জল ঝড়ছে হাজারো চোখের

জসীম উদ্দীন দেওয়ান : চার দিন হলো মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে চলে গেলি মারুফ। তুই কি দেখতে পাচ্ছিস, এখনো তোর বাড়িতে কত্তো মানুষের ঢল? এখনো তোর মাকে শান্তনা দিতে আসছে তোর স্কুলের শিক্ষকবৃন্দ, তোর ক্লাসের বন্ধুরা, তোর রক্তের সম্পর্কের বাইরেও শত শত মানুষেরা, যারা তোকে বকে বকে কাঁদছে। তুই এতো দুষ্টো কেন মারুফ?

কেউ বুঝি এভাবে চলে যায়! এভাবে কি কারো যেতে হয়? বুঝেছি বেড়াতে এসেছিলি। তাই বুঝি না বলেই চলে যেতে হয়? বড্ড দুষ্টরে তুই। মায়ের সাথে কেউ বুঝি এভাবে আড়ি বাঁধে? মাকে একটু শান্তনা দিয়েও গেলিনা। মিরকাদিম পৌরসভার মুরমা পালপাড়ার বাসিন্দা,মিরকাদিম হাজি আমজাদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেনীর ছাত্র মারুফ শিকদার। পথে চুপ চাপ হাঁটতো, নামাজের সময় হলে নিশ্চুপ মসজিদে যেতো, ভালোবাসতো সাইকেল চালানো ও সাইকেল ষ্ট্যান্ড করানোর কৌশল। মারুফ সাইকেল চালানো ভালোবাসতো এটা যেমন সবে জানতো।

মারুফকে সবে তেমন ভালোবাসতো, এটাকি মারুফ কখনো জানতে পেরেছে? তুই কি দেখতে পারছিস মারুফ, হাজারো হাজারো মানুষেরা তোর বিদায়ে হুহু করে কেঁদেছে? এখনো কাঁদছে চোখের জল ঝড়িয়ে। আজও তোর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তোর বন্ধুরা অঝড় কেঁদে যাচ্ছে। তবে তোর এতো অভিমান কেন ছিলোরে? আমায় পথে দেখে তুই ফেল ফেল করে তাকিয়ে থাকতি, কিছু বলার জন্য। ওরে দুষ্টো আমিতো সেইটা বুঝতে পারিনি। তুই কি পারতিসনা আমাকে ডেকে তোর অভিমানের কথাটি বলতে।

তবেতো তোর অভিমান ভাঙ্গার সব কৌশল আমি ব্যবহার করতাম। তুই কি তবে পালিয়ে যেতে পারতিস আমাদের ছেড়ে! গেল শুক্রবার ১৫ সেপ্টেম্বর সারা দিনমান ধরে আহারে কি যে তাপদাহ বয়ে গেলো, অসহ্য যন্ত্রনায় ভরা ছিলো সেই তাপদাহের দিনটি। সেই তাপদাহকে উপেক্ষা করেও সাইকেল নিয়ে বের হতে হয় তোকে.. ঘন্টা দুয়েক জেলার বিভিন্ন পথ ঘুরে বুঝি ওদের বলে বলে বিদায় নিয়েছিস? আর আসবোনা তোদের তরে। চলে যাবো সেই ঘরে, যেথা মানুষের হয় শেষ ঠিকানা। এই অঞ্চলের পথ, আলো বাতাস, সব্বার কাছ থেকে বিদায় নিলিরে দুষ্টো, আমাদের সাথে তোর এতো মান কেন ছিলো?

তুই ভেবেছিস আমরা কষ্ট পাবো বলে.. বলতে চাসনি? এখন বুঝি আমরা অনেক কম কষ্ট পাচ্ছি? কতো মৃত্যুর সংবাদ শোনি, রিপোর্টের উদ্দেশ্যে সেই মৃত্যদের ছবি তোলে সংবাদও পরিবেশন করেছি। কিন্তু তোর মৃত্যুর সংবাদটা হৃদয়টাকে ঝাকতে ঝাকতে রক্ত ক্ষরণ শুরু করে দিয়েছে। হৃদয়ে কতোকটা ক্ষত হয়েছে বলতে পারছিনা। কোন পাষান এসে হিট ষ্ট্রোকের দোহাই দিয়ে আমাদের কাছ থেকে তোকে কেড়ে নিলো, নাকি তুই অভিমানের ছায়ায় হারিয়ে গিয়ে হাজারো চোখের জল ঝড়াতে এমনটা করেছিস?

মারুফ তুই দেখ একবার হলেও দেখ, তোর বাবা সিরাজুল ইসলাম বুকে পাষান বেঁধেছে, মুখের কান্নার স্বর স্তব্দ হয়ে গেছে, তবে তাঁকে দেখে বেশ বুঝা যাচ্ছে তোর বিদায়ে ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেছে তাঁর হৃদয়টা। সবার কথা নাইবা ধরলাম, তোর মা ঝর্ণা বেগমের কথাটা একবার ভাবলিনারে তুই। যার মনের দু:খ -কষ্ট ও সুখ -শান্তির সব কথা গুলো তোর কাছেই বলে। তুই না থাকলে সে কথা কার কাছে বলবে তোর মা? একবারো ভাবলিনা মায়ের কাছে তুই যে কতোটা গুরুত্বের ধন। তুই কেন চলে গেলি মারুফ? তোরা কেন চলে যাস!