সাশ্রয়ী কংক্রিট ব্লক: ইটের পরিবেশবান্ধব বিকল্প

শাহাদাৎ হোসেন শিপু: কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরি পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে ক্রমাগত চলা নির্মাণ কাজে নির্মাণ সামগ্রীর চাহিদা বেড়েই চলেছে। তাহলে কী হবে? এ ক্ষেত্রে সমাধান হতে পারে কংক্রিট ব্লক।

ক্রমবর্ধমান নগরায়নের ফলে সারা দেশেই প্রচুর পাকা দালান নির্মিত হচ্ছে। সার্বিক সুবিধা বিবেচনায় মানুষ এখন কাঠ, টিনের ঘরের বদলে ইট, সিমেন্টের ঘর বানাচ্ছে। ফলে বেড়ে গেছে ইটের চাহিদা। বাংলাদেশে সাধারণত জমির উপরিভাগের মাটি পুড়িয়ে ইট প্রস্তুত করা হয়। ফলে এতে পরিবেশের নানামুখী ক্ষতি হচ্ছে।

প্রথমত, এমনিতেই এদেশে আবাদী জমির পরিমাণ অপ্রতুল। ইটভাটার জন্য এই জমি আরও সংকুচিত হচ্ছে। ইটভাটা সংলগ্ন জমিও হারাচ্ছে তার উর্বরতা। দ্বিতীয়ত, ইট পোড়ানোর ফলে উজাড় হয়ে যাচ্ছে বৃক্ষসম্পদ। গাছ কাটা হচ্ছে ইটভাটায় পোড়ানোর জন্য। তৃতীয়ত, ইটের ভাটা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া দূষিত করছে বাতাস এবং হুমকির মুখে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। এসবকিছু বিবেচনায় সরকার স্বিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামী ২০২০ সালের মধ্যে দেশের সকল ইটভাটা বন্ধ করে দেয়ার।

এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইটের বিকল্প নির্মাণ উপকরণ ও ব্যয় সাশ্রয়ী নির্মাণ উপকরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনিস্টিটিউট (এইচবিআরআই)।

এইচবিআরআই এর কর্মীরা জানান, উদ্ভাবিত এই ব্লক ব্যবহার করলে ভবনের নির্মাণ খরচ ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। তবে এখন পর্যন্ত এই প্রযুক্তি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া যায়নি বলে দেশবাসী এর সুফল এখনই পাবে না।

কর্মীরা জানান, রাজধানী ঢাকার ২০টির মত প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদের ভবন নির্মাণে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তারা এসব কংক্রিট ব্লক বিক্রি করে না। তবে ভবিষ্যতে ঢাকার বাইরে এসব ব্লক বিক্রি হতে পারে। কারণ, ২০২০ সালের মধ্যে ইটভাটা বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এটি ছাড়া বিকল্প থাকবে কম।

রাজধানী ঢাকার মিরপুর রোডের দারুস সালামে বিশাল জায়গাজুড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি অবস্থিত। এর গবেষণাগারে প্রতিনিয়ত গবেষণা চলছে বিকল্প নির্মাণ উপকরণ ও প্রযুক্তি উন্নয়নের। নদী ড্রেজিং করে যে বালুমাটি পাওয়া যায় তার সাথে ১০% হারে সিমেন্ট মিশিয়ে উচ্চচাপে ইট বানানো সম্ভব হয়েছে, যা সাধারণ ইটের চেয়ে গুণগত মানে ভালো এবং দাম কম পড়ে। তাছাড়া তারজালি ব্যবহার করে ফেরোসিমেন্ট প্রযুক্তিতে কম পুরুত্বের এবং কম খরচের পার্টিশন ওয়াল তৈরি করা যায়। আর বিকল্প নির্মাণ প্রযুক্তি হিসেবে ইন্টারলক সিস্টেমের (কোন ধরনের সিমেন্ট বা প্লাস্টার ছাড়াই জোড়া লাগে এমন)এক প্রকার ইটের প্রস্তুতি নিয়ে গবেষকরা খুবই আশাবাদী। তার পাশাপাশি থার্মাল ব্রিক নিয়েও চলছে জোর গবেষণা। এই ইট খুবই হালকা এবং ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য দুর্দান্ত কাজে দেয়।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুলভ আবাসনের কথা চিন্তা করে এইচবিআরআই, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অক্সফাম যৌথ উদ্যোগে গবেষণা করছে ‘সাসটেইনেবল হাউজিং’ নিয়ে কাজ করছে। আর ইটের বিকল্প হিসেবে এসব কংক্রিট ব্লক নিয়ে এইচবিআরআই জাপানের সাথেও গবেষণা করছে।

সম্প্রতি নিজের একটি প্রজেক্ট নিয়ে ঢাকার শ্যামলীতে এইচবিআরআইতে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে প্রাঙ্গণজুড়ে বিভিন্ন নির্মাণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা নানান রকম বাড়ির মডেল সাজিয়ে রাখা হয়েছে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে কংক্রিট এর ‘হলো ব্লক’ এর উন্নয়নের পেছনে। এসব বিকল্প নির্মাণ উপকরণের গুণাগুণ জনসাধারণের মধ্যে প্রচার ও জনপ্রিয়করনের কাজও চলছে পাশপাশি। কংক্রিট ব্লক ব্যবহারে বিল্ডিং নির্মাণের ব্যয় কমে যায় সাধারণ ইটের চেয়ে ৪০ প্রায় ভাগ পর্যন্ত।

পোড়াতে হয় না বলে এটা পরিবেশবান্ধব। বেশ কয়েকটা কোম্পানি ব্লক প্রস্তুত করছে। কনকর্ড, বিটিআই, মির, এসইএল ইত্যাদি। এসব ব্লক দিয়ে বানানো বিল্ডিং ইটের চেয়ে অধিক স্থায়ী হবে। এমনকি কংক্রিট ব্লক ছাদ ঢালাইয়ের কাজেও ব্যবহার করা যায়। চাইলে যে কেউ গিয়ে ঘুরে দেখে আসতে পারেন এইচবিআরআই এর গবেষণা পণ্যগুলো। সরকারি ছুটির দিন বাদে সপ্তাহের অন্য যে কোনো দিন এই সংস্থার কার্যক্রম পরিদর্শন সকলের জন্য উন্মুক্ত।

এখানে কর্মরত সকলেই খুবই আন্তরিক। সাধারণ মানুষের কোনো আইডিয়া, পরামর্শ থাকলে কিংবা তাদের তৈরি কোনো প্রযুক্তিও তারা গ্রহণ করেন গবেষণার জন্য। এ ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে শিগগির বাংলাদেশের ভবন নির্মাণ শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন গবেষকরা।

এইচবিআরআই এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রুবেল আহমেদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা বর্তমানে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও তা জনগণের কাছে জনপ্রিয় করতে কাজ করে যাচ্ছি। পোড়া ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লক অনেক বেশি কার্যকর, ব্যয়সাশ্রয়ী, টেকসই ও পরিবেশ বান্ধব। এছাড়াও নদীর ড্রেজিং সয়েলে উচ্চ চাপে ইট বানানোর প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছি।’

ঢাকাটাইমস