ভোটের হাওয়া: মুন্সীগঞ্জ-২: গ্রহণযোগ্য প্রার্থীর সন্ধানে দলগুলো

কাজী সাবি্বর আহমেদ দীপু: বিভেদ আছে, অনৈক্যও রয়েছে; তার পরও মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী) আসনে অতীতের তুলনায় বর্তমানে সাংগঠনিকভাবে অনেক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে আওয়ামী লীগ। গ্রহণযোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলে এ অবস্থান আরও মজবুত হবে। তাই ২০০৮ সালে হারানো এ আসন পুনরুদ্ধার করতে বিএনপিও গুরুত্ব দিচ্ছে সঠিক প্রার্থী মনোনয়নের ওপর। সব মিলিয়ে দুই দলের মধ্যে জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।

এ আসনে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করে চলেছেন সংগঠনের পাঁচজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা বর্তমান সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. লুৎফর রহমান, টঙ্গিবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট সোহানা তাহমিনা। এ নিয়ে অনৈক্য তীব্র ও প্রকাশ্য হয়ে উঠলে সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই আগামী নির্বাচনে প্রশ্নবিদ্ধ কোনো প্রার্থীকে মনোনয়ন না দিয়ে গ্রহণযোগ্য প্রার্থীকেই মনোনয়ন দিতে হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

অন্যদিকে দেশের জাতীয় রাজনীতি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের ছক তৈরি করছে বিএনপি। জনবিচ্ছিন্ন নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে এ দল। এরই অংশ হিসেবে গত ২২ জুলাই থেকে মুন্সীগঞ্জে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য নবায়ন ও সংগ্রহ অভিযান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে কোন্দল এড়িয়ে একক প্রার্থী নিশ্চিত করে আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোটযুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে তারা।

অভ্যন্তরীণ বিরোধ আওয়ামী লীগে :রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় ১৯৭৫-এর পট পরিবর্তনের পর ৩৩ বছর এ আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী হতে পারেনি। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এখানে মিজানুর রহমানকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। ২০১৪ সালেও নির্বাচিত হন তিনি।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্র জানায়, তিন দফায় এমপি হয়ে মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ীতে দলের একাধিক নেতার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করায় লৌহজংয়ে তার সঙ্গে প্রথমে জেলা সভাপতি ফকির মো. আবদুুল হামিদের সঙ্গে, পরে উপজেলা শাখার সহসভাপতি ওসমান গণি তালুকদারের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। টঙ্গিবাড়ীতেও তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. লুৎফর রহমান ও উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী ওয়াহিদের সঙ্গে অপ্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। অতীতের মতো আগামী নির্বাচনেও এ দুই নেতা মনোনয়ন চাইবেন। স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, মূলত এ নিয়েই তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. লুৎফর রহমান সমকালকে জানান, দলের ভাবমূর্তি যাতে ক্ষুণ্ন না হয় সে জন্যই তারা স্থানীয় এমপি ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলা শাখার আওয়ামী লীগ সভাপতির বিভিন্ন অনৈতিক কাজের বিরোধিতা করে থাকেন। প্রকাশ্যে এ নিয়ে কোনো কোন্দল নেই। তবে অপ্রকাশ্যে অনেকেই বর্তমান এমপিকে সমর্থন করেন না।

এ প্রসঙ্গে সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি এমপি সমকালকে বলেন, ‘আমি দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী হওয়ায় ও আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজ স্বার্থ হাসিল করতে কতিপয় নেতা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন।’

মনোয়ন প্রত্যাশী আ. লীগ নেতারা যা ভাবছেন : এরই মধ্যে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বর্তমান সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি উন্নয়নমূলক কার্যক্রম শুরু করেছেন। সমকালকে তিনি জানান, আগামী সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলের নৌকা প্রতীকের জন্য মনোনয়ন চাইবেন। এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও উন্নয়ন করায় জনগণ তার ওপর সন্তুষ্ট বলে মনে করেন তিনি। মনোনয়ন প্রত্যাশা করলেও দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা যাকে মনোনয়ন দেবেন, তার পক্ষেই কাজ করবেন বলে জানান তিনি।

অপর সম্ভাব্য প্রার্থী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নির্বাচন সামনে রেখে মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে শীতবস্ত্র, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, মুক্তিযুদ্ধের দলিলসহ বিভিন্ন বই বিতরণ করছেন এবং একাধিক মসজিদ উন্নয়নে এক থেকে দুই লাখ টাকা অনুদান দিচ্ছেন। একনিষ্ঠ সংগঠক হিসেবে বিভিন্ন কর্মতৎপরতা অব্যাহত রাখার কারণে উজ্জ্বল ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে তার। দেশের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখায় সারাদেশের পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকায়ও আলোচিত তিনি। এর মধ্যে লৌহজংয়ের তরুণ আনোয়ার হোসেন রাজীবের দুটি কিডনি নষ্ট হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পর তিনি গত ৪ জুলাই ঢাকার লালবাগ এলাকায় অসুস্থ রাজীবের বাসায় গিয়ে চিকিৎসার জন্য পাঁচ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। কবি ও লেখক শহীদুল ইসলাম জানিয়েছেন, তার এই ভূমিকা ‘মানুষ মানুষের জন্য’ পঙ্ক্তিটির যথার্থ উদাহরণ। তাই এলাকার মানুষ তার প্রশংসায় মুখরিত হয়ে উঠেছে। নৌকা প্রতীক নিয়ে আগামী নির্বাচনে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এমপি নির্বাচিত হলে মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে স্বচ্ছ রাজনীতির আবহ দেখা দেবে বলে মনে করছেন অনেকে। জাতীয় পার্টির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতার মতে, আওয়ামী লীগে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে সার্বজনীন সমর্থনে মাহবুবে আলম এগিয়ে আছেন।

এ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সমকালকে বলেন, ‘নির্বাচনী এলাকার জনগণের সেবা করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। তাই আগামী নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন চাইব। দলের সভানেত্রী মনোনয়ন দিলে জনগণের সেবা করে যাব।’

টঙ্গিবাড়ীতে দুই দফায় উপজেলা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকারী জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদও মনোনয়ন চাইবেন বলে সমকালকে জানান। একই আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. লুৎফর রহমান সমকালকে জানান, ১৯৯৬ সাল থেকে তিনি নেতাকর্মীদের গুছিয়ে রাখার কাজ করছেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য টঙ্গিবাড়ীর মো. শামছুল হকের ভাতিজি ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক সোহানা তাহমিনা জানান, দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড শক্তিশালী ও উন্নয়ন করার লক্ষ্যে তিনিও মনোনয়ন চাইবেন।

বিএনপির নির্বাচনী প্রস্তুতি : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির মিজানুর রহমান সিনহা জয়ী হওয়ার পর নিষ্ঠাবান নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করায় দলে তার নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং দলটিও দুর্বল হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ২০০৮ সালে তারা এ আসন হারায়। এ অবস্থায় আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চাইলে বিএনপিকে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে একক প্রার্থী দিতে হবে এবং জনমতও পক্ষে নিতে হবে।

আগামী নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহা, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুুস সালাম আজাদ ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী এম শামছুল ইসলামের বড় ছেলে প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বাবু। এদের মধ্যে সাবেক সাংসদ মিজানুর রহমান সিনহা এ আসনে বিএনপির একক প্রার্থী- এমনটাই মনে করছেন নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে ও হারানো আসন ফিরে পেতে চাইলে তার বিকল্প নেই।

মিজানুর রহমান সিনহা দলের মনোনয়ন চাইবেন জানিয়ে সমকালকে বলেন, ‘তবে দলের হাইকমান্ড অন্য আসনে মনোনয়ন দিলে, সেখানেও নির্বাচন করব।’

অন্যান্য দলের প্রস্তুতি : এ ছাড়াও মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে প্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশা করছেন জাতীয় পার্টির (এরশাদ) মুন্সীগঞ্জ জেলা সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও কেন্দ্রীয় কমিটির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক মো. নোমান মিয়া।

এ ছাড়া বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখনও তাদের কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি।

সমকাল