আ’লীগের বিবাদ কাজে লাগাতে চায় বিএনপি

ভোটের হাওয়া- মুন্সীগঞ্জ-৩
কাজী সাবি্বর আহমেদ দীপু: আওয়ামী লীগে গৃহদাহ না নিভলে মুন্সীগঞ্জ-৩ (সদর ও গজারিয়া) আসনে বিএনপিকে ঠেকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। এমন বিশ্লেষণ কম-বেশি সবার।

এ আসনে নৌকা প্রতীকের জন্য লড়ছেন আওয়ামী লীগের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী। এ জন্য তারা কেন্দ্রীয়ভাবে তদবির করছেন, স্থানীয়ভাবে নেতাকর্মীদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন। বর্তমান ও সাবেক এমপিসহ চার নেতা মনোনয়ন দৌড়ে থাকায় তাদের সমর্থিত নেতাকর্মীরা আলাদাভাবে প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছেন। সঙ্গে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিবাদও অব্যাহত রয়েছে। বহুধা বিভক্ত স্থানীয় নেতাকর্মীরা কখনও কখনও নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়িও করছেন। এমন পরিস্থিতিতে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনটি আবারও দখলে রাখতে হলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনের পাশাপাশি যোগ্য প্রার্থী মনোনয়নের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

বিএনপি অবশ্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দ্বন্দ্ব-বিবাদকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পেরোনোর পরিকল্পনা করছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অবস্থান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তারা। নিশ্চুপ অবস্থানে থেকে নির্বাচনের কৌশল তৈরি করছে। আসনটি পুনরুদ্ধারের জন্য যোগ্য প্রার্থী মনোনয়নের কথা ভাবছে। এ আসনে বিএনপিরও সাংগঠনিক ভিত বেশ শক্তিশালী।

১৯৭৩ সালে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সামছুল হক। ১৯৭৯ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির আবদুল হাই। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির নুর মোহাম্মদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন বিএনপির আবদুল হাই। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এম ইদ্রিস আলী এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস নির্বাচিত হন।

এ অবস্থায় বিএনপি আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে এ আসনটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল হাই বিএনপির প্রার্থী হতে পারেন বলে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে। তবে পরিস্থিতির বিবেচনায় নতুন মুখও আসতে পারে বলে নেতাকর্মীদের বিশ্বাস। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিভেদ সৃষ্টি না হলে এ আসনে বিএনপির প্রার্থীই কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন বলে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন।

এই বিষয়টি চিন্তা-ভাবনায় রেখে এগোচ্ছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। তারাও গৃহদাহ ভুলে গিয়ে একক প্রার্থী বাছাইয়ের চেষ্টা করছে। অবশ্য দলের চার নেতা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমে রয়েছেন। তারা হলেন_ বর্তমান সংসদ সদস্য দলের কেন্দ্রীয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, সাবেক সংসদ সদস্য এম ইদ্রিস আলী, জেলার সহ-সভাপতি আনিছুজ্জামান আনিছ ও সাধারণ সম্পাদক শেখ মোহাম্মদ লুৎফর রহমান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস বলেন, নির্বাচনী এলাকার তৃণমূল নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনগণের কাছে তিনিই যোগ্য প্রার্থী। তাই তিনি আবারও দলের মনোনয়ন চাইবেন। এখন তিনি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নির্বাচনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে দলের নেতাকর্মীদের একটি অংশের মতে, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিনসহ স্থানীয় নেতৃত্বের একটি অংশের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে মৃণাল কান্তি দাসের। ফলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা আলোচিত দুই নেতার গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দলীয় কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে মৃণাল কান্তি দাস বলেছেন, আওয়ামী লীগ একটি বড় রাজনৈতিক দল। তাই নেতায় নেতায় মতভেদ থাকতেই পারে। তবে বৃহত্তর স্বার্থের বেলায় নেতাকর্মীরা সব সময়ই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যান। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই মতভেদও থাকবে না।

এদিকে বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির মধ্যকার বিরোধের সুযোগে সাবেক সংসদ সদস্য এম ইদ্রিস আলী স্থানীয় আওয়ামী লীগ ঘরানার রাজনীতিতে হঠাৎ করেই সরব হয়েছেন বলে অনেকে মনে করছেন। তিনি দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটিয়ে চমক দেখাতে চাইছেন। তাকে ঘিরে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে এম ইদ্রিস আলী বলেছেন, নেতাকর্মী ও জনগণের চাহিদার বিষয়টি চিন্তা-ভাবনায় রেখেই তিনি দলের মনোনয়ন চাইবেন।

আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী আনিছুজ্জামান আনিছ দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। দুই দফায় সদর উপজেলা চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকায় তৃণমূল পর্যায়ে তার যোগাযোগও রয়েছে। তিনি বলেছেন, মাঠ পর্যায়ে প্রস্তুতি আছে। এখন দলের মনোনয়ন চাইবেন। শেখ মোহাম্মদ লুৎফর রহমান জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির আস্থাভাজন। তিনি বলেছেন, বর্তমান সংসদ সদস্যের সঙ্গে মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের বিরোধ থাকায় এই দুই নেতার একজন মনোনয়ন পেলে আরেকজন বিরোধিতা করবেন। এ কারণই নেতাকর্মীরা এ আসনে নতুন একজনকে দলের প্রার্থী হিসেবে চাইছেন। তাই তিনি দলের মনোনয়ন চাইবেন।

মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে কারোরই প্রকাশ্যে কোনো তৎপরতা নেই। তবে তৃণমূলের পছন্দের প্রার্থী জেলা বিএনপি সভাপতি আবদুল হাই দলের প্রার্থী হবেন বলে মনে করছেন মুন্সীগঞ্জ শহর বিএনপি সভাপতি ইরাদত হোসেন মানু। আবদুল হাই জানিয়েছেন, তিনি দলের মনোনয়ন চাইবেন। সাবেক তথ্যমন্ত্রী এম শামছুল ইসলামের ছেলে সাইফুল ইসলাম বাবুও এ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে জানা গেছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন জানিয়েছেন, মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে দলের একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।

জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল বাতেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুজ্জামান দিদার দলের মনোনয়ন চাইবেন। তবে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি কুতুব উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, শেষতক আবদুল বাতেনই হবেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী। এ লক্ষ্যে তিনি নানা প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ডও চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশর কমিউনিস্ট পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকেও কয়েকজন প্রার্থী হতে পাবেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

সমকাল