ত্রিশ বছর ধরে বাবা-মাকে খুঁজছেন হারিয়ে যাওয়া ‘বাদল’

নিজের গ্রামের বাড়ি, পরিচয় জানতে চাইলে কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন ঢাকার রমনা পার্ক ওভারব্রিজ এলাকায় লেবুর শরবত বিক্রেতা মো. বাদল। এর কিছুক্ষণ পর ছলছল করে উঠল তার চোখজোড়া। এই ছলছল চোখের বহিঃপ্রকাশ ঘটল কিছুটা চাপাস্বরে এক কান্নায়। এরপর চোখ গড়িয়ে কয়েকফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে এই পাথরের এই শহরটার মাটিতে। বাদল জানালেন, তার বাবা-মায়ের নাম জানা নেই। জানেন না তার গ্রামের নাম কী? সে ত্রিশ বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল। এখনো সে তার বাবা-মাকে খুঁজছেন।

৩৬ বছর বয়সী বাদল এখনো আশাবাদী, সে তার বাবা-মাকে খুঁজে পাবে। বাদলের ভাষায়- ‘যদি বাবা-মাকে খুঁজে পাই তাহলে স্বর্গ পাবো। খুব কষ্ট লাগে, কেউ জানতে চাইলে বলতে পারি না বাবার নাম-মায়ের নাম। বলতে পারি না গ্রাম কোথায়?’

যখন ৬ বছর বয়স তখনই বিপর্যয় নেমে আসে বাদলের জীবনে। কেবল স্মৃতির খ-াংশ মনে আছে তার। বাদল বলেন, ‘আমার বাবা ঢাকা কিংবা নারায়ণগঞ্জ চাকরি করতেন। বাবা চিঠি লিখে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। হঠাৎ বাবা চিঠি লেখা বন্ধ করে দেন, মা চিন্তায় পড়ে গেলেন। মা চাইলেন বাবার ঠিকানায় আসতে। আমার মা আমাকে ও এক ছোট বোনকে নিয়ে সন্ধ্যা বেলা লঞ্চে ওঠেন। দেড় দিন পর মা লঞ্চ থেকে মুন্সীগঞ্জ নামেন। তারপর নারায়ণগঞ্জ আসি।’

‘নারায়ণগঞ্জে আমার ফুফু কিংবা খালার বাসায় ছিলাম। ওই বাসার ওঠার পরদিন আমার ওই খালা বলেন, ‘মোড়ের দোকানে তোর খালু বসে আসে। বাসায় ডেকে নিয়ে আসতে পারবি?’ আমি বলি, ‘পারব।’ এরপর বাসা থেকে বেরিয়ে প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা হাঁটতে থাকি। পথ খুঁজে পাই না, যে বাসাতে ছিলাম সেই বাসাও আর খুঁেজ পাই না। এক সময় দুপুর গড়িয়ে আসে। আমি কান্না শুরু করি। ইসরাইল নামে এক লোক তার বাসায় নিয়ে যান।’

‘যারা আমাকে উদ্ধার করেন তারা বেশ বড়লোক। পাঁচতলা বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। তারা পুরো শহরে মাইকিংও করেছে। কিন্তু মায়ের সন্ধান পাননি।’

‘বাদল’ বলেন, সবসময় কান্না করতাম। তারা আমার নাম জানতে চেয়েছিল। আমার নাম কী ছিল সেটাও ওই সময় বলতে পারিনি। মায়ের জন্য খারাপ লাগত। যারা উদ্ধার করেন, তারা আমার নাম রাখেন মালু। কিন্তু বুদ্ধি হওয়ার পর বুঝতে পারলাম এই নামটা আমার পছন্দ না। নিজেই নিজের নাম দিলাম। নাম দিলাম ‘বাদল।’ এখন আমি বাদল নামেই পরিচিত।

যারা আপনাকে উদ্ধার করল তাদের বাসায়ই থাকতে পারতেন, জানালে বাদল বলেন, ‘আমার কেবল মনে হতো লঞ্চে গেলে মা-বোনকে দেখতে পারব। একটু বুদ্ধি হওয়ার পর লঞ্চে ওঠা শুরু করি। এছাড়া যারা আমাকে উদ্ধার করেছিল তারাও অনেক আদর করত। কিন্তু মনে হতো এরা আমার আপন কেউ না, কেবল করুণা করে আশ্রয় দিয়েছে। আমি বাসার বাইরে বেরিয়ে যেতাম। সদরঘাট, নয়াবাজার, সোয়ারিঘাট, কমলাপুর ঘুরে বেড়াতাম কাঙালি অবস্থায়। মাঝে মধ্যে সদরঘাট থেকে লঞ্চে উঠে পড়তাম। বুদ্ধি হওয়ার পর বুঝতে পারি, মা আমাকে নিয়ে মুন্সীগঞ্জ লঞ্চ স্টেশনে নেমেছিলেন।’

‘একসময় লঞ্চে ওঠা নেশা হয়ে গেল। লঞ্চে ঘুমাইতাম। লঞ্চের মানুষের কাছ থেকে খাবার চেয়ে খেতাম। কেউ টাকা দিত, কেউ খাবার দিত। নারায়ণগঞ্জের সেই বাড়িতে আর ফিরে যাইনি। কারণ আমি তো এতিম। ওরা আমার রক্তের কেউ না। ঘুরতে ঘুরতে বরগুনায় গেছি। বরগুনা শহরটা আমার কেমন যেন পরিচিত লাগে। মনে হলো, এই শহরটা আমি আগেও দেখেছি। বরগুনা স্টেশনের পাশে একটা খাল, সেখানে একটা কাঠের পুল ছিল। এই পুলটা দেখার পর মাথার ভেতর কেমন যেন চক্কর দিয়ে ওঠে। আমার কেন যেন মনে হয়েছে, এই পুলে আমার ভাইকে নিয়ে খেলা করেছি।’

বাদল বলেন, ‘আমার এক বড় ভাই ছিল। কলেজে পড়ত। ভাই সাগরে মাছ ধরতে যেত। সাগর দেখার পর ভাইয়ের কথা মনে পড়েছে। কিন্তু আমি তো ভাইয়ের নাম জানি না, গ্রামের নাম জানি না। মা-বাবা কারো নামই জানি না। বরগুনায় গিয়ে নানা লোকের কাছে খোঁজ করেছি। কিন্তু আপনজন কারোরই সন্ধান পাইনি।’
‘আমি নিশ্চিত আমার বাড়ি বরগুনায়। কারণ শহর পরিচিত লাগে, ভাই সাগরে মাছ ধরতে যেত, আর সেই কাঠের পুলে খেলা করতাম। শহর কিংবা শহরের আশেপাশের গ্রামে আমার বাড়ি।’

বাদল জানান, লঞ্চে লঞ্চে ঘুরছি। বরিশাল গিয়েছি, পটুয়াখালী গিয়েছি, বরগুনায় গিয়েছি। মনে হতো লঞ্চে আমার মা বসে আছেন। আমার বোন বসে আছেন। মনে হতো, লঞ্চে গেলেই তাদের দেখা পাবো। লঞ্চে ওঠার পাশাপাশি ভাঙারি টুকাতাম, পলিথিন কিনে দোকানে দোকানে বিক্রি করতাম। এভাবেই রাস্তায় রাস্তায় বড় হয়েছি। কেটে গেছে ৩০ বছর।’

এরইমধ্যে বাদল বিয়েও করেছেন। স্ত্রী মালার সঙ্গে পরিচয় রাস্তাতেই। সেও ভাঙারি কুড়ানি মেয়ে। এখন এই দম্পতির ঘরে তিন সন্তান। বাদল ও মালা বাসা নিয়েছেন মান্ডায়। প্রতি মাসে ভাড়া ৩৫০০ টাকা। পার্ক এলাকায় লেবুর শরবত বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। স্ত্রীও মাঝে মধ্যে এই ব্যবসায় সহায়তা করেন।

জীবন এভাবেই চলছে বাদলের, তবুও আক্ষেপ তার। প্রশ্ন তার, এ জীবনে রক্তের কাউকে কি খুঁজে পাবো? বাদল ভুলে গেছেন মায়ের মুখ, বাবার মুখ,ভুলে গেছেন ভাই-বোনের মুখ। ছয় বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়া বাদল এখন ফিরতে চান মায়ের কাছে। জীবনে আর কোনো চাওয়া নেই তার। বাদলের জিজ্ঞাসা- ‘মা নিশ্চয় এখনো কাঁদেন হারিয়ে যাওয়া তার ছেলের জন্য?’ মায়ের সামনে একবার হাজির হয়ে বাদল বলতে চান, ‘মা তোমার ছেলে এখনো বেঁচে আছে।’

পরিবর্তন