পদ্মা-মেঘনার ভাঙন: তিন উপজেলায় ১৫০ বসতবাড়ি বিলীন

কাজী সাবি্বর আহমেদ দীপু: এক সপ্তাহের ব্যবধানে মুন্সীগঞ্জের তিনটি উপজেলায় পদ্মা ও মেঘনার ভাঙনে দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ীতে পদ্মার ভাঙনে ১১০ বসতবাড়ি ও মেঘনার ভাঙনে গজারিয়ার অর্ধশতাধিক ঘরবাড়িসহ বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এ অবস্থায় ভাঙন আতঙ্কে নদীতীরবর্তী শতাধিক ঘরবাড়ি ভেঙে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাসী। বর্তমানে তিনটি উপজেলায় স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙনের মুখে রয়েছে। যে কোনো সময় এসব স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে যাবে বলে গ্রামবাসী জানিয়েছে। পদ্মা ও মেঘনায় পানি বৃদ্ধির ফলে প্রচণ্ড ঘূর্ণায়মান স্রোতের সঙ্গে বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টঙ্গিবাড়ী উপজেলার কামারখাড়া ইউনিয়নের বড়াইল, চৌসার, বাগবাড়ি ও জুসিষার গ্রামের ৬০টি বসতবাড়ি এক সপ্তাহের ব্যবধানে পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। নদীতীরবর্তী হাসাইল-বানারী ও পাঁচগাঁও ইউনিয়নের অনেক গ্রামে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত চৌসার গ্রামের হাসান মিয়া জানান, চলতি মৌসুম নিয়ে এ পর্যন্ত চার দফা পদ্মার ভাঙনের কবলে পড়েন তারা। ভাঙন থেকে বাঁচতে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের মতো বড়াইল গ্রামের সাত শতাধিক নদীতীরবর্তী মানুষ নিরাপদ স্থানে চলে গেছে।

কামারখাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন হালদার জানান, পদ্মাতীরবর্তী পাঁচটি গ্রামে ভাঙন চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত ৬০টি পরিবারের তালিকা উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। টঙ্গিবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সহিদুল হক পাটোয়ারি জানান, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

টঙ্গিবাড়ীর মতো একই অবস্থা বিরাজ করছে লৌহজংয়ের গাঁওদিয়া, কুমারভোগ ইউপির শিমুলিয়া বাজার, খড়িয়া গ্রাম, মেদিনীমণ্ডল ইউনিয়নের কান্দিপাড়া যশলদিয়া গ্রাম, মাওয়া পুরাতন ফেরিঘাটসহ পদ্মাতীরবর্তী গ্রামগুলোতে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। এখনও ভাঙন অব্যাহত থাকায় নদীতীরবর্তী একাধিক পরিবার তাদের বসতবাড়ি ভেঙে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছে। পদ্মার ভাঙন অব্যাহত থাকায় বর্তমানে লৌহজং উপজেলার ছয়টি গ্রামের দুটি বাজার, একাধিক মসজিদ, মাদ্রাসা, বিদ্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙনের কবলে রয়েছে। এমনকি লৌহজং-বেজগাঁও-গাঁওদিয়া বেরিবাঁধটি পদ্মার স্রোতের তীব্রতায় যে কোনো সময় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করছে গ্রামবাসী।

ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, চলতি মাসের শুরু থেকে ভাঙন দেখা দেওয়ার পর স্থানীয় এমপি, প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে গেলেও এখনও ভাঙন প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। লৌহজংয়ের ইউএনও মো. মনির হোসেন জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণের টাকা এবং চাল বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গাঁওদিয়া এলাকায় বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নিচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আউয়াল মিয়া জানান, ভাঙন প্রতিরোধে তিন কোটি টাকার বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। বর্তমানে পদ্মায় প্রচণ্ড স্রোত থাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা মুহূর্তেই পদ্মার তলদেশে হারিয়ে যাবে। তাই ভাঙন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

গজারিয়া উপজেলার হোসেন্দী ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৪০ থেকে ৪৫টি ঘরবাড়িসহ বিস্তীর্ণ ফসলি জমি মেঘনায় বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে ইস্মানিরচর, নয়ানগর, গায়ালগাঁও, হোসেন্দী ও চরবলাকী গ্রামে চলছে মেঘনার ভাঙন তাণ্ডব। তাই ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী নিজ উদ্যোগে বালুর বস্তা ফেলে, বাঁশের খুঁটি দিয়ে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভাঙনের মুখে রয়েছে পাঁচটি গ্রামের স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা এবং বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।

গজারিয়া উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, হোসেন্দী ইউনিয়নের মেঘনাতীরবর্তী গ্রামগুলোতে ভাঙন শুরু হওয়ার খবর পেয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে।

সমকাল