পদ্মা সেতু ফুটতে আর মাত্র দুই মাস

একসঙ্গে স্প্যান বসবে ৫টি ♦ সংযোগ সড়ক, টোল প্লাজা প্রস্তুত
যত দূর চোখ যায় শুধু ঢেউয়ের উন্মাদনা। ঢেউ নাচছে, দুলছে। মূল নদী, মধ্য নদী, মাস কয়েক আগেও যেখানে চর ছিল—সর্বত্রই বয়ে চলেছে স্রোতের ধারা। কোথাও ভাঙছে নদীর পাড়। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী পদ্মার এই উথাল-পাথালের মধ্যেই চলছে আরেক কর্মযজ্ঞ—পদ্মা সেতুর অবকাঠামো তৈরির লড়াই। ঢেউতোলা নৌযানগুলোর প্রতিকূলতা পাশ কাটিয়েই জাজিরায় চলছে পাইল ড্রাইভ, মাওয়া পারে ট্রাস ফেব্রিকেশন ইয়ার্ডে চলছে স্টিলের কাঠামো স্প্যান জোড়া দেওয়ার অবিরাম কাজ। পিলারের ওপরে গাড়ি চলাচলের জন্য বসানো হবে স্প্যানগুলো। রোদ, বৃষ্টি, ঢেউ—সব কিছুর সঙ্গে যুদ্ধ করে দেশি-বিদেশি শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন পদ্মা সেতু নির্মাণের মহাযজ্ঞ। এরই মধ্যে মাওয়া ও জাজিরায় চার লেনের সংযোগ সড়ক, সার্ভিস এরিয়াসহ আনুষঙ্গিক সব কাজ শেষ হয়েছে। সেতু বিভাগের অধীনে প্রকল্পের কাজ চলছে।

গত রবিবার ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে প্রকল্প এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে সেতু নির্মাণের নানামুখী তৎপরতা। মাওয়ায় এরই মধ্যে চার লেনের সংযোগ সড়ক ও টোল প্লাজার কাজ শেষ হয়ে গেছে। জাজিরায়ও শেষ হয়েছে চার লেনের সংযোগ সড়কের কাজ, টোল প্লাজা নির্মাণও প্রায় শেষ। মাওয়ার চৌরাস্তা থেকে দক্ষিণে প্রায় দুই কিলোমিটার বিস্তৃত প্রকল্প এলাকার ট্রাস ফেব্রিকেশন ইয়ার্ডে চলছে প্রায় তিন হাজার টনের একেকটি স্প্যান তৈরির কাজ।

আনুষঙ্গিক সব কাজ শেষ হয়ে এলেও বড় কাজ হলো নদীর ওপর পিলার বসানোর কাজ। সব মিলে পিলার বসবে ৪২টি। মাওয়া প্রান্তে ২১টি ও জাজিরা প্রান্তে ২১টি। এসব পিলারের ওপর বসানো হবে স্প্যান। স্প্যান হচ্ছে দুটি পিলারের ওপর বসানো স্টিলের কাঠামো। স্প্যানের ওপর ঢালাই দিয়ে গাড়ি চলার জন্য মসৃণ করা হবে। প্রকৌশলীরা জানান, ৪২টি পিলারের মধ্যে এখন কাজ চলছে ১৬টির। পিলার বসবে পাইলের ওপর এবং মোট পাইল ২৪০টি। এর মধ্যে ২৮টি পাইলের কাজ পুরোপুরি এবং ৫৭টির কাজ অর্ধেক হয়েছে।

নির্মাণাধীন পিলারগুলোর ওপর প্রথম দফায় কমপক্ষে পাঁচটি স্প্যান (স্টিলের কাঠামো) আগামী দুই মাসের মধ্যে বসানোর প্রস্তুতি চলছে। বসানো হবে জাজিরা প্রান্তে। তখন থেকেই মূল সেতুর অবকাঠামো দৃশ্যমান হতে শুরু করবে। প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান আবদুল কাদের সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, মূল সেতুর কাজ এগিয়েছে ৪৪ শতাংশ। পুরো প্রকল্পের কাজের অগ্রগতিও গড়ে ৪৪ শতাংশ।

এযাবৎ চীন থেকে আটটি স্প্যানের ‘মেম্বার’ ও ‘জয়েন্ট’ মাওয়ায় এসেছে জানিয়ে দেওয়ান আবদুল কাদের বলেন, ছয়টি স্প্যান এরই মধ্যে তৈরি করা হয়েছে। আরো দুটি স্প্যান তৈরি হচ্ছে। চীন থেকে আরো ২০টি স্প্যানের ‘মেম্বার’ ও ‘জয়েন্ট’ আসছে। এ মাসের শেষের দিকে এগুলোর একটি চালান মাওয়ায় আসবে নৌপথে। গত মাসেও এসেছে চালান। তিনি বলেন, ‘যেহেতু জাজিরায় স্প্যান বসানো শুরু হবে—এ লক্ষ্য অনুসারে খুঁটি উঠে গেছে। খুঁটিগুলোর ওপরের কাজ শেষ হয়নি। দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে স্প্যান বসানো শুরু হবে বলে আশা করছি। ’

প্রকল্প কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা গেছে, জাজিরা প্রান্তে ৩৭ নম্বর থেকে শুরু হবে স্প্যান বসানো। তা একে একে পাতা হবে ৪২ নম্বর পিলার পর্যন্ত। জাজিরায় ৩৭ নম্বর পিলারের নিচে রড বেঁধে ক্যাপ লাগানো শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছে কংক্রিট ফেলা। ৩৮ নম্বর পিলারে ক্যাপ লাগানোর কাজও শুরু হয়েছে। ৩৭ থেকে ৪২ নম্বর পিলার পর্যন্ত একে একে ক্যাপ লাগানো শেষ হলে এসব পিলারে বসানো শুরু হবে স্প্যান।

গত রবিবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, মাওয়ার ট্রাস ফেব্রিকেশন ইয়ার্ডে চলছে স্প্যান জোড়া লাগানো ও রং করার কাজ। তত্ত্বাবধানকারীদের একজন মো. রনি কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশি ও বিদেশি কমপক্ষে ১০০ শ্রমিক স্প্যান জোড়া লাগানোসহ অন্যান্য কাজ করছে। দেখা গেল, প্লাস্টিকের হলুদরঙা নিরাপত্তা টুপি মাথায় পরে একজন চীনা শ্রমিক ওপরে বসানো একটি স্প্যানের বিভিন্ন অংশ পরিষ্কার করছেন।

মাওয়া চৌরাস্তা থেকে ইটের ভাঙা রাস্তা ধরে পদ্মা নদীর পারে পাঁচটি বিভিন্ন ধরনের ইয়ার্ড ও প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যালয় আছে। নদীর পার থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটারের মধ্যে ট্রাস ফেব্রিকেশন ইয়ার্ড। তাতে ঢুকে দেখা গেল, স্প্যানগুলো জোড়া লাগিয়ে রাখা হয়েছে ওপরে, একের পর এক সাজিয়ে। আরো একটি স্প্যান জোড়া লাগানোর কাজ চলছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কোরিয়ার বিশেষজ্ঞদল এসে এসব স্প্যানের আকার, জোড়া লাগানোসহ বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করে দেখবে। এখন সামান্য ত্রুটি ধরা পড়লেও আবার কাজ করতে হচ্ছে।

প্রকল্প কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা যায়, গত বছর আগস্টের প্রথম সপ্তাহে স্প্যানের ‘মেম্বার’ (মূল কাঠামো) ও ‘জয়েন্ট’ (সংযোজক) চীনের সিংহোয়াংদাওয়ের কারখানা থেকে প্রকল্প এলাকায় আসতে থাকে। মোংলা বন্দর থেকে বার্জে করে চাঁদপুর হয়ে প্রকল্প এলাকায় আনা হয় এগুলো। ‘মেম্বার’ ও ‘জয়েন্ট’ জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা হচ্ছে স্প্যান। মূল সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আবদুল কাদের আরো জানান, প্রতিটি স্প্যান ১৫০ মিটার দীর্ঘ। স্প্যানগুলোর ওপর কংক্রিটের সমতলের সড়কের ওপর চলবে যানবাহন। প্রকল্প এলাকায় স্থাপিত পরীক্ষাগারে ওজন সক্ষমতাসহ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা শেষে স্প্যানগুলো বসানো হবে। প্রতিটি স্প্যানের গড় ওজন দুই হাজার ৯০০ টন।

অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার যেন একটু তাড়াতাড়িই বর্ষা এসে গেছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞদলের একাধিক সদস্য জানান, বিশ্বের অন্যতম খরস্রোতা নদী এই পদ্মা। তার মধ্যে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া থেকে শরীয়তপুরের জাজিরার মধ্যে ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার সেতু প্রকল্প অংশে পদ্মা যেন আরো বেশি উন্মত্ত। গত ৩০ জুনের মধ্যে স্প্যান বসানোর পরিকল্পনা ছিল। তবে তীব্র স্রোতের কারণে খুঁটি বসানোর কাজ শেষ না হওয়ায় বিলম্ব হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী আগস্টের মধ্যে স্প্যান বসানো সম্ভব হতে পারে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রকৌশলীরা জানান, নদীর তলদেশে মাটির স্তরের গঠন নিয়ে জটিলতা তো আছেই, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বর্ষায় নদীর প্রবল স্রোত। এ কারণে প্রতিকূলতা বেশি। এসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে মূল সেতুর পাইলিংয়ের কাজ চলছে। জাজিরা অংশে সব পিলারের পাইলিংয়ের মাটি পরীক্ষার কাজ শেষ হয়ে গেছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, মাওয়া সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হয়েছে শতভাগ। জাজিরা সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হয়েছে ৯৯ শতাংশ। নদীশাসনের কাজ শেষ হয়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। জাজিরা সার্ভিস এরিয়া কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী (সংযোগ সড়ক) সৈয়দ রজব আলী জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ রয়েছে মাওয়া ও জাজিরায় দুটি থানা স্থাপনের। এ জন্য ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। জাজিরায় ভবন নির্মাণের অগ্রগতি ২০ শতাংশ ও মাওয়ায় ১৭ শতাংশ। জাজিরায় চার লেনের সংযোগ সড়ক ও টোল প্লাজা নির্মাণের কাজ শেষ হয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদল আসছে : আমাদের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি মো. মাসুদ খান জানান, শিগগিরই মাওয়া প্রান্তে পুরোদমে পাইলিংয়ের কাজ শুরু হবে। বিশ্বের সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি হ্যামার যোগ হওয়ায় কাজে গতি বাড়ছে। শুরু থেকেই নদীর মাওয়ায় মাটির তলদেশের গঠন বৈচিত্র্যের কারণে দৈর্ঘ্য নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। মাওয়ায় ৬ ও ৭ নম্বর পিলারের কাজ ধরা হলেও পরে তা অর্ধসমাপ্ত রেখেই কাজ সরিয়ে নেওয়া হয় জাজিরায়। এ কারণে ১৪টি পিলারের চূড়ান্ত ডিজাইন বাকি রয়েছে। এ ডিজাইন চূড়ান্ত করতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদল আসছে আগামী ১৭ জুলাই।

কালের কন্ঠ