খোকা ভাইয়ের কাছ থেকে আমিও সত্যি মনে মনে বিদায় নিয়ে আসলাম

মোস্তফা ফিরোজ : আমেরিকা যাই ১২ সেপ্টেম্বর। পরদিন জ্যাকসন হাইটে আলাউদ্দিন হোটেলে দুপুরের খাবার খেতে যেয়ে হুট করে দেখা। কয়েকজনের ভিতরে বসা একজনের সেই পরিচিত কন্ঠস্বর দিপু কেমন আছো তুমি? চমকে উঠলাম। কন্ঠ চিনলাম। কিন্তু মানুষটাকেতো চিনতে পারছি না। এটা কোন খোকা ভাই?

২০১৩ সালে ঢাকায় যে খোকা ভাইকে দেখেছিলাম সব সময় খোলামেলা প্রানবন্ত হাসিখুশি মুখে, এখন দেখছি যন্ত্রনা কাতর শুকিয়ে ছোট হয়ে যাওয়া একটি মানুষকে। জানলাম, হাসপাতাল থেকে কেমো থেরাপি দিয়ে এসেছেন। কয়েক বছর থেকে তিনি মরন ব্যাধি ক্যানসারের সাথে যুদ্ধ করছেন। চিকিৎসার সময় তার অনুপস্থিতিতে নিম্ন আদালত তাকে সাজা দিয়েছে। আপীল করতে দেশে যাবেন সেই শারীরিক অবস্থা নেই। রাজনৈতিক অবস্থাও প্রতিকূল। খেতে খেতে টুকটাক কথা হচ্ছিল। কিন্তু আমার বুকটা এমন দুমড়ে গিয়েছিল যে ঠিকভাবে কথা বলতে পারছিলাম না। বার বার অতীতের সাথে খোকা ভাইকে মেলানোর চেষ্টা করছিলাম।

খাবার শেষে তিনি লাঠিতে ভর করে উঠলেন। বাইরে এসে গাড়ির সীটে বসতে তার খুবই কষ্ট হচ্ছিলো। মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেলো। ঢাকা ফেরার আগের দিন রাতে গেলাম বাসায়। নিজেই এসে দরজা খুলে দিলেন। বাসায় একা চুপচাপ বসে বসে টিভি দেখছিলেন। দেশের খবর খুঁজছিলেন। তেমন কথা হলো না। আমার কিছু কথা ছিলো বলতে পারলাম না। তার শরীরের অবস্হা দেখে আমার মুখ দিয়ে কথা বের হলো না। বিদায় নেয়ার সময় বললেন, দোয়া করো আমার জন্য। শরীর ভালো না। আর দেখা নাও হতে পারে। এবার চোখ ছল ছল করে উঠলো। খোকা ভাইয়ের কাছ থেকে আমিও সত্যি মনে মনে বিদায় নিয়ে আসলাম। স্বাধীন বাংলাদেশের এমন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার পরাস্থ করুন মুখ আর দেখতে চাই না। ভালোবাসার কাছের মানুষ থেকে দূরে থাকাই মনে হয় ভালো। রাজনীতির কথা বাদ দিলাম। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। মুক্তমনা উদার মানুষ, যার সামনে বিএনপিরও সমালোচনা করা যায়। সবার কথা শোনেন। নিজে বলেন কম।

সংস্কৃতিমনা ক্রীড়ানুরাগী আকর্ষনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই মানুষটি শুধু রাজনীতির কারনে এভাবে বলি হবেন? একথা ভাবতে ভাবতে ফিরে আসছিলাম। ভাবলাম প্রধানমন্ত্রীকে এসব কথা কিভাবে বলা যায়। তিনি রোহিঙ্গা শরনার্থীদের জন্য জোরালোভাবে কথা বলেছেন। কিন্তু বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা কেন রাজনৈতিক শরনার্থী হয়ে আমেরিকা থাকবেন? যে দেশটা যুদ্ধ করে স্বাধীন করলেন, সেই দেশটা তার জন্য কেন নিরাপদ হলো না? তিনি মারা গেলে লাশ দেশে আসলে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন, আর জীবিত অবস্থায় নিরাপদে দেশে ফিরে আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন না? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খোকা ভাই এখন জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তাই রাজনৈতিক বিবেচনা ভুলে গিয়ে আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার পাশে দাঁড়ান। এতে আপনি আরো সম্মানিত হবেন।

আমেরিকা সফরের অনেক কাহিনী লিখেছি। এতোদিন লিখিনি খোকা ভাইয়ের সাথে দেখা হবার প্রসঙ্গটি। এই জন্য বিবেক যন্ত্রনা দিচ্ছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম দেখা হবার বিষয়টি গোপন রাখবো। কি বিপদে আবার পড়ি একথা ভেবে। কিন্তু বিবেকের যন্ত্রনায় তাড়িত হয়ে শেষে এই জবানবন্দী দিলাম।

লেখক: বার্তাপ্রধান, বাংলাভিশন
আমাদের সময়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *