল ট্র্যাক নির্মাণ, ২৩ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট, এক দশমিক ৯৮ কিলোমিটার র‌্যাম্পস, ৬৬টি বড় সেতু, ২৪৪টি ছোট সেতু ও কালভার্ট, একটি হাইওয়ে ওভারপাস, ২৯টি লেভেল ক্রসিং, ৪০টি আন্ডারপাস, ১৪টি নতুন স্টেশন ভবন নির্মাণ, ছয়টি বিদ্যমান স্টেশনের উন্নয়ন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ, ২০টি স্টেশনে টেলিযোগাযোগসহ কম্পিউটারভিত্তিক রেলওয়ে ইন্টারলক সিস্টেম সিগন্যালিং ব্যবস্থা, ১০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী গাড়ি সংগ্রহ, এক হাজার ৭০০ একর ভূমি অধিগ্রহণসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম করা হবে।

একুশে টেলিভিশন