মুন্সীগঞ্জ ১: গ্রুপিংয়ে জর্জরিত আওয়ামী লীগ-বিএনপি

মোজাম্মেল হোসেন সজল: বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, দলীয় কর্মসূচি আর সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণের মধ্য দিয়ে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা না দিলেও প্রস্তুতি নিয়েছেন কেউ কেউ। সিরাজদিখান ও শ্রীনগর- এ দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত মুন্সীগঞ্জ-১ আসন। এখানে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনে রয়েছে প্রকাশ্যে বিরোধ। ছাত্রদল-যুবদল ও ছাত্রলীগে রয়েছে পাল্টাপাল্টি কমিটিও। বিকল্পধারা, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামীসহ বামদলগুলোর ভোট হাতেগোনা।

মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে বরাবরই শ্রীনগর উপজেলা থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের দলীয় প্রার্থী দিয়ে থাকে। স্বাধীনতা পরবর্তী এই আসনে সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের আধিপত্যই ছিল বছরের পর বছর। জাতীয় নেতা হিসেবে ব্যক্তি বি. চৌধুরীর ইমেজ রয়েছে এখানে। সর্বশেষ ২০০৮ সালে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে বি. চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন। এর আগে তিনি বিএনপি থেকে ৫ বার এবং তার ছেলে মাহী বি. চৌধুরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে পরাজয়ের পর বি. চৌধুরী ও মাহী বি. চৌধুরী এলাকার খুব একটা আসেননি। তবে বি. চৌধুরী ভোটারদের কাছে এখনও গ্রহণযোগ্য।

অন্যদিকে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বিএনপিতে যোগ দেয়ায় নিজেকে ধরে রাখতে পেরেছেন। তবে, দলের মধ্যে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। শ্রীনগর ও সিরাজদিখান দুই উপজেলাতেই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের মধ্যে প্রকাশ্যে বিরোধ কখনো কখনো সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। কোন রকম সম্মেলন ছাড়া শ্রীনগর উপজেলা বিএনপি কমিটি গঠন এবং শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন গ্রুপের লোকদের কমিটি অনুমোদন দেয়ার পর এখানে সাবেক কমিটিও কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। শ্রীনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ মমিন আলী ও দেলোয়ার হোসেন গ্রুপ এক পক্ষের এবং শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের পক্ষের শহীদুল ইসলাম ও আবুল কালাম কানন আরেক গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন। শহীদুল ইসলাম-কানন এবং আলহাজ মমিন আলী-দেলোয়ার হোসেন দুই গ্রুপই শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ ব্যবহার করে আলাদাভাবে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। এই দুই কমিটির দ্বন্দ্বে স্থানীয় ছাত্রদল-যুবদলের একাধিক কমিটি রয়েছে। এই পর্যন্ত দুই কমিটির মধ্যে কয়েকদফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

একই স্থানে, একই সময়ে পাল্টাপাল্টি সভা ডাকায় শ্রীনগর উপজেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারাও জারি করেছিল। সর্বশেষ গত ২২শে জুলাই সকালে সিরাজদিখানের কুসুমপুর মাঠে বিএনপির সদস্য নবায়ন ও প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আসার পথে ছনবাড়ি চৌরাস্তায় মমিন আলী ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন গ্রুপের দুই কমিটির লোকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। এতে ৫ জন আহত হয়। পরে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশারফ হোসেনের উপস্থিতিতে কুসুমপুর মাঠে ওই দুই গ্রুপের মধ্যে আরেক দফা হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। সিরাজদিখানে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের দেয়া কমিটি অনুমোদনকে কেন্দ্র করে বিএনপি তিন গ্রুপে বিভক্ত। বি. চৌধুরী বিএনপি ছাড়ার পর আলহাজ মমিন আলী ও দেলোয়ার হোসেন দলকে সুসংগঠিত করে রেখেছেন। দলীয় একটি সুযোগ-সন্ধানী চক্রের কারণে কোনো রকম সম্মেলন ছাড়া শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণা দেয়া হলেও ১৪টি ইউনিয়নের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিকসহ অধিকাংশ নেতাকর্মী এখনও রয়েছে মমিন আলীর পক্ষে।

গত উপজেলা নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জে ৫টি উপজেলায় বিএনপির প্রার্থীরা পরাজিত হলেও শ্রীনগরে মমিন আলী প্রায় সাড়ে ২৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। বাকি দুইটি ভাইস চেয়ারম্যান এই উপজেলায় জয়লাভ করে। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বিরোধিতা করলেও কেন্দ্রীয় বিএনপির কোষাধ্যক্ষ সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহা রয়েছেন মমিন আলীর পক্ষে। আগামী নির্বাচনে মমিন আলী দলীয় নমিনেশন পাবেন বলে আশা করছেন। সিরাজদিখান উপজেলা যুবদল ও ছাত্রদলও তিন গ্রুপে বিভক্ত। উপজেলা যুবদলের পাল্টাপাল্টি কমিটি রয়েছে। সিরাজদিখানে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস ধীরেন ও সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন মোল্লা এক গ্রুপে, অপর গ্রুপে উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. আব্দুল্লাহ এবং তৃতীয় গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক কমিটির উপদেষ্টা সমসের আলী ভুঁইয়া। পদ নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করলেও সরকারবিরোধী আন্দোলনে সিরাজদিখান ও শ্রীনগর উপজেলায় কোনো আন্দোলন চোখে পড়েনি।

মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী তালিকায় শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন এবং শ্রীনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ মমিন আলী। মমিন আলী ২০০৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির টিকিট পেয়ে বিকল্পধারা প্রার্থী মাহী বি. চৌধুরীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এ ছাড়া বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু ও সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিল্পপতি শেখ মো. আব্দুল্লাহ। তবে মমিন আলীর পক্ষে রয়েছেন বেশির ভাগ নেতাকর্মী।

এখানে বিএনপির মতো আওয়ামী লীগেও রয়েছে বিভক্তি। স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে প্রকাশ্যে বিরোধ রূপ নিয়েছে সংঘর্ষে, মামলা হয়েছে একাধিক। সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ এলাকায় উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখলেও দলীয় সংঘর্ষ, নিজ বলয়ের নেতাদের দখলবাজি, নানা অপকর্ম এবং একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় তার উন্নয়নের কাজগুলো ম্লান হয়ে গেছে। নির্বাচনী এলাকার দুই উপজেলায় রয়েছে তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। শ্রীনগর উপজেলা ও শ্রীনগর সরকারি কলেজে রয়েছে ছাত্রলীগের পাল্টাপাল্টি কমিটি। দলীয় নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, সংসদ সদস্য সিরাজদিখানে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম সোহরাবসহ কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান দিয়ে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্ঠা করছেন। এদের সাথে রয়েছে যুবলীগ-ছাত্রলীগের কতিপয় নেতাকর্মী। অপরদিকে, সংসদ সদস্য বিরোধী আরেক অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন সিরাজদিখান উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. মহিউদ্দিন গ্রুপ।

সংসদ সদস্যের নিজ উপজেলা শ্রীনগর উপজেলার অবস্থা আরো ভয়াবহ। শ্রীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেনসহ কয়েকজনকে দিয়ে শ্রীনগরের রাজনীতি এককভাবে চালাচ্ছেন এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষ। সুকুমার রঞ্জন ঘোষ শ্রীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। সংসদ সদস্যের একক আধিপত্য রুখে দিতে শ্রীনগরের মাঠে রয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা গোলাম সারোয়ার কবীর। ইতিমধ্যে সংসদ সদস্য ও গোলাম সারোয়ার কবির গ্রুপের মধ্যে শ্রীনগরে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা এবং থানায় মামলা হয়েছে। সিরাজদিখানেও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. মহিউদ্দিন ও সংসদ সদস্য গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ, আধিপত্য নিয়ে ছাত্রলীগ নেতা খুনের ঘটনা ঘটেছে। এই মামলায় সকুমার রঞ্জন ঘোষ সমর্থিতরা আসামি হয়েছেন।

আগামী নির্বাচনে দুইবারের সংসদ সদস্য ও শ্রীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুকুমার রঞ্জন ঘোষ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন এমনটা নিশ্চিত করে বলছেন তার সমর্থকরা।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, প্রবীণ রাজনীতিক প্রফেসর ডা. বদিউজ্জামান ভুঁইয়া ডাবলু। তিনি আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের সভাপতি ও একই কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। ডা. ওবায়দুল কাদের ও বাহালুল মজনুন চুন্নু’র সমন্বয়ে গঠিত ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ছিলেন বদিউজ্জামান ভুঁইয়া ডাবলু। তিনি দুইবার যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ডা. ডাবলু ছিলেন মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক। তিনি বিক্রমপুর ভুঁইয়া মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। এলাকায় সেবামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। এ অবস্থায় তাকে নিয়ে একটি গ্রুপ আশাবাদী।

এ ছাড়াও প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, ঢাকা দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক গোলাম সারোয়ার কবীর। নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি এলাকায় প্রচার-প্রচারণা ও দলীয়সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন।

প্রার্থী হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের প্রেসিডেন্ট নুরুল আলম চৌধুরী। তিনি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী। নুরুল আলম চৌধুরী জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত সংগঠনের সিপিআই এক্সপোর্ট। তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে দলীয় নমিনেশন চেয়ে আসছেন।

সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন, সিরাজদিখান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দিনও।

প্রার্থী হতে ইচ্ছুক আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক মাকসুদ আলম ডাবলু। তিনি ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তিনি বর্তমানে মেট্রো বাংলা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডের পরিচালক।

এই আসনে বিকল্পধারা থেকে বি. চৌধুরী বা তার ছেলে মাহী বি. চৌধুরী প্রার্থী হতে পারেন। সব মিলিয়ে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বিকল্পধারার মধ্যে লড়াই হবে তীব্র। তবে অনেকেই বলছেন ডা. বি. চৌধুরী দুটি জোটের যেকোন একটিতে যোগ দিতে পারেন। এক্ষেত্রে জোটের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল বি. চৌধুরীর।

মানবজমিন