ভারত থেকে গরু আসায় দুঃশ্চিন্তায় দেশি খামারিরা

ঈদুল আজহার চার দিন বাকি থাকলেও মুন্সীগঞ্জ জেলার স্থানীয় খামারগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার আমেজ নেই। লাভের আশায় গড়ে তোলা ঐতিহ্যবাহী খামারগুলোতে এখন হতাশার ছবি। গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, চারদিকে বন্যার পানি বৃদ্ধি এবং ভারতীয় গরুর প্রবেশের কারণে দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন খামারিরা। ৬টি উপজেলায় ৩হাজার ২শ ৩৮টি খামারে আছে ২০ হাজার গরু। আগে যেখানে খামারে বসেই ক্রেতাদের দর কষাকষিতে মুখোরিত থাকত পরিবেশ, বর্তমানে সম্পূর্ন ভিন্ন চিত্র। জেলার কুরবানির পশুর চাহিদা আছে ৪০ হাজার। ফলে গরু মোটাতাজাকরণে প্রচুর খরচ বৃদ্ধি পেলেও খামার মালিকরা কোরবানীর হাটে গরু বিক্রি করে একটু লাভের আশায় লাখ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। দেশে বিভিন্ন জেলায় আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়ায় ক্রেতার অভাবে খামার মালিকদের আয়ের স্বপ্ন এখন হতাশায় রূপ নিয়েছে। এছাড়া দেশব্যাপী খ্যাতি অর্জনকারী মীরকাদিমের ধবল গরু নানাবিধ সমস্যায় জর্জারিত হয়ে সুনাম হারাতে বসেছে।

সদরের মাঠপাড়া এলাকার খামারি জাকির হোসেন জানান, এবারের কুরবানির ঈদে খামারে ৫০টি গরু আছে। দেশীয় পদ্ধতিতে লালন পালন করে খামারে বেড়ে উঠা এসব গরুর চাহিদা ক্রেতার কাছে সব সময়ই পছন্দের তালিকায় প্রধান হিসাবে বিবেচত। সবজি, ঘাস, ভূসি, খৈল, ভাতের মাড় গরুর প্রধান খাবার। তবে গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং বাহিরে থেকে গরু জেলাতে প্রবেশের কারণে লাভ আসবে না বলে ধারনা করা যাচ্ছে। এক সময় মিরকাদিমে ছিলো তেলের ঘানি বা মিল, ধান-চালের মিল। তাই খুব সস্তায় খৈইল, ভুষি, খুদ, কুড়া পাওয়া যেত। এখন চালের মিল থাকলেও খৈল, ভুষি, কুড়ার দাম বেশী। ৫০ কেজি চালের কুড়া ৮শ টাকা, ৫০ কেজি চালের খুদ ১৭শ ৫০ টাকা, ৩৫ কেজি গমের ভূষি ১৩শ টাকা। আগে ঈদের ১০-১৫দিন আগেই খামারে বসে গরু বিক্রি হয়ে যেতো। কিন্তু এখন খামারে দুঃশ্চিন্তায় দিন যাপন করতে হচ্ছে। গরু মোটা-তাজাকরণ পদ্ধতি দেশিয় পদ্ধতিতে হওয়ায় এই অঞ্চলের মানুষের কাছে ব্যপক সুনাম অর্জন করেছে। কিন্তু এবারের ঈদে খামারে দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি গরুর বাজার লোকসানের মুখে বলে জানান তিনি।

লৌহজং উপজেলা খামার মালিক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রশীদ শিকদার জানান, খামারে ৩৫০টি গরু রয়েছে, ১৫০টি গরু কুরবানির উদ্দ্যেশে বিক্রি করা হবে। নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে গরুগুলো খামারে পরিচর্যা করে মোটাতাজা করা হয়ে থাকে। ছোট থেকে বড় করে পরিবারের সদস্যের মতোই লালন পালন করা হয়ে থাকে। খামারে শুধু লাভের জন্য গরু লালন-পালন করা হয় না। জেলার খামারীরা নানাবিধ কারণে এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এজন্য গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং পৃষ্ঠপোষকতাকেই দায়ী করেছেন তিনি। এর মধ্যে ভারতীয় গরু এসে স্থানীয় খামার মালিকদের আরো বিপদে ফেলে দিয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার পূর্ব শিলমন্দি এলাকার খামার মালিক আহসান উল্লাহ জানান, কোরবানীর গরু বিক্রিতে চলতি বছরের মতো এমন ক্রেতার অভাব বিগত বছরগুলোতে দেখা যায়নি। তার খামারে থাকা মোটাতাজা ২০টি গরু রয়েছে। ক্রেতা অভাব দেখা লাভ তো দুরের কথা, ২০ লাখ টাকা চালান উঠাতে পারবো কিনা তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছি।

অপর খামারি মো. রোস্তম শেখ জানান, পিতা তমিজউদ্দিন শেখ ৮৫ বছরের বৃদ্ধ হওয়ায় পৈত্রিক ব্যবসার হাল ধরেছেন তিনি। গত বছর কোরবানীর ঈদের এক মাস আগেই ৮টি গরু খামার গিয়েই ক্রেতারা কিনে নিয়ে গেছেন। আর ঈদ আসতে দুই সপ্তাহ বাকী থাকলেও এবার তিনি একটি গরুও বিক্রি করতে পারেনি। তারা জানান, তাদের মতো মুন্সীগঞ্জের খাসকান্দি, পূর্ব শিলমন্দি এলাকার আমির বেপারীর ২০টি, আলামিন মিয়ার ৩০টি, শরীফ বেপারীর ২০টি, নুরুল ইসলাম বাবুর্চির ১০টি, বাদশা মিয়ার ১০টিসহ একাধিক খামার মালিকের একই অবস্থা। অথচ অবিক্রিত এই মোটাতাজা গরু গুলোর একেকটির মূল্য হবে এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকা।

সদরের এনায়েতনগর গ্রামের খামার মালিক জালাল বেপারী জানান, ঢাকায় মিরকাদিমের গরুর চাহিদা অনেক। তাই কোরবানী ঈদের ৭ থেকে ৮ মাস আগেই তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছোট ও বাছাই করা গরু কিনে আনেন। বিশেষ করে বাজা গাভী, খাটো জাতের বুট্টি গরু, নেপালি, সিন্ধি জাতের গরু আনা হয়। প্রতিটি গরু ক্রয়ে মূল্য পরে ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। মোটাতাজা করতে খরচ পড়ে আরও ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। এতে সর্বমোট খরচ পড়ে এক লাখ টাকারও বেশী। তাদের দাবি, একটি গরুর পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়। যত্ন নিতে হয় অনেক বেশি। কোরবানীর হাটে বিক্রি করে তেমন লাভবান হওয়া যায় না। তবে ঐতিহ্য ধরে রাখতে বাপ-দাদার এ ব্যবসায় কিছু খামারি কোন মতে টিকে আছে।

জেলা প্রানী সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মো. আফাজউদ্দিন জানান, বন্যা পানিতে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত গরুর জন্য কৃমিনাশক ট্যাবলেটসহ অন্যান্য ওষধ বিতরণ করা হচ্ছে। চিকিৎসা জন্য উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে ভেটনারী সার্জনদের নেতৃত্বে একাধিক টিম গঠন করে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার নিদের্শনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পানিবন্দি থাকা গরু রক্ষনাবেক্ষনে সরকারি ভাবে প্রয়োজণীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পক্রিয়া হচ্ছে। কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে জেলার ৬টি উপজেলায় ৩হাজার ২শ ৩৮টি গরুর খামারে প্রায় ২০ হাজার গরু মোটাতাজা করা হয়েছে। এর মধ্যে ষাঁড় গরুর সংখ্যা ৯ হাজার ৪শ ৫৭টি, গাভী গরুর সংখ্যা ২ হাজার ৬শ ৩৮টি, বলদ গরুর সংখ্যা ২ হাজার ৪৪টি। এছাড়া খাটো জাতের বুট্টি গরু, নেপালি, সিন্ধি জাতের গরুসহ বিভিন্ন জাতের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার গরু মোটাতাজা করে প্রস্তুত রেখেছে খামারিরা। অন্যদিকে ছাগল রয়েছে ১৩শ২৯টি। ভেড়া রয়েছে ৩২৫টি। গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত এ হিসাব নিরূপন করা হলেও মাঠ পর্যায়ে তালিকা নিরূপন কাজ অব্যাহত থাকায় গরু ও ছাগলের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

সোনালীনিউজ