জাতীয় শোক দিবস ২০১৭ : জাপান আওয়ামী লীগের আলোচনা সভা

রাহমান মনি: বাংলাদেশের ইতিহাসে আগস্ট মাস শোকাবহ বেদনাদায়ক স্মৃতির মাস। বাংলাদেশর ইতিহাসের কালো অধ্যায় রচিত হয়েছে এই আগস্ট মাসে। প্রতিবছর আগস্ট মাস এলেই প্রগতিশীল, স্বাধীনতা বিশ্বাসী প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়।

শোকাবহ এই মাসের ১৫ আগস্ট কালো রাতে জাতি হারিয়েছে স্বাধীনতার মহানায়ক, স্বাধীনতার মহান স্থপতি ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। অনেক প্রাণের বিনিময়ে নস্যাৎ করে দিয়েছে বঙ্গবন্ধু তনয়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চক্রান্তকে। ভাগ্যক্রমে তাকে সেদিন প্রাণ দিতে হয়নি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নিহত এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট অতর্কিত গ্রেনেড হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ নেতাকর্মীদের হত্যার মধ্য দিয়ে যে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে তা প্রশমিত হবার নয়।

আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। মাঝখানে ৭ বছর পর আবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ২০০৯ সালে। শেখ হাসিনা হন দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দেন। যা, দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত হয়ে আসছিল। ১৫ আগস্টের ভয়াবহতার কথা মানুষকে ভুলানোর চেষ্টায় রপ্ত ছিল। সেই থেকে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। প্রবাসে ও বাংলাদেশে দূতাবাস এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে আসছে।
জাপান শাখা আওয়ামী লীগ জাতীয় শোক দিবস ২০১৭ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। কর্মসূচির মধ্যে দিবসটির তাৎপর্যে আলোচনা ও দোয়া মাহফিল ছিল অন্যতম।

৬ আগস্ট রোববার জাতীয় শোক দিবস ২০১৭ পালন উপলক্ষে আলোচনা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। ৬ আগস্ট পালন করার পিছনে অন্যতম কারণ ছিল হল প্রাপ্তি সংকট। হল প্রাপ্তি সংকটে প্রবাসীরা দীর্ঘদিন থেকেই ভুগছিল। এদিকে রোববার ছাড়া প্রবাসীরা যেমন কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারে না, তেমনি সংগঠনের সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ায় প্রায় প্রতি রোববারই একাধিক আয়োজন থাকে। তাই নিকটতম কোনো রোববারকেই প্রাধান্য দিতে হয় প্রবাসীদের আয়োজনে। এ বছরও তাই হয়েছে। তাছাড়া ১৫ আগস্ট জাপানে কর্মদিবস।

এ ছাড়াও এ বছর আরেকটি বিশেষ কারণ ছিল, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন জাতীয় শ্রমিক লীগের জাপান শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা ও শোক দিবসের আলোচনা উপলক্ষে জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আলহাজ শুক্কুর মাহমুদ এবং সাধারণ সম্পাদক আলহাজ সিরাজুল ইসলামের জাপান সফর। এই দুই কেন্দ্রীয় নেতাকে আওয়ামী লীগ শোক দিবসের আলোচনা সভায় পেতে চেয়েছিল এবং কেন্দ্রীয় নেতারাও তাতে সম্মতি প্রদান করেন।

৬ আগস্ট রোববার টোকিওর কিতা সিটির অউজি হোকুতোপিয়ার পেগাসাস হলে আয়োজিত জাতীয় শোক দিবস ২০১৭, দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জাপান আওয়ামী লীগের সভাপতি সালেহ মো. আরিফ। সভাটি পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আসলাম হিরা। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন জাপান শাখা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কাজী মাহফুজুল হক লাল, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মাসুদুর রহমান মাসুদ, জাপান সফররত জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি আলহাজ শুক্কুর মাহমুদ এবং সাধারণ সম্পাদক আলহাজ সিরাজুল ইসলাম।

সভার শুরুতেই বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয় সালেহ্ মো. আরিফের নেতৃত্বে। এরপর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টসহ স্বাধিকার আন্দোলনে যে সকল নেতাকর্মী জীবন বিসর্জন দিয়েছেন তাদের সকলের প্রতি সম্মান ও আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

জাতীয় শোক দিবসের তাৎপর্যে বক্তব্য রাখেন সুখেন ব্রহ্ম, কাজী ইনসানুল হক, হোসাইন মুনীর, ডা. শাহ্রিয়ার সামি, বি. এম. হারুন, নাজমুল হোসেন রতন, আব্দুর রাজ্জাক, মো. শাহ্ আলম মোল্লা, মো. মাসুদুর রহমান মাসুদ, কাজী মাহফুজুল হক লাল, আলহাজ শুক্কুর মাহমুদ, আলহাজ সিরাজুল ইসলাম, সালেহ্ মো. আরিফ প্রমুখ।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের নিকৃষ্টতম হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে দেশকে অনেক পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া একটি দেশকে বঙ্গবন্ধু যেভাবে নেতৃত্ব দিয়ে স্বনির্ভর সোনার বাংলায় গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, আজ যদি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেন তাহলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের মধ্যে উন্নত দেশগুলির সারিতে অবস্থান করত। আমাদের কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশ যেতে হতো না। বরং বিদেশিরাই বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যেত।
বঙ্গবন্ধুকে জানতে হলে ব্যাপকভাবে পড়াশুনা করতে হবে। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে বঙ্গবন্ধুকে আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রকৃত ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু একটি প্রতিষ্ঠান। একটি আদর্শ। মানুষকে মুছে ফেলা যায় কিন্তু তার আদর্শকে কখনোই নিশ্চিহ্ন করা যায় না। আদর্শ চলমান থাকে। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু।

তারা বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার মাধ্যমে আমরা এতিম হয়ে গিয়েছিলাম। নেতৃত্বশূন্য এ জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে বঙ্গবন্ধু তনয়া আমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখাচ্ছেন। তারই যোগ্য নেতৃত্ব এবং সঠিক দিকনিদের্শনায় বাংলাদেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ আজ আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা। পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে আজ দৃশ্যমান। বাংলাদেশের এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। কৃষিকাজ থেকে শুরু করে সর্বত্র আজ নেটের আওতায়। মুহূর্তের মধ্যে কৃষক জেনে নিচ্ছে তার কর্মপন্থা, উন্নত ফলনের যাবতীয় বর্ণনা।

প্রধানমন্ত্রীর এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। হোঁচট খেতে দেয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে শেখ হাসিনা-ই আমাদের শেষ ভরসা। আগামীতেও দলকে ক্ষমতায় আনতে হলে এখন থেকেই আমাদেরকে নির্বাচনী প্রচারে নামতে হবে। দ্বারে দ্বারে গিয়ে উন্নয়নের বর্ণনা জানাতে হবে। শেখ হাসিনা ছাড়া যে উন্নয়নের বিকল্প নেই, সেটা বোঝাতে হবে।

দলে অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিড নেতাদের তীব্র সমালোচনা করে বক্তারা বলেন, এই হাইব্রিড নেতাদের জন্যই দলের বদনাম হচ্ছে। তারা সুযোগ সন্ধানী এবং সুবিধাভোগী। দলের মধ্যে এরা যেমন উচ্ছিষ্ট, তেমনি উচ্ছিষ্টতা খেয়ে এরা ক্ষমতা না থাকলে এরা আবার নতুন কোনো সন্ধান চালাবে। মাঝখানে বদনাম যা হবার তা দলের হবে। দায় দলকেই নিতে হবে।

এই জাপানেও অনুপ্রবেশকারীরা রয়েছে, যারা জাপান আওয়ামী লীগের কর্ণধার পরিচয় দিয়ে সচিবালয়সহ সরকারি অফিসগুলোতে দালালির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। তারা যদি জাপান আওয়ামী লীগের নেতা-ই হবেন, তাহলে জাপানে দলের জন্য কাজ না করে নিজের আখের গোছাতে সচিবালয়ে টোকাইয়ের ভূমিকায় থাকবেন কেন বলে বক্তারা প্রশ্ন রাখেন। এদের অস্তিত্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ জোরালোভাবেই পাওয়া যায়। তাদের চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিস্ট পাঠাতে হবে। কারণ, হাইব্রিড মুক্ত দল লক্ষ-কোটি নেতাকর্মীর প্রাণের দাবি।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক