মিরকাদিমের গৃহস্থের ঘরের ‘লক্ষ্মী’ গাভি

মফিজুল সাদিক:  মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের গৃহস্থ বিশ্বজিৎ বণিক (৪৪)। তার বাবা প্রাণকৃষ্ণ বণিক ২৫০ থেকে ২৬০টা গাভি পালন করতেন প্রশিক্ষিত লোক নিয়োগের মাধ্যমে। ২৪ বছর আগে মারা গেছেন প্রাণকৃষ্ণ।

ছোট ভাই ভোলানাথ বণিককে সঙ্গে নিয়ে এখন বাবার ঐতিহ্যবাহী মিরকাদিমের বিখ্যাত গাভি পালন ধরে রেখেছেন বিশ্বজিৎ বণিক।

কালের পরিক্রমায় এখন মাত্র ২২টি গাভি রয়েছে প্রাণকৃষ্ণের সন্তানের। গরু কিভাবে যত্নে পালন করতে হয় বিশ্বজিৎকে না দেখলে বোঝা যাবে না। নিজেরা মশা-মাছির কামড় খেলেও গরুর ধারে-কাছে ভিড়তে দেন না এসব কীট-পতঙ্গকে।

শংকর জাতের গরু পালন করেন বিশ্বজিৎ, সবগুলোই গাভি। এসব গাভিকে ধানের কুড়া, খৈলসহ বিভিন্ন উন্নতমানের গো-খাদ্য খাওয়ানো হয়। চালকল থাকায় গরুকে মিনিকেট চালের খুদ, খৈল, ভাতের মাড়, সিদ্ধ ভাত, খেসারির ভুসি, গমের ভূষি, বুটের ভূষিও খাওয়ান বিশ্বজিৎ। গরুর স্বাস্থ্যের দেখ-ভালে রয়েছেন চিকিৎসকও।
সরেজমিনে জানা গেছে, বিশ্বজিতের মতোই মীরকাদিমের অধিকাংশ গৃহস্থের ঘরের গাভিকে ‘লক্ষ্মী’ বিবেচনা করা হয়। প্রতিটি গাভি দৈনিক গড়ে ১২ থেকে ১৪ কেজি দুধ দেয়। এসব গাভি থেকে পাওয়া বাছুরও মহামূল্যবান। যেসব গাভি দুধ দেয় না, কোরবানির ঈদে সেগুলোকে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। যেসব গাভি বাচ্চা দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, দ্রুততম সময়ে সেগুলো মোটা-তাজা হয়ে যায়।

বিশ্বজিৎ বণিক বাংলানিউজকে বলেন, ‘গাভি আমাদের লক্ষ্মী। দুধ ও বাছুর সবই লাভ। গাভি যদি বাচ্চা ও দুধ না দেয়, তবুও লাভ। হঠাৎ করে গাভি বন্ধ্যা হয়ে গেলে কোরবানির ঈদে এই দামড়ি গরু বেশি দামে বিক্রি করা যায়। আমার ঘরে মোট ২২টি গাভি থাকলেও ষাড় রয়েছে মাত্র একটি’।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বয়স ৪৪ বছর পার হয়েছে। কোনো দিনই অন্যের ঘর থেকে দুধ কিনে খাইনি’।

পুরো মীরকাদিম জুড়েই গাভি পালনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। গাভিগুলো অতি যত্ন সহকারে পালা হয়, যেন কোনো ধরনের আঘাত না পায়। মশা-মাছি যেন কামড়াতে না পারে, সেজন্য মশারির ভেতরে রাখা হয়। গরম-ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা করতে বৈদ্যুতিক পাখা ও গরম কাপড় শরীরে জড়ানো হয়। রোদ-বৃষ্টি থেকেও গাভিগুলোকে দূরে রাখা হয়।

এসব কারণেই কোরবানির ঈদে মিরকাদিমের গরুর চাহিদা ব্যাপক। গাভি পালন করে এ পৌরসভার অনেকেই দারিদ্র্য দূর করেছেন।

মুন্সিগঞ্জ সদরের পঞ্চসার ও রিকাবি বাজারের প্রতিটি ঘরেও পালা হয় গাভি।

রিকাবি বাজারের সাধু মাতবর জানান, একটি গাভি থেকে স্বাবলম্বী হয়েছেন তিনি। ৮ বছর আগে ওই গাভিটি কিনেছিলেন। সেটি চারটি বাচ্চা দেয়। দু’টি বাচ্চাকে গত দুই কোরবানির ঈদে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। ওই দু’টির বাচ্চা রয়ে গেছে। এখন গাভিটির এক সন্তান বেহুলাও সন্তান সম্ভবা। অন্য সন্তান কালুকে রেখে দেওয়া হয়েছে ষাঁড় হিসেবে।দীপু মালাকার- ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমএভাবেই একটি গাভি থেকে সাধু মাতবরের গরুর সংখ্যা এখন ছয়টি।

প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ কেজি দুধও দেয় গাভিটি। প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার খাবার লাগে সেটির।

সাধু মাতবর আদর করে বয়স্ক এই গাভির নাম রেখেছেন মালা। তবে মালা একটু রাগী। অপরিচিত মানুষ দেখলে বড় শিং দিয়ে তাড়া করতে যায়। সব সময় ঘরে থাকে বলেই এমন খুনসুটি করে বলেও জানান সাধু মাতবর।

সাধু মাতবর বলেন, ‘ষাঁড় পালা বেপড়া, গাভি পালা পড়তা। গাভি প্রতিদিন ১০ কেজি দুধ দিলে ৪০০ টাকা বিকায় (বিক্রি)। ওর দুধ বিক্রি করে খাবারের দাম হয়, কিছুটা আমাদের পড়তা হয়। আমাদের জমি-জায়গা নেই, ঘরে ষাঁড় পালা মুশকিল। গাভির দুধ ও বাছুর সবই পড়তা’।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *