সরকারি হরগঙ্গা কলেজের ২’শ আসনের ছাত্রাবাস ৯ বছর ধরে পরিত্যক্ত

মুন্সীগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজের ২’শ আসনের ছাত্রাবাস ৯ বছর ধরে পরিত্যক্তমুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সরকারি হরগঙ্গা কলেজের দুইটি ছাত্রাবাসের মধ্যে একটি ছাত্রাবাস ৯ বছর ধরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। সচল আছে ৫ হাজার ছাত্রের জন্য ৯৬ আসনের একটি ছাত্রাবাস। এর ফলে প্রায় ৯ বছর ধরে কয়েক হাজার ছাত্রের জন্য আবাসন সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ছাত্রাবাসে জায়গা না পেয়ে ময়মনসিংহ, চাদঁপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ছাত্ররা বাধ্য হয়ে মেসে কিংবা ভাড়াবাড়িতে থাকতে হচ্ছে। এতে ছাত্রদের লেখাপড়ায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে।

অন্যদিকে ৯ বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষনা করলেও চলতি বছর পর্যন্ত ২০০ আসনের তিন তলা ছাত্রাবাসটি ভেঙ্গে নতুন ছাত্রাবাস নির্মানের উদ্যোগ ফাইলবন্দি হয়ে রয়েছে। বছরের পর বছর কলেজ কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট দফতর গুলোতে বারবার চিঠি প্রেরনসহ নানা ভাবে যোগাযোগ করলেও এখনও নতুন ছাত্রাবাস নির্মান কার্যক্রম পক্রিয়াধীন অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ১৯৪০ সালে নির্মিত ২০০ আসনের তিন তলা হরগঙ্গা মহাবিদ্যালয় ছাত্রাবাসটি দীর্ঘ সময় ব্যবহার ও সংস্কার না করায় ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে পরিত্যক্ত ঘোষনা করার পর থেকে ব্যবহার অযোগ্য ভবনটি কালের চিহ্ন হয়ে দাড়িয়ে আছে। দড়জা, জানালা না থাকায় পরিত্যক্ত ছাত্রাবাসটি এখন মলমূত্র ফেলার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। রাতের বেলায় অনেক সময় মাদকসেবীরা আনাগোনা করে থাকে। পরিত্যক্ত ছাত্রাবাসটি মুন্সীগঞ্জ-মুন্সীরহাট সড়ক ঘেষাঁ হওয়ায় অনায়াসে বহিরাগতরা প্রবেশ করতে পারে। অন্যদিকে সচল থাকা ১৯৯৫ সালে নির্মিত শহীদ জিয়াউর রহমান ছাত্রাবাসটির অবস্থা শোচনীয়। ৯৬ আসনের এ ছাত্রাবাসটি সচল থাকলেও স্যাতস্যাতে দেয়াল, ভাঙ্গা বেসিন, দড়জা ভাঙ্গা, নোংরা টয়লেটসহ নানা দুর্ভোগের কাটাছে ছাত্রদের ছাত্রাবাস জীবন। এ ছাত্রাবাসটিও এখন সংস্কার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এ ছাত্রাবাসে দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে বসবাসরত গজারিয়ার পুরান বাউশিয়া এলাকার অর্নাস পরিক্ষার্থী মো. নাজমুল সরকার সমকালকে জানান, শহীদ জিয়াউর রহমান হল নামের ছাত্রাবাসের করুন অবস্থা। ৩টি টয়লেটের মধ্যে ২টি সচল থাকলেও একটি অকেজো। ৩টি ওয়াশ রুমের মধ্যে একটি অকেজো আর ২টি সচল থাকলেও তারও অবস্থা করুন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে বিদ্যুত বিভ্রাট। ঘন ঘন বিদ্যুত লোডশেডিং হওয়ায় লেখাপড়ায় বিঘœ সৃষ্টির পাশাপাশি প্রচন্ড গরমে রুমে থাকাও দুস্কর হয়ে পড়ে।

অপর এক শিক্ষার্থী জানান, ঐতিহ্যবাহী এ কলেজে একটি মাত্র ছাত্রাবাস থাকার পাশাপাশি আসন সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম হওয়ায় ছাত্রদের গাদাগাদি করে থাকতে হয়। অনেক সময় মেঝেতে ঘুমাতে হয়। বিপুল সংখ্যক ছাত্রের বিপরীতে ৯৬ আসনের একটি ছাত্রাবাস তেমন কোন উপকারেই আসছে না বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ছাত্রদের। তাই ছাত্রদের জন্য যত দ্রুত নতুন বহুতল ভবনের ছাত্রাবাস নির্মান করা হবে, ততই মঙ্গল।

কলেজ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রি কোর্স ছাড়াও ১৫টি বিষয়ে ¯œাতক (সম্মান) ও ৭টি বিষয়ে ¯œাতকোত্তর কোর্স রয়েছে। মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০ হাজার ৪’শ। এর মধ্যে ছাত্র রয়েছে প্রায় ৫ হাজার। ছাত্রীদের জন্য একটি ছাত্রীনিরাস রয়েছে। ছাত্রদের জন্য ২টি ছাত্রাবাস ছিল। এর মধ্যে ১৯৪০ সালে নির্মিত ২০০ আসনের তিন তলা হরগঙ্গা মহাবিদ্যালয় ছাত্রাবাসটি দীর্ঘ সময় ব্যবহার ও সংস্কার না করায় ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে পরিত্যক্ত ঘোষনা করা হয়। এর ফলে জিয়াউর রহমান হল নামের ৯৬ আসনের একটি ছাত্রাবাসে ছাত্ররা থাকছে। এছাড়া ছাত্রী নিবাসে যাওয়ার সরু রাস্তা, তার ভাঙ্গা খানাখন্দকে ভরা। সরু রাস্তায় বিদ্যুতের খুটিঁতে লাইট না থাকায় রাত হলেই অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। বিষয়টি পল্লী বিদ্যুত সমিতি ও মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার মেয়রকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। আর চাহিদার তুলনায় খুব কম আসনের একটি ছাত্রাবাস থাকায় দীর্ঘ বছর ধরে হরগঙ্গা কলেজের ছাত্রদের তীব্র আবাসন সঙ্কট চলছে। এর ফলে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত ছাত্ররা বাধ্য হয়ে মেসে কিংবা ভাড়াবাড়িতে থেকে কলেজে পাঠদান করছে।

কলেজ সংলগ্ন মাঠপাড়া এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করছেন চাদঁপুরের মোখলেছুর রহমান। তিনি সমকালকে জানান, তার মতো শত শত ছাত্রকে মেস কিংবা বাসা বাড়িতে থাকতে হচ্ছে। লেখাপড়ার জন্য বাড়ি থেকে তাকে যে টাকা পাঠানো হয়, এর বেশীর ভাগই শেষ হয়ে যায় বাড়িভাড়া খাতে। কিন্তুু কলেজের হলে থাকতে পারলে তার অতিরিক্ত টাকা গুনতে হতো না। তাই ছাত্রদের সুযোগ সুবিধা ও লেখাপড়ার মান বৃদ্ধির জন্য শিগগিরই নতুন ছাত্রাবাস নির্মান এখন সময়ের দাবীতে পরিনত হয়েছে।

হরগঙ্গা কলেজের প্রধান সহকারী মো. আনোয়ার হোসেন জানান, ২’শ আসনের ছাত্রাবাসটি ৯ বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষনা করার পর গত ৩ বছর আগে পুরাতন ছাত্রাবাসটি ভেঙ্গে ফেলতে পক্রিয়া শুরু হলেও আবার থেমে যায়। তিনি আরও জানান, হঠাৎ করে থেমে যাওয়ার পর গত দুই মাস ধরে আবারও পক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসক কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হওয়ায় তার দফতর থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে প্রেরিত পরিপত্র কলেজ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রেরন করা হবে। সেখানে থেকে অনুমোদন পাওয়ার পর পরিত্যক্ত ভবন ভেঙ্গে ফেলার জন্য দরপত্র আহবান করা হবে।

এ পক্রিয়া সম্পন্ন হতে কত দিন সময় লাগবে এমন প্রশ্নের জবাবে নির্ধারিত দিনক্ষন জানাতে পারেনি কলেজের প্রধান সহকারী মো. আনোয়ার হোসেন। তবে তিনি জানান, পরিত্যক্ত ছাত্রাবাসের স্থানে ১০ তলা একাডেমিক ভবন নির্মান করা হবে। আর নতুন ছাত্রাবাস নির্মানের জন্য সচল থাকা ছাত্রাবাস সংলগ্ন দক্ষিন দিকে খালি জায়গায় প্রাথমিক স্থান নির্ধারন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সরকারি হরগঙ্গা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মীর মাহফুজুল হক জানান, পরিত্যক্ত ঘোষনা করা পুরাতন ছাত্রাবাসটি ভেঙ্গে ফেলতে নতুন করে দরপত্র আহবানের পক্রিয়া চলছে। নতুন ছাত্রাবাস নির্মান না হওয়া পর্যন্ত এই আবাসন সঙ্কট মোচন হবে না। নতুন ছাত্রাবাস নির্মানের জন্য বারবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষতে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ সহকারী প্রকৌশলী মো. ইনামুল হক জানান, পুরাতন ছাত্রাবাসটি নিলামে দেওয়ার জন্য আনুমানিক মূল্য ধরে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল অনেক আগে। কিন্তুু তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় আবার নতুন করে পক্রিয়া নেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে প্রস্তাবনা পাঠানোর পর অনুমোদন হলে তারপর কলেজ অধ্যক্ষ নিলামের জন্য দরপত্র আহবান করবে।

এনবিএস

Comments are closed.