ফিরিঙ্গি বাজারের পাইকারী আড়তে কচ্ছবগতিতে চাউলের দাম কমছে

মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়নের সর্ববৃহৎ চাউলের আড়ৎ হচ্ছে ফিরিঙ্গিবাজার। এই ফিরিঙ্গিবাজারকে কেন্দ্র করে এখানে চাউলের অটো রাইস মিল ও চাউলের চাতাল গড়ে উঠেছে। আগে এই ফিরিঙ্গিবাজারের যে যৌবন ছিল এখন তাতে ভাটারার টান টান অবস্থা বিরাজ করছে। মুন্সিগঞ্জ ও এর আশপাশে যে চাউল বাজার গুলোতে যে চাউল বিক্রি হয় তা এখানকার ফিরিঙ্গি বাজারের চাল। এখানকার অটো রাইস মিল ও চাতাল ছাড়াও দেশের অন্য স্থান থেকে আসা চাউল এখানে বিক্রি হয়ে থাকে। পাইকারী চাউলের বাজার হিসেবে এই বাজারের সুখ্যাতি রয়েছে মুন্সিগঞ্জে।

ফিরিঙ্গি বাজারের আশপাশে অনেক অটো রাইস মিল গড়ে উঠায় এখানকার চাতালের মাধ্যমে যে চাউল তৈরি হতো তা অনেকটাই বন্ধের পথে।

এখানকার রাইস মিলের মালিকরা মুলত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধান কিনে চাউল তৈরি করেন। তারা যেখান থেকে চাউল কিনেন সেখানে বাংলা হিসেবে চাউল বিক্রি হয়ে থাকে। বাংলা হিসেব বলতে তারা জানান, এটা মুলত সের দরে তারা কৃষকদের কাছ থেকে চাউল কিনেন। পরে তারা খরচ সম্মনয় করে কেজিতে চাউল বিক্রি করেন।

এই জনপদে ব্যবসায়িদের লক্ষ্যে তেমন কোন ধান উৎপাদন হয় না। সেই কারণে এখানে পর্যাপ্ত চাউল মজুদের কোন সুযোগ নেই।

এখানে অনেক ব্যবসায়িদের অভিযোগ হচ্ছে যে, এবার পাটে ভালো দাম দেয়ার কারণে অনেকই ধান আবাদ না করে পাট আবাদে চলে গেছে। এই কারণেও চলমান বাজারে চাউলের অভাবও একটি কারণ হতে পাওে বলে তারা ধারণা করছে।

চাউলের বাজারে অস্থিরতার কারণে গত সপ্তাহ ধরে প্রশাসনের লোকজন ব্যাপক যাতায়াতের কারণে ভয়ে অনেকেই আর প্রয়োজন ছাড়া চাউল মজুদ করছে না।
এর ফলে বর্তমানে তাদের এখানে কোন কোন সময় এক বস্তাও চাউল বিক্রি হচ্ছে না। মিলে চাউল উৎপাদন করে তারা পাইকারের আশায় বসে আছেন।
এখানকার চাউল ব্যবসায়িরা জানান, বর্তমানে চাউল প্রতি ৫০ কেজি ওজনের বস্তা ১শ’ টাকা থেকে দেড়শ’ টাকা করে কমে গেছে। কিন্তু আগে খুচরা বাজারের ব্যবসায়িরা যে পরিমাণ চাউল মজুদ করেছেন, সেই চাউল না বিক্রি করে, এখন তারা বর্তমান দরের চাউল কিনবে না। এই কারণে এখনো খুচরা বাজারের সাথে পাইকারি বাজারের চাউল বিক্রি তেমন কোন সমতায় আসেনি। এই পরিস্থিতি আরো এক সপ্তাহ থাকতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন। বা আরো একটু বেশি সময় নিতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।

ফিরিঙ্গি বাজারের বোগদাদীয়া অটো রাইস মিলের মালিক কামাল উদ্দিন জানান,তারা সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, যশোর ও দিনাজপুর থেকে ধান সংগ্রহ করে এখানে চাউল উৎপাদন করেন। ধানের বাড়তি দাম থাকায় এখন প্রতিবস্তা চাউল তৈরি করতে গিয়ে তাদের খরচ পড়ছে প্রায় ২ হাজার ৬শ’ ৫০ টাকা। কিন্তু চাউলের বাজার পড়তির দিকে পড়ায় সেই চাউল এখন বিক্রি করতে হচ্ছে ২ হাজার ৫শ’ টাকায়। এক্ষেত্রে তাদেরকে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, মিনিকেট ধান ও আটাশ ধানটি মুলত বৈশাখ মাস ছাড়া পাওয়া যায় না। সেই সময়ের উৎপাদিত ধান দিয়েই চাউল উৎপাদন করে বারো মাস চলতে হয়। মিনিকেট চাউল এখন ২ হাজার ৯শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মুন্সিগঞ্জ অটো রাইস মিলের মালিক রাজু আহমেদ জানান, তারা গোপালগঞ্জ থেকে ধান সংগ্রহ করে এখানে চাউল উৎপাদন করেন। বর্তমানে ২১৪৫ টাকা খরচ পড়ছে চাউল উৎপাদনে। আর সেই চাউল বিক্রি করতে হচ্ছে ১৮৫০ টাকায়। এতে চাউল বিক্রি করতে গিয়ে তাদেরকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাদের চাউলের ব্রান্ড হচ্ছে জোড়া বাঘ মার্কা। এখন এখানে মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার টাকা করে।

এখানকার অটো রাইস মিলের সব মালিকের একই উত্তর হচ্ছে, বর্তমানে ধান থেকে চাউল উৎপাদনে খরচ বেশি হচ্ছে বস্তা প্রতি তাদেরকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। লোকসান কেন দিবেন, এর উত্তর তারা দিতে পারেননি। সেই ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে, এখানে কোন না কোন রহস্য রয়েছে।

বিনোদপুরের এমদাদ এন্টার প্রাইজের মালিক জানান, তাদের কোন রাইস মিল নেই। তারা শুধুমাত্র দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্রান্ডের চাউল বিক্রি করে থাকেন। চাউলের অস্থির বাজারের সময় এখানে কুস্টিয়ার রশিদের মিনিকেট বিক্রি হয় ৩১০০ টাকা বস্তা। এখন এর দাম কমে ৩ হাজার বা ২৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এখানে প্রকারভেদে চাউল ১শ’ থেকে দেড়শ’ টাকা বস্তা প্রতি কমেছে। যেভাবে চাউলের বাজার বেড়ে ছিলো সেইভাবে চাউলের বাজার কমেনি। বরং কচ্ছব গতিতে চাউলের বাজার কমছে। কুস্টিায়ার আল বারাকাত চাউল আগে বিক্রি হয়ে ছিলো ৩১শ’ টাকা করে বস্তা। এখন সেই চাউল বিক্রি হচ্ছে ২৯৫০ টাকা করে বস্তা। সূবর্ণা চাউল আগে বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার টাকা করে বস্তা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ২৮৫০ টাকা করে বস্তা।

বিনোদপুরের তাজ রাইস এজেন্সির মালিক মো: জুয়েল আলম জানান, বাজারে বাংলা হিসেবে আটাশ ও উনিশ ধান বিক্রি হচ্ছে ১২শ’ দরে। এই ধান ভাঙ্গিয়ে চাউল তৈরি করলে সব খরচ মিলিয়ে উৎপাদন দাড়ায় ২ হাজার ৬শ’ টাকা করে। কিন্তু বাজার পড়তি থাকায় এখন এই চাউল বিক্রি করতে হচ্ছে ২৩৫০ টাকা দরে। ধানের বাজারে এখনো ধানের দাম কমেনি। এই কারণে সহসায় চালের বাজারে চাউলের দাম তেমনটা কমছে না বলে তিনি মনে করেন।

ফিরিঙ্গি বাজারের পরশ মনি রাইস মিলের মালিক গোলাম ওয়াদুদ জানান, তারা মুলত বাজার থেকে চাউল কমিশন ভিত্তিতে তা পাইকারি দরে বিক্রি করেন। বাজার যখন দরে বিক্রি হয় তারা তখন সেই দরেই চাউল বিক্রি করে থাকেন।

তিনি জানান, আজকের বাজারে আটাশ চাউল বিক্রি হচ্ছে ২৫শ’ টাকা করে। আগে এই চাউল বিক্রি হয়েছে ২৭শ’ টাকা করে। স্বর্ণা মোটা চাউল এখন বিক্রি হচ্ছে ২১শ’ টাকা করে। আগে এই চাউল বিক্রি হয়েছে ২৪শ’ টাকা করে। মোট কথা হচ্ছে মিনিকেট থেকে মোটা চাউলের দাম বস্তা প্রতি ৩শ’ টাকা করে বাজারে কমেছে।

ফিরিঙ্গি বাজারের ব্যবসায়ি আলহাজ্ব করিম মোল্লা জানান, এখানে তিন ধরণের মিলে চাউল তৈরি হয়। তার জানা মতে, শ্রীনগরসহ এখানে মোট ১০টি অটো রাইস মিল রয়েছে। আর চাতালের মাধ্যমে দেড় শতাধিক চাইলের মিল আছে। এরমধ্যে রযেছে ২০ থেকে ২৫টি মেজর রাইস মিল রয়েছে। খাদ্য উৎপাদনের সাথে জড়িত বিভিন্ন মিলের বাধ্যতা মূলক সরকারিভাবে লাইসেন্স নেয়ার নিয়ম রয়েছে। সেই হিসেবে মিল গুলো যে চাউল উৎপাদন করছে তার মাস্টার রুল দাখিল করার নিয়ম রয়েছে। সেই পরিসংখ্যান থেকেই চাউলের মজুদ খোলা বাজারে বিক্রির হিসেব সরকারের কাছে থাকার কথা। কিন্তু তার মনে হচ্ছে সেই হিসাব বা মাস্টার রুল কোন মিল মালিক সরকারকে দেয় না। এই সুযোগে কালো বাজারীরা বাজার থেকে অবৈধ ভাবে চাউলের দাম বাড়িয়ে মুনাফা লুফে নিচ্ছে।

মুন্সিগঞ্জ নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *