মেঘনায় ডিনামাইট ফাটিয়ে বন্যার ব্যাপকতা হ্রাস!

মেঘনা নদীর মোহনায় ডিনামাইট ফাটিয়ে নদীর গভীরতা বাড়িয়ে হ্রাস করা যায় বন্যার ব্যাপকতা। বাংলাদেশে পানি শুকিয়ে গেলে নদীর ওপরের দিকের এলাকা বেছে নেয়া হয় খননের জন্য। পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে খুব বেশি উপকার হয় না; বরং বাংলাদেশের তিন বড় নদী পদ্মা, যমুনা ও মেঘনার সম্মিলিত পানি মেঘনার মোহনা দিয়ে যেখানে সাগরে পতিত হয় সেখানে খনন করা উচিত। মোহনায় খনন করা হলে নদীর তলদেশ থেকে নরম মাটি সরে সাগরে চলে যাবে, সেখানে গভীরতা বাড়বে ও আরো বেশি পানি একই সাথে সাগরে যেতে পারবে। ফলে উজানে পানি বৃদ্ধি পেলে অথবা বন্যা হলে দ্রুত নিচের দিকে পানি প্রবাহিত হয়ে সাগরে পড়তে পারবে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. এস আই খান জানান, তলদেশে ডিনামাইট অথবা এ ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহারের মাধ্যমে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি করে নাব্যতা বাড়িয়েছে ও বন্যা থেকে মুক্তি পেয়েছে জাপান, রাশিয়া, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়ার মতো কয়েকটি দেশ। তাদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ শেয়ার করতে পারে। এ ছাড়া নদীর গভীরতা বৃদ্ধি করে বন্যা ও নদীভাঙন থেকে দেশকে মুক্ত করা সম্ভব বলে জানান ড. এস আই খান।

তিনি বলেন, মেঘনা নদীর মোহনায় ডিনামাইট দিয়ে পরিকল্পিত বিস্ফোরণ ঘটালে এখান থেকে যে মাটি সাগরে যাবে তা বাঁধ নির্মাণ করে আটকে দিয়ে সাগরের ২৫ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের জায়গা উদ্ধার করতে পারে বাংলাদেশ। এ জন্য কক্সবাজার থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত একটি আড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। এ বাঁধ যেমন নতুন ভূমি উদ্ধারে সহায়তা করবে; তেমনি বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা জলোচ্ছ্বাস, ঝড়ের ছোবল থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া চীন নাব্যতা ও প্রশস্ততা বাড়াতে মেকং নদীর ইউনান প্রদেশ থেকে লুয়াংপ্রাবাং পর্যন্ত এলাকা ৫০০ টনি কার্গো চলাচলে আরো উপযোগী করার উদ্দেশ্যে নদীপথে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দ্বীপগুলো ডিনামাইট দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে নদীর ৯০০ কিলোমিটার পথ তৈরি করতে চাচ্ছে।

পলি পড়ে ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়েছে বাংলাদেশের অনেক নদী। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুসারে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের নদীগুলো ২৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকায় নাব্যতা ছিল। তখন বন্যার ব্যাপকতাও কম ছিল। বর্তমানে এ নদীগুলোর মাত্র দুই হাজার ৪০০ কিলোমিটার এলাকায় নাব্যতা রয়েছে। ফলে একটু বেশি পানি হলেই নদীর দুই কূল ছাপিয়ে পানি দুই তীরে উঠে বন্যার সৃষ্টি করে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সরকার বিচ্ছিন্নভাবে কিছু নদী খননের চেষ্টা করে আসছে। এতে কোনো লাভ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ড. এস আই খান। বর্ষাকালে খনন করা এসব স্থান আবার পলি পড়ে ভরাট হয়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাসেক্স সেন্টার ফর মাইগ্রেশন রিসার্চ ২০১৩ সালে গবেষণার ফলাফলে জানিয়েছে, নদীভাঙনে বাংলাদেশে বছরে ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ মানুষ ভিটেবাড়ি থেকে স্থানান্তরিত হয়ে থাকেন। নদীভাঙনের শিকার মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) মমিনুল হক সরকার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যমুনা তীরের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনা, মানিকগঞ্জ এলাকায় বেড়েছে নদীভাঙন। এ ছাড়া পদ্মা নদীর তীরে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও চাঁদপুর জেলায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অতিবৃষ্টির কারণে নদীতে স্রোত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়া নদী পুরো পানি বয়ে নিতে না পারায় নদী ভাঙছে ব্যাপকভাবে।

সিইজিআইএসের তথ্য অনুসারে ১৯৭৩ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত পদ্মা নদীর দুই তীরের ২০ হাজার ৩৯০ হেক্টর ভূমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অপর দিকে ১৯৭৩ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত যমুনার তীরের দুই পাশের ৮৭ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমি নদীতে মিশে গেছে। এ ছাড়া হিমালয় থেকে বয়ে আসা পলি নিচের দিকে জমা হয়ে নদীর মোহনায় পড়ছে নানা রকম চর। অস্থায়ী কিছু চর নৌযান চলাচলে বিঘœ ঘটিয়ে থাকে ও নদীর স্রোতকে ভিন্নমুখী করে নদীভাঙনে সহায়তা করছে।

হামিম উল কবির
নয়া দিগন্ত