চলতি সেপ্টেম্বর মাসে মুন্সীগঞ্জে ৭ খুন

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু: চলতি সেপ্টেম্বর মাসে মুন্সীগঞ্জ জেলায় দুটি জোড়া খুনসহ ৭টি হত্যাকান্ড, ধর্ষণের পর ফেসবুকে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, সন্ত্রাসীকে গণপিটুনি দিয়ে চোখে উপড়ে ফেলা, দুই শিক্ষার্থীকে অপহরণচেষ্টা, সংঘর্ষসহ একাধিক অপরাধ কর্মকান্ড সংঘটিত হয়েছে। পরপর একাধিক হত্যা, শিক্ষার্থী ধর্ষণ ও দুই শিক্ষার্থী অপহরণচেষ্টায় তিন বখাটের সঙ্গে এক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং এক সন্ত্রাসীকে গণপিটুনি ও চোখ উপড়ে ফেলার ঘটনায় স্থানীয় জনতা সল্ফপৃক্ত হয়ে পড়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে জেলাবাসী। এ অবস্থায় জেলার ৬টি উপজেলার ১৬ লক্ষাধিক মানুষ নিজ জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার একাধিক ব্যক্তি বলেছেন, এসব ঘটনায় জেলার আইন-শৃগ্ধখলা পরিস্থিতি অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা পুলিশ বিভাগ পৃথক দুটি জোড়া খুনসহ ৬ হত্যাকান্ডে জড়িত একাধিক ঘাতককে গ্রেফতার এবং হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে সফলতার মুখ দেখলেও এক যুবকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার ঘটনার রহস্য এখনও উদ্ঘাটন করতে পারেনি। এ ছাড়া দুই জোড়া হত্যার একাধিক আসামি এখনও পলাতক রয়েছে।
তবে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পৃথকভাবে দুই জোড়া হত্যাকান্ডের রহস্য উদ্ঘাটনসহ ঘটনার মূল হোতাদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। জমি সংক্রান্ত ও ব্যক্তিস্বার্থে সংঘটিত এসব অপরাধ বিচ্ছিন্ন ঘটনার অংশ। দুই জোড়া হত্যাকান্ড ছাড়াও সংঘটিত অপর হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া হত্যাকান্ডগুলোতে ব্যবহূত অস্ত্র উদ্ধার ছাড়াও পৃথক অভিযানে পুলিশ আঘ্নেয়াস্ত্র্প ও চোরাই গরু উদ্ধার করেছে। এ অবস্থায় জেলার আইন-শৃগ্ধখলা পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।

পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর শহরের ইদ্রাকপুর এলাকায় মাদক সেবনের টাকা না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মা জাহানারা বেগমকে হত্যা করে মাদকাসক্ত ছেলে রতন। এ ঘটনায় পুলিশ ঘাতক ছেলে রতনকে (৩০) গ্রেফতারের পর জেলহাজতে পাঠিয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর শহরের খালইস্ট এলাকায় অষ্টম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীকে মারধর ও একটি নির্মাণাধীন ভবনে আটক রেখে অপহরণচেষ্টার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সদর থানা পুলিশের এএসআই আব্দুল আলীম এবং বাবু, সাঈদ ও পলক নামের তিন বখাটের বিরুদ্ধে পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ দাখিল করেছেন শিক্ষার্থীর বাবা শাহীন রেজা কাজল। ১৮ সেপ্টেম্বর শহরের উপকণ্ঠ মালিপাথর এলাকায় অবৈধ কারেন্ট জাল লুটের ঘটনায় সাইফুল ইসলাম আরিফ (৩৫) নামের এক সন্ত্রাসীকে গণপিটুনি দিয়ে তার একটি চোখ উপড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে শহরের ভিটি শিলমন্দি এলাকায় বারেক লেংটার মাজারে আমেনা বেগম ও তাইজুন খাতুন নামের দুই নারীকে ধর্ষণের পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে ও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মাজারের খাদেম মাসুদ লেংটা, বাবু সরকার ও রাজন নামের ৩ জনকে গ্রেফতার করে। এর ৪ দিন আগে ৯ সেপ্টেম্বর রাতে জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে টঙ্গিবাড়ীর কুন্ডেরবাজার এলাকায় হামলা চালিয়ে শাহ আলম ও আলী হোসেন নামের দুই বিএনপি নেতাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। এ ঘটনার মূল হোতাসহ ৯ জনকে গ্রেফতার এবং হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

এ ছাড়া একই দিন শহরের পাঁচঘড়িয়াকান্দি এলাকার বালুর মাঠের একটি গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় হাবিবুর রহমান নামের এক যুবকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ হত্যার রহস্য এখনও উদ্ঘাটন হয়নি। গত ৪ সেপ্টেম্বর সিরাজদীখানের চরনিমতলা গ্রামে ফাহিমা বেগম নামের এক গৃহবধূর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার এবং স্বামী নিজামউদ্দিন ও শাশুড়ি রিনা বেগমকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অন্যদিকে গত ১২ সেপ্টেম্বর সিরাজদীখানে দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর নগ্ন ভিডিও ও ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয় ধর্ষক। এ ঘটনায় স্কুলছাত্রীর পরিবার মামলা করলে পুলিশ ধর্ষককে গ্রেফতার করে। একই দিন রাতে লৌহজংয়ের সুরপাড়া গ্রামে কবুতর চুরির প্রতিবাদ করায় শামীম নামের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধারালো ্েব্নড দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত জখম করে তিন দুর্বৃত্ত। এ ছাড়া গত ৪ সেপ্টেম্বর আধিপত্য নিয়ে সদর উপজেলার শিলই গ্রামে আ’লীগের দু’পক্ষের সংঘর্ষে ৭ জন গুলিবিদ্ধসহ ১০ জন আহত হয়।

শিক্ষকসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, দুই জোড়া হত্যাসহ সাত হত্যাকান্ড এবং নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শিক্ষার্থী ধর্ষণ ও অপহরণ চেষ্টার ঘটনাও ঘটছে। তাই জেলার নিরীহ সাধারণ মানুষ আতঙ্ক ও শঙ্কার মধ্যে দিনযাপন করছে।

এ প্রসঙ্গে মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম পিপিএম সমকালকে জানান, জমি নিয়ে বিরোধ, ব্যক্তিস্বার্থ ও মাদক সেবনের টাকা না পেয়ে সংঘটিত হত্যাকান্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনার অংশ। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের পুলিশ তাৎক্ষণিক গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়েছে। সার্বিকভাবে জেলার আইন-শৃগ্ধখলা পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। তাই জেলাবাসীর শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

সমকাল