শ্রীনগরের সায়েম ব্লু হোয়েলের ফাঁদে!

ডেথ গেম ব্লু হোয়েলের ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে রাজধানীর মিরপুরে আরো এক কিশোর। তার নাম সায়েম দেওয়ান (১৬)। মৃত্যুর পর সায়েমের বাম হাতের কুনই থেকে কব্জি পর্যন্ত তিমির ছবি আঁকা ছিল। তার জিন্স প্যান্টেও একাধিক তিমির ট্যাটু লাগানো ছিল। সায়েমের বাবা জানান, তার ছেলে কিছুদিন ধরে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত ছিল। পুলিশ ও পরিবারের ধারণা, সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেটের গেম ব্লু হোয়েলের ফাঁদে পড়ে সায়েম জীবন হারিয়েছে ।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মিরপুর থানাধীন পশ্চিম কাজীপাড়ার মসজিদ গলির ৭৬০ নম্বর একটি টিনসেডের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে থাকতো সায়েম দেওয়ান। সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাড়ির পশ্চিম পাশের একটি রুম থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচানো ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পুলিশ ময়নাদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

এ বিষয়ে নিহতের বাবা দেওয়ান বাবু সাংবাদিকদের জানান, পশ্চিম কাজী পাড়ায় রাস্তার ধারে তার একটি চায়ের দোকান আছে। ওই দোকানে তার ছেলে তাকে বিভিন্ন সহযোগিতা করতো। তিনি জানান, সে প্রায় সময় মোবাইলে গেম খেলতো। রাত ৮টার দিকে সে দোকান থেকে চলে আসে। এরপর রাতে কোনো খাবার না খেয়ে ঘুমাতে যায়। পরে তাকে পরিবারের লোকজন সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায়। ইন্টারনেটে বিভিন্ন গেম খেলার কারণে তার ছেলে মারা গেছে বলে তিনি ধারণা করছেন।

পশ্চিম কাজীপাড়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনে স্থানীয়দের ভিড়। নিহতের পরিবারের স্বজনেরা আহাজারি করছিলেন। কি কারণে সায়েম মারা গেছে তা জানার জন্য ঘটনাস্থলে সবার মধ্যে কৌতূহল ছিল। স্থানীয়রা অনেকেই বিষয়টি বুঝতে পারছিলেন না। ঘটনাস্থলে উপস্থিত তরুণদের ব্লু হোয়েল বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায়।

পরিবার ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সায়েম অনেক হাসি-খুশি থাকতো। সবার সঙ্গে কথা বলতো। ভালো ক্রিকেটও খেলতো। কিন্তু, গত ৩ মাস ধরে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। নানারকম উচ্ছৃঙ্খল আচরণ শুরু করে। তাকে কয়েকবার চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকেরা তাকে তার বিষাদগ্রস্ত মনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে সে জানিয়েছিল যে, তার কিছুই হয়নি। বিষয়টি স্বাভাবিক ভেবে পরিবারের লোকজন তার বিষয়টি তেমন কোনো আমলে দেয়নি।

নিহতের ফুফাতো বোন রুবিনা আক্তার জানান, সায়েম খুব ভালো ছেলে। বাবার অভাবের সংসারে সে চায়ের দোকানে কাজ করে সহযোগিতা করতো। তিনি জানান, তবে বেশ কয়েকমাস ধরে সে গেম খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। পরিবারের লোকজন তাকে এ বিষয়ে বকাঝকা করলে সে তেমন কিছুই বলতো না। তবে কিছুদিন ধরে তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ মনে হয়েছিল। নিহতের বন্ধু রিপন জানায়, দোকানের অবসর সময়ে সায়েম আমাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতো। মারা যাওয়ার দিনই আমাদের সঙ্গে সে কথা বলেছে। সে যে ডেথ গেমস ব্লু হোয়েলে আসক্ত হয়েছে- তা আমরা বুঝতে পারিনি। তবে কিছুদিন ধরে সে কম কথা বলতো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বন্ধু জানান, কয়েকদিন আগে তাকে মসজিদ গলিতে একা একা একাধিকবার হাঁটতে দেখি। তাকে হাঁটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে সে আমাকে জানায়, তার শরীর ব্যথা করছে তার জন্য হাঁটছি। বিষয়টি আমি স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিলাম। তিনি আরো জানান, তবে বেশ কিছুদিন যাবত তাকে আমি মোবাইলে খুব মনোযোগী হতে দেখেছি। আগে আমাদের সঙ্গে যখন থাকতো তখন তাকে মোবাইলে অতটা মনোযোগী হতে দেখিনি। আমাদের ধারণা ব্লু হোয়েলের ফাঁদে পড়ে সায়েম আত্মহত্যা করেছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সায়েমের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর এলাকার বাড়ৌখালী এলাকায়। দুই ভাইয়ের মধ্যে সায়েম বড় ছিল।

এ বিষয়ে মিরপুর থানার এসআই মো. আতিকুর রহমান জানান, নিহত কিশোরের বাম হাতে সুচ দিয়ে তিমির মতো ছবি আঁকা রয়েছে। এ ছাড়াও তার জিন্স প্যান্টে বিভিন্ন ট্যাটু লাগানো দেখা গেছে। প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা মনে হয়েছে। তিনি আরো জানান, নিহত কিশোরের পরিবার ও তার বন্ধুরা পুলিশকে জানিয়েছে যে, সায়েম মোবাইলে গেম খেলতো। সাম্প্রতিক সময়ে ব্লু হোয়েল নামে যে গেম খেলে প্রাণ দেয়ার যে ঘটনা ঘটেছে সেই গেম খেলে সে আত্মহত্যা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সায়েমের ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

মানবজমিন