অনন্য নজির রোমানা-রাজিবের! এ যুগেও এমন হয়!

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এক মহৎ হৃদয়ের রমণী এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন। এ নিয়ে গত কিছু দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে রীতিমতো ঝড় বইছে।

আনোয়ার হোসেন রাজীব। বয়স ২৯ বছর। হঠাৎ জীবনে নেমে এলো অন্ধকার। জানলেন দুটি কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। কিডনি দেওয়ার মতো কেউ নেই, কেনার সুযোগ-সামর্থ্যও নেই। অসময়ে সুন্দর পৃথিবী ছাড়তে হচ্ছে তার। এই কষ্ট মা-বাবারও কম নয়। ঠিক তখনই আশার আলো হয়ে এলেন রোমানা নামের এক তরুণী। প্রস্তাব দিলেন, তিনি একটি কিডনি দিতে চান। অবিশ্বাস্য লাগছে রাজীবের। শুধু তাকিয়ে থাকেন। বললেন, আত্মীয় না হলে তো কিডনি দিতে আইনে বাধা আছে। এবার চূড়ান্ত প্রস্তাবটিই দিলেন রোমানা। বললেন, শুধু কিডনিই নয়, এর আগে তিনি বিয়েও করতে চান। মানবিক প্রেমের এই অনিন্দ্যসুন্দর ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়, চলতি বছরের শুরুর দিকে।

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার বেজগাঁও ইউনিয়নের সুন্দিসার গ্রামে রাজীবের বাড়ি। আর রোমানা তাসমিনের বাড়ি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামে। তারা এখন থাকছেন ঢাকার লালবাগের একটি ভাড়া বাসায়। গেল ১৩ জানুয়ারি রাজীবকে বিয়ে করেন রোমানা। কিন্তু যে প্রেম তাদের এক করেছে, রাজীবের জীবন রক্ষার সেই কাজটুকু শেষ হয়নি। এর আগে ফেসবুকে রাজীবের সঙ্গে পরিচয় হয় রোমানা তাসমিনের। ফেসবুকেই জানতে পারেন, কিডনি রোগী রাজীবের বাঁচার আশা প্রায় শেষ। একপর্যায়ে রোমানা নিজের মাঝে রাজীবকে আবিষ্কার করেন। সিদ্ধান্ত নেন, প্রয়োজন হলে তিনি রাজীবকে বিয়ে করতে চান, তবু মানুষটি বেঁচে যাক। রোমানার মুখে এ কথা শুনে রাজীব পুনরায় বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন।

রোমানা পেশায় একজন প্যারামেডিক। কেরানীগঞ্জের সাজেদা হাসপাতালে কর্মরত। তার সামান্য আয়ে রাজীবের চিকিৎসা চলছে।

রোমানা কেন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজীবকে বিয়ে করলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, রাজীবের সঙ্গে ফেসবুকের একটি গ্রুপে বছরখানেক আগে তার বন্ধুত্ব হয়। ফেসবুকে রাজীবের কিডনি রোগের কথা প্রথম দিনেই জেনেছেন রাজীবের কাছ থেকে। আস্তে আস্তে তার প্রতি মমতা বেড়ে যায়, আর তা একসময় ভালোবাসায় রূপ নেয়। তাই সবকিছু জেনেও তিনি রাজীবকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। রাজীব স্ত্রী পেয়েছেন, কিডনি পাচ্ছেন।

কিন্তু এত কিছুর পরও থমকে আছে তার কিডনি প্রতিস্থাপন। অর্থাভাবে রাজীবের কিডনি প্রতিস্থাপন করা যাচ্ছে না। এখন শুধু প্রয়োজন অর্থ, যা সবার সহযোগিতা ছাড়া সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। রাজীবের কিডনি প্রতিস্থাপন করতে প্রয়োজন প্রায় তিন লাখ টাকা। কিন্তু এর আগেই কিডনি চিকিৎসায় দেশে-বিদেশে অনেক টাকা খরচ করে ফেলায় তার পরিবারের পক্ষে এ টাকা জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে রাজীবের চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসতে সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাজীবের ফেসবুক বন্ধুরা।

এদিকে রাজীব-রোমানার এ ঘটনা এরই মধ্যে নাড়া দিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, দেশের খ্যাতিমান আইনজীবীসহ সমাজের বিত্তবানদের। এর অংশ হিসেবেই গতকাল মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গিবাড়ী) আসনের এমপি অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি রাজীবকে দেখতে যান তার ঢাকার বাসায়। এমিলি বলেন, ‘মানবতা কখনো পরাজিত হতে পারে না। একটি মেয়ে যদি তার জীবন বাজি রেখে অন্যের জীবন বাঁচাতে আসতে পারে, তবে আমরা কেন পারব না রাজীবের চিকিৎসার ব্যয়ভারের ব্যবস্থা করতে? অবশ্যই রাজীবের চিকিৎসা ব্যয়ভারের ব্যবস্থা করা হবে। যেভাবেই হোক আমরা তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করব। ’ এর আগে মঙ্গলবার রাজীবের ঢাকার লালবাগের বাসায় গিয়ে রাজীব-রোমানার খোঁজখবর নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি রাজীবের চিকিৎসার জন্য তাত্ক্ষণিক কিছু আর্থিক সহযোগিতা করেন এবং কিডনি প্রতিস্থাপনের সময় আরও আর্থিক সহায়তা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ তার চিকিৎসার জন্য এরই মধ্যে আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছেন। প্রয়োজনে তিনি আরও সাহায্য-সহযোগিতা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পারিবারিক সূত্র জানায়, আনোয়ার হোসেন রাজীব লৌহজং পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০০২ সালে এসএসসি পাস করেন। ২০০৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এম এ শেষ করেন। তিনি পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসে সিনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরি করতেন। তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন। বাবা নূর মোহাম্মদ একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজীব ২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হন এবং প্রথম দিন থেকেই তার ডায়ালিসিস শুরু হয়। পরে ভারতেও গিয়েছিলেন তিনি। সেখানকার চিকিৎসকরা বলেছেন, কিডনি প্রতিস্থাপন করা ছাড়া তার আর বাঁচার কোনো পথ নেই। ডা. বি চৌধুরীকেও দেখিয়েছেন রাজীব।

জানা গেছে, বর্তমানে রাজধানীর মৌচাকে অবস্থিত সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সপ্তাহে নিয়মিত তিন-চার দিন ডায়ালিসিস নিয়ে বেঁচে আছেন রাজীব। সেখানকার কিডনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ওমর ফারুকের তত্ত্বাবধানে তিনি আছেন। ১ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ওই হাসপাতালে রাজীব লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। ঈদের দিনও হাসপাতালে ছিলেন।

বর্তমানে তিনি লালবাগের চৌধুরী বাজার এলাকার ২১ নম্বর সুবল দাস রোডে বসবাস করছেন।

আমাদের সময়