চরম দুর্ভোগে মুন্সীগঞ্জবাসী: ঝুঁকিপূর্ণ ৭৬ বেইলি ব্রিজ

মুন্সীগঞ্জে প্রবেশের বিভিন্ন সড়কপথ ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোর ৭৬টি বেইলি ব্রিজের প্রায় সবগুলোই ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে অনেকগুলো গত ১০-১২ বছর ধরে সংস্কারবিহীন। ছোট-বড় যেকোনো গাড়ি উঠলেই কেঁপে উঠছে সেতুগুলো। প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। আর যাতায়াতে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন মুন্সীগঞ্জবাসী।

তারা বলছেন, পদ্মাসেতুকে ঘিরে জেলাজুড়ে ব্যাপক উন্নয়নের জোয়ার বইছে। তবে সুন্দর রাস্তার ওপর বিপজ্জনক ব্রিজগুলো থাকলে এর সুফল আসবে না। যতো শিগগির সম্ভব সেগুলো মেরামত করা না হলে কমবে না দুর্ঘটনা ও মৃত্যুঝুঁকি।

জেলার সড়কপথের সেতুগুলো দিয়ে প্রতিদিন ৫২ লাখ ২৪ হাজার মানুষ এবং হাজার হাজার ভারী যানবাহন চলাচল করছে ঝুঁকি নিয়ে। অতিরিক্ত পণ্য ও যাত্রী নিয়ে সেতুতে উঠছে গাড়িগুলো। সড়কের সংস্কার করা হলেও সেতুগুলো থাকছে অবহেলায়। অবশ্য দীর্ঘদিন পরে পরে কিছু সেতুর সংস্কার করা হচ্ছে। তবে সবগুলোর স্থায়ী মেরামত না হলে আঞ্চলিক মহাসড়কগুলো ঝুঁকিমুক্ত হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে মাওয়ার ছনবাড়ি থেকে মুন্সীগঞ্জ সদরসহ অন্য উপজেলা ও ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জে প্রবেশের অন্যতম প্রধান সড়ক হাতিমারা মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সাইনবোর্ডে লেখা- ‘এই সড়কের সবগুলো সেতুই ঝুঁকিপূর্ণ’। তবে বেশিরভাগ ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর পাশে সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড নেই, কয়েকটিতে থাকলেও ত্রুটিপূর্ণ।

প্রায় ৭০টি যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলে এই আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে। অথচ সবগুলো সেতুকেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে অনেক বছর আগে।

এ অঞ্চলের মানুষের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলোর সংস্কার হয়নি। বিভিন্ন মহলে দাবি জানিয়েও কোনো কাজ না হওয়ায় চরম ঝুঁকি নিয়েই সেতু পার হতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

ডি এম পরিবহনের বাসচালক মো. আহসান মিয়া বাংলানিউজকে বলেন, ‘মাল নিয়ে উঠলেই কেঁপে উঠছে সেতু। অনেক সময় মনে হয়, এই বুঝি ভেঙে গেল। ৫ বছর ধরে এ রুটে গাড়ি চালাচ্ছি, এখন পর্যন্ত সেতুগুলোর সংস্কার হয়নি। ফলে অনেকগুলোর সংযোগস্থলও ভেঙে গেছে। প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা’।

‘বর্তমানে যেসব সেতুর সংস্কার করা হচ্ছে, সেগুলোর বিকল্প পথেও রয়েছে ভোগান্তি। কবে সবগুলো সেতুর সংস্কার কাজ শেষ হবে, সে আশায় আছি’।

মুন্সীগঞ্জে প্রবেশের অন্য পথ পদ্মাপাড় ধরে লৌহজং-টঙ্গিবাড়ি-মুন্সীগঞ্জ রুটটিও ঝুঁকিপূর্ণ সেতুতে ভরা। সওজের এ রাস্তাটিতে দুই-একটি আরসিসি ঢালাই ব্রিজের অবস্থা ভালো থাকলেও অধিকাংশই ঝুঁকিপূর্ণ।

ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা রতন বিশ্বাস বাংলানিউজকে বলেন, ‘গাড়ি খুব ধীরে চললেও ভয় লাগে। সেতুতে কোনো গাড়ি উঠলেই কাঁপতে শুরু করে, প্রচণ্ড শব্দ হয়। আলু মৌসুমে বড় বড় আলু বোঝাই ট্রাকগুলো ধারণ ক্ষমতার অনেক বেশি লোড নিয়ে যাতায়াত করে। অতিরিক্ত বালি ও পাথর বোঝাই ট্রাকের যাতায়াতে সমস্যা আরও বাড়ছে’।

‘অনেক সময় দেখা গেছে, স্টিলের পাটাতন সরে গিয়ে ফাঁকা জায়গার সৃষ্টি হয়। কিছুদিন আগেও সিএনজি চালিত অটোরিকশা উল্টে দু’জন যাত্রী গুরুতর আহত হন’।

বেতকা এলাকার দোকানদার সাত্তার হোসেন বলেন, ‘নিমতলী, সিরাজদিখান, কাকালদি, লৌহজং, হাতিমারা, কুণ্ডেরবাজার ও শ্রীনগর সড়কের ব্রিজগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। প্রতিনিয়ত বেইলি ব্রিজ ভেঙে জন ও যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। এছাড়া পাটাতন ভেঙে পড়লে মেরামতে সময় লাগে কয়েকদিন’।

‘যে উদ্দেশ্যে বেইলি ব্রিজগুলো স্থাপিত হয়েছিল, তা এখন আর কাজে আসে না। আরসিসি ব্রিজ নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে না’।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘এলজিইডি’র অধীনে আড়াই হাজার আঞ্চলিক সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক নেই এবং আমাদের অধীনে ব্রিজগুলো আরসিসি। সওজের অধীনে ৩৪৪ কিমি সড়ক আছে। তবে যদি আমাদের কোনো ব্রিজ-কালভার্ট ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেবো’।

গত বছরের ২২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশের সব বেইলি ব্রিজ সরিয়ে কংক্রিটের ব্রিজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত দেন। ১৪৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প অনুমোদিত হয়।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের মুন্সীগঞ্জ জেলার উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুর রহমান বলেন, ‘সওজের ২১টি ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ প্রতিস্থাপনের কাজ ইতোমধ্যেই শুরু করেছি। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে। আশা করি, অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে এ কাজ শেষ হবে। আমরা কংক্রিটের ব্রিজ নির্মাণে সমর্থ হবো’।

‘ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলোর মধ্যে সওজের অধীনে ৭৬টি সেতু আছে। ইতোমধ্যে ১৫টি ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর সংস্কার কাজ শেষ হয়েছে। চলতি অর্থবছরে আরো ১০টি সেতুর কাজ শুরুর কথা রয়েছে’।

সাজ্জাদ হোসেন | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর