ইতিহাস: রূপ হারানো রূপলাল হাউস দখলদারদের কবলে

বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা পুরান ঢাকার রূপলাল হাউস ক্রমেই জৌলুস হারাচ্ছে। ফরাশগঞ্জের বিশাল এই দ্বিতল ভবনের সিংহভাগই এখন অবৈধ দখলে চলে গেছে। ভবনের নিচতলার পুরোটাই দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন আড়ত্দার। ভবন দখল করে তারা গড়ে তুলেছেন একাধিক হলুদ, মরিচ, আলু, পিঁয়াজের আড়ত্। এই ভবনটি রক্ষায় এগিয়ে আসেনি কেউ। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ একটি সাইনবোর্ড লাগিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেছেন। ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে পুরো ভবনটি। দীর্ঘ দিনেও কেউ এটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়নি।

ঢাকা কেন্দ্রের পরিচালক মোঃ আজিম বখশ বলেন, রূপলাল হাউস ইতিহাসের একটি বিরাট অংশ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এই ভবনটি রক্ষায় কেউই এগিয়ে আসছে না। তিনি ভবনটি রক্ষায় সরকারসহ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, রূপলাল হাউসটি মূলত মোগল আমলের একটি কীর্তি। ১৭৫৭ সালে পলাশীতে ইংরেজদের উত্থান পরবর্তী অধ্যায় হচ্ছে ইংরেজ আর হিন্দু জমিদার ব্যবসায়ীদের অসম্ভব রকম দাপটে ঢাকা শাসন করার যুগ। ১৯৪৭ সালে অবশ্য সে ধারায় ছন্দপতন ঘটে। ইংরেজ-হিন্দুর সেই দাপট কমে আসে। উত্থান ঘটে ভারত থেকে আসা অভিবাসিত মুসলমান আর বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) এর মুসলমানদের। শুরু হয় নতুন পর্ব। সে পর্বেরও পালাবদল হয় ১৯৭১ সালে। ঢাকা এখন একটি কসমোপলিটন সিটি।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের পদভারে মুখরিত। কিন্তু এই ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে রাষ্ট্র যন্ত্রও প্রভাবিত হয়েছে। ইতিহাসের অনেক সাক্ষী তারা সুরক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। দখল দূষণ হয়েছে। রাষ্ট্র কখনও অসহায় হিসেবে চেয়ে চেয়ে দেখেছে, আর না হয় সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। পুরানো ঢাকার বড়কাটরা, ছোটকাটরা এখন ভগ্নপ্রায় অনেক প্রাচীন স্থাপনা আজ নিশ্চিহ্ন। এই ধারায় ঢাকার ফরাশগঞ্জে বুড়িগঙ্গার কূলে কালের সাক্ষী রূপলাল হাউসও ক্ষয়িষ্ণু প্রায়। ইংরেজ আমলে এই প্রাসাদ ছিল ঢাকার এক গণ্যমাণ্য ব্যক্তি রূপলাল সাহার বাড়ি। এখানে বাংলাদেশ শাসনের অনেক শলাপরামর্শ হয়েছে। ইংরেজ শাসকরা সেখানে শরাব গিলেছে, বল ডান্সও হয়েছে। সে সময় এক ভিন্ন রকম দাপট ছিল। কিন্তু তা স্থায়ী থাকেনি। ক্ষয়ে ক্ষয়ে এখন সেটি মসলা ব্যবসায়ীদের আড়ত।

বর্তমানে বিজিবির কয়েক সদস্য সেখানে সপরিবার বাস করতে দিয়ে তার অস্তিত্ব রক্ষার শেষ চেষ্টা করছেন বর্তমান সরকার। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের এই স্পট নিয়ে পরিকল্পনা নেই, নেই জাদুঘর কর্তৃপক্ষের বা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরেরও, ফলে বিদেশি পর্যটক নেই, তাই এটিকে পর্যটন স্পট করার কোনো পরিকল্পনাও নেই। কেবল পিঁয়াজ, রসুন আর মরিচের ঝাঁজ। হয়তো অস্তিতের জন্য স্থানীয় মানুষের কাছেও এটিই বেশ লাভজনক। ইমারতটি এখন বহু মানুষের বসতি। আর সামনের বাগান বাড়ি সাহা আর মিয়াদের বড় বড় আড়ত্, আর বাকল্যান্ড, সে তো বিশাল এক কাঁচা বাজার।

ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ১৮২৫ সালে আর্মেনিয়া থেকে আগত এক জমিদার আরাতুন এই ভবনটি নির্মাণ করেন। এর দশ বছর পর, ১৮৩৫ সালে হিন্দু ব্যবসায়ী রূপলাল দাস এবং রঘুনাথ দাস এটি আরাতুনের নিকট থেকে ক্রয় করেন। রূপলাল ব্যবসায়ী ছিলেন ছিলেন শিক্ষিত এবং সংগীত অনুরাগীও। আয়ের এক বড় অংশ তিনি গানের পিছে ব্যয় করতেন। ১৮৮৭ সালে ইংরেজ লর্ড ডাফরিন ঢাকায় এলে এই প্রাসাদে থাকেন এবং তার সম্মানে সেখানে বল ডান্সের আয়োজন করা হয়। বিদেশি পর্যটকরা এলে রাত কাটতো এই প্রাসাদে। তখন একটি কক্ষ ২০০ টাকায় ভাড়া দেওয়া হত বলে জনশ্রুতি আছে। ১৯৩০ সালের দিকে এটি ব্যবসায় কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হতে থাকে, রূপলাল হাউসের ভিতরে থাকা রঘুবাবুর বাগান আর শ্যামবাজার পুল বিবর্তিত হয়ে শ্যামবাজার এ পরিণত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর দাস পরিবারের ভারত প্রস্থানের পর এর সাবেকি জৌলুস চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে ঘোষিত হয়। এদিকে ১৯৫৮ সালে এই প্রাসাদে গড়ে উঠে আগা খান প্রিপারেটরি স্কুল। ১৯৭৩ সালে এটিকে কলেজে রূপান্তর করা হলেও তা বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে ১৯৭৬ সালে এটিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সম্পত্তি বলে ঘোষণা করা হয়।

এদিকে ১৯৭১ সালে সিদ্দীক জামাল রঘুনাথ সাহার অংশটি দখল নেন বলে জানা যায়। ১৯৭৩ সালে সিদ্দিক জামালের পুত্র দাউদ জামাল ভারতে চলে গেলে অদ্যাবধি সেই অংশ জনৈকা নুরজাহান ভোগ দখল করছেন।

মোহাম্মদ আবু তালেব
ইত্তেফাক