চোখের জল বেঁধে রাখতে পারিনি

জসীম উদ্দীন দেওয়ান : শুক্রবার বিকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মুন্সীগঞ্জ সদরের মিরকাদিম পৌরসভার প্রায় প্রতিটি পাড়া -মহল্লায় দশম শ্রেনীর ছাত্র মারুফের মৃত্যু নিয়ে মুখে মুখে আলোচনা। সেই আলোচনা জুড়ে ছিলো, শোক ও বিস্ময়! বিকাল সাড়ে পাঁচটায় মারুফের অনিশ্চিত মৃত্যুর সংবাদ আসা মাত্র, লোকে লোকারন্য হয়ে যায় মস্তানবাজার থেকে শুরু করে মারুফদের বাড়ি পালপাড়া পর্যন্ত। পালপাড়ার অলিগলিতে শোনা যায় কান্নার রোল।

এমন দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে, হাজারো মানুষের হৃদয়ে থাকা অতি প্রিয় কোন মানুষটিকে কোন পাষানি থাবা মেরে ইহ জগৎ থেকে চিরদিনের জন্য ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। কিছুটা সময়ের মধ্যেই সবায় পুরোটা নিশ্চিত হয়ে যায়, প্রিয় সেই মারুফ আর নেই। মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিথর পরে আছে মারুফের দেহখানা। সেই সময় থেকে রাত এগারোটায় জানাজা নামাজ পর্যন্ত নামে মানুষের ঢল। কারো কন্ঠে হুহু কান্না, কারো বুকে বেদনার ঝড়, আবার কেহ বুকে কষ্ট চেপে রেখে কান্না থামাতে পেরেছে, তবে সবার মলিন মুখ পুরো এলাকাকে স্তব্দ করে দিয়েছে। অনেকের মতো মারুফের চলে যাবার সংবাদে বুকে কষ্ট চেপে রেখেছিলাম। কিন্তু বেশিটা সময় তা পারিনি।

বুকের ভিতর ব্যাথার ঝড় বয়ে চোখের কোনে অশ্রু জমাট বাঁধে। মারুফের সাথে আমার চার পাঁচ বার কথা হয়েছিলো, তাও পথের মাঝে। আমায় দেখা মাত্র সালাম দিতো আর ফেল ফেল করে চেয়ে থাকতো। আমি কখনো বুঝতে পারিনি ওর এই অপকল চাহনির মানেটা। বিশেষ করে চেষ্টা করিনি কারণটা বুঝবার। ব্যস্ত পথ, ব্যস্ত চলার সময়টা ধরে চলে যেতাম। এখন বুঝতে পারছি ও আমাকে বলার চেষ্টা করেছিলো ওর অকালে চলে যাবার বিষয়টি। ও হয়তো বলার চেষ্টা করেছে, আমিতো তোমাদের ছেড়ে চলে যাবো, আমার জন্য প্রতিদিন দোয়া করবে। মারুফ তোর ভাষা বুঝতে চাইনি। কিন্তু যে দায়িত্ব তুই দিয়ে গেছিস তোকে কথা দিলাম, তা আমি অনেক যত্ন করে পালন করবো। প্রতিদিন যতোটুকু পারি তোর রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া পাঠাবো। একদিন ওর সাথে আমার একটু বেশি কথা হয়েছিলো, পথে দেখে আসর নামাজ পড়তে নিয়ে গিয়েছিলাম ওকে । ও এম্নিতেই নামাজ পড়তো, কিন্তু সেই দিন কেন যেন ফাঁকি দিতে চেয়েছিলো।

আমি বলার পর সঙ্গে সঙ্গে আমার সাথে নামাজে গিয়েছিলো। সাইকেল চালাতে প্রচন্ড ভালোবাসতো দশম শ্রেনীতে পড়ুয়া মা ঝর্ণা বেগমের নারী ছেড়া ধন মারুফ। প্রতি শুক্রবারের ন্যায় কাল দুপুরের খাবার সারামাত্র, তিনটায় বন্ধুদের ফোন পেয়ে ছুটে চলে সাইকেল নিয়ে। প্রচন্ড গরমে বাবার নিষেধটা মানেনি সাইকেল রেস প্রেমী মারুফ। বিকাল পাঁচটা বেজে ছয় মিনিটে মুঠো ফোনে মাকে বলে, মাগো আমার মাথাটা কেমন যেন করছে.. মা ঝর্ণা বেগম প্রথমতো একটু ধাক্কা খেলেও, মারুফকে একটি রিক্সায় চরে বাড়ি চলে আসতে বলে,পথের দিকে চঞ্চল দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। ছেলে এখনো আসছেনা, মার যেন তট সইছেনা। ফের ২৪ মিনিট পর একটা কল আসে তার মুঠো ফোনে। হাসপাতালে একটু আসতে পারবেন? ঝড়ের গতিতে মারুফের মা জানতে চায় কেন? মারুফ কি এ্যাকসিডেন্ট করেছে? একটু আসেন। বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে চলে মা।

হাসপাতালে পৌঁছে ঝর্ণা বেগম পাগলের মতো খুঁজে ফিরে ছেলেকে। মারুফ কোথাও নাই। যখন উপস্থিত লোকদের জিজ্ঞেস করে, লাল গেঞ্জি পড়া অল্প বয়সের একটি ছেলে এ্যাকসিডেন্ট করে আসছে, কোন রুমে বলতে পারেন? মারুফের এক বন্ধু মেঝের দিকে আঙ্গুল তুলে জানালেন, ঐ যে মারুফ। মায়ের চোখে মেঝেতে থাকা কোন বস্তু ধরা পরেনা। ঝর্ণা বেগম মেঝেতে ফের তাকিয়ে দেখে, সাদা কাপড়ে আপাদ মস্তক মোড়ানো একটা লোক। এটাই যে মারুফ মা কি তা কোন ভাবে ভাবতে পারে! কোন গাড়ির সাথে ধাক্কা পর্যন্ত লাগেনি। তবুও কেন চলে গেলি মারুফ! তোর এতো অভিমান কেন? তোরা কেন চলে যাস!