ভালোবাসার কাছে সবকিছুই তুচ্ছ প্রমাণ করলেন রাজকুমারী মাকো

রাহমান মনি, জাপান থেকে: অবশেষে ভালোবাসারই জয় হতে চলেছে জাপানের রাজ পরিবারের সদস্য রাজকুমারী মাকোর (আকিশিনোমিয়া) জীবনে। বিয়ে করতে চলেছেন রাজপরিবারের বাইরে সাধারণ পরিবারের একজনকে। আর এ জন্য রাজকন্যাকে অনেক কিছুই হারাতে হবে। প্রথমেই তাকে হারাতে হবে রাজ কুমারী উপাধী। এ ছাড়া আরাম আয়েসী এবং নিশ্চিত বিলাসী জীবন তো রয়েছেই। কিন্তু ভালোবাসার প্রতিদানের কাছে সব কিছুই যে তুচ্ছ তা প্রমাণ করলেন অত্যাধুনিক এ যুগের এই রাজকন্যা।

ঠাকুমার ঝুলি কিংবা রূপকথা গল্পে এমন ঘটনার নানান বর্ণনা থাকলেও বাস্তব জীবনে আমাদের জীবদ্দশায়ই তা ঘটে চলেছে। কে জানে, কোনো গল্পকার হয়তো বা এই ঘটনা নিয়ে কোনো উপন্যাস কিংবা ছোট গল্প লিখবেন এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মরা তা জানবে।

সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের প্রথম দিকে এ বিয়ে সম্পন্ন হবে। ইতোমধ্যে তাদের আংটি পরানোসহ পিতা প্রিন্স ফুমিহিতো (আকিশিনোমিয়া) এবং মাতা প্রিন্সেস কিকো (আকিশিনোমিয়া)’র সঙ্গে পরিচয় এবং বাগদানের কাজটিও শেষ হয়ে গেছে ১৬ মে ’১৭ মঙ্গলবার দিন। রাজকন্যা মাকো তাদের প্রথম সন্তান তো বটেই এমন কি সম্রাট আকিহিতো’র প্রথম নাতনিও। মাকোর জন্ম ১৯৯১ সালের ২৩ অক্টোবর। পাত্রটি আর কেউ নন, রাজকন্যার সহপাঠী, তার নাম কেই কোমুরো।
টোকিওর মিজাকাতে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রিশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে স্নাতক পড়াকালীন তারা সহপাঠী হলেও ২০১১ সালে টোকিওর একটি অনুষ্ঠানে তাদের প্রথম দেখা হয়। সেই থেকে পরিচয় এবং জানাশোনা ও মনের আদানপ্রদান এবং অবশেষে সফল পরিণতির দিকে। মাকো অবশ্য কোনো কিছুই গোপন করেনি রাজ পরিবারের কাছে। পিতা মাতাকে তিনি সব কিছুই অবহিত করেছেন।

রাজকন্যা মাকো এবং কেই কোমুরো ২০১৪ সালের ২৬ মার্চ (বাংলাদেশের জাতীয় দিবস ও একই সঙ্গে স্বাধীনতা দিবস, কাকতালীয়ভাবে) একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর দুইজন ভিন্ন ভিন্নভাবে পড়াশুনা এবং কর্ম চালিয়ে গেলেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি কখনো।

রাজকন্যা মাকো যুক্তরাজ্যের লিসেসটার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বেশ কয়েকমাস আগে একটি মিউজিয়ামে গবেষক হিসেবে কাজ করছেন এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনে শিক্ষারত। এ ছাড়াও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় বিনিময় শিক্ষার্থী হিসেবে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ২০১৩ সালের মে মাস (নয় মাস) পর্যন্ত স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্ট হিস্টোরির উপর পড়াশোনা করেছেন। তার মাস্টার্স-এর বিষয়ও ছিল মিউজিয়াম স্টাডিজ। জাপানের প্রচলিত ট্রাফিক আইনে তিনি তার ড্রাইভিং লাইসেন্সটিও অর্জন করে নেন।

রাজকন্যা মাকো রাজপরিবারের সদস্য হলেও বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে নিজেকে সংযুক্ত রাখতে পছন্দ করেন সব সময়ই। ২০১১ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পে এবং পরবর্তী সুনামিতে তোহোকু অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন সাধারণ ছাত্রী বেশে সেখানে ভলান্টিয়ায় হিসেবে যান এবং রাজকন্যা উপাধি উহ্য রেখে আন্টিয়ার কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন যদিও পরবর্তীতে তা প্রকাশ পেয়ে যায় এবং সবার প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হন।

এদিকে তার হবু বর কেই কোমুরো পড়াশুনায় অধ্যায় শেষ করে একটি ‘ল’ ফার্মে কাজ করছেন। আইনি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকায় তাকেও ব্যস্ত থাকতে হয় সারাক্ষণ।
সবকিছুর বিনিময়ে রাজকন্যার উপাধি নিতে প্রতিটি নারী যেখানে উদগ্রীব থাকেন, নিজেকে রাজকন্যায় আসীনে স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করেন, সেখানে রাজকন্যা মাকো সব কিছু ছেড়ে সাধারণ জীবনকেই বেছে নিচ্ছেন।

এখন দেখা যাক, তাকে কী কী ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। একটি সাধারণ পরিবারের একজনকে হবু বর হিসেবে বেছে নেয়ায় মাকোকে প্রথমেই রাজকন্যা উপাধি ত্যাগ করতে হবে। তিনি আর কখনো রাজকুমারী ব্যবহার করতে পারবেন না, এমন কি তার সন্তান বা ভবিষ্যৎ বংশধররাও এ উপাধি আর ব্যবহার করার সুযোগ পাবেন না। কারণ, জাপানের রাজপরিবারের নিয়ম অনুযায়ী বাইরের সাধারণ পরিবারের কাউকে বিয়ে করলে বরাবরের জন্য রাজপ্রাসাদের যাবতীয় মোহ অর্থাৎ উপাধি, বিলাসজীবন এবং বিত্ত বৈভব বা সম্পত্তি কোনো কিছুতেই তার অধিকার থাকবে না। তবে, এককালীন নগদ অর্থ পাবেন যেটি কাজে লাগাতে পারলে বাকি জীবন ভালো কাজে লাগবে। তার ফুফুর অভিজ্ঞতা তিনি কাজে লাগাতে পারবেন।

রাজকুমারী নোরি (পরবর্তীতে সায়কো), সম্রাট আকিহিতোর কন্যা ২০০৫ সালের ১৫ নভেম্বর ইয়োশিকি কুরেদোকে বিয়ে করলে তার রাজকুমারী উপাধি হারান এবং সব মোহ ত্যাগ করে কুবোদা ফ্যামিলি নেইম গ্রহণ করে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করেন। এই সময় জাপান সরকার থেকে এককালীন ১৩ লাখ মার্কিট ডলারের সমপরিমাণ নগদ অর্থ উপহার হিসেবে পান এবং সেই অর্থে বাড়ি কিনে স্বামী সংসার করছেন, বর্তমানে তিনি ধর্মীয় কাজে উচ্চ পর্যায়ে ধর্মযাজক হিসেবে কর্মরত আছেন। জাপান রাজপরিবার শিনতো ধর্মের অনুসারী। শিনতো অর্থ হচ্ছে প্রকৃতি এবং আত্মা। বংশ পরম্পরায় রাজপরিবার এই ধর্মে বিশ্বাসী। তাদের রয়েছে ২০০ বছরের ঐহিত্য।

একইভাবে মাকো ও জাপান সরকার থেকে উপহার হিসেবে নগদ এককালীন অর্থ পাবেন। তবে অর্থের পরিমাণটা এখনো জানানো হয়নি। ২০০৫ সালে যদি ১৩ লাখ ডলারের সমপরিমাণ হয় তবে এখন নিশ্চয় আরও বেশি বলে অনেক মত দেন। আবার কারও কারও মতে সায়াকো ছিলেন সম্রাট কন্যা, আর মাকো হচ্ছেন প্রিন্স কন্যা। পার্থক্য তো কিছু থাকবেই। এই নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই।

অন্যদিকে মার্কোর দাদি, মা এমন কি চাচিও (ভবিষ্যৎরাণী) বাহির থেকে রাজপরিবারের সদস্য হয়ে রাজপরিবারের উপাধি গ্রহণ করেছেন। তার দাদি, সম্রাজ্ঞী মিচিকো সোদা ১৯৫৯ সালে তৎকালীন ক্রাউন প্রিন্স এবং বর্তমান সম্রাট আকিহিতোকে বিয়ে করে রাজপরিবারের সদস্যার উপাধি গ্রহণ করেন। তার মাতা কাউয়াশিমা কিকো সম্রাটের দ্বিতীয়পুত্র প্রিন্স ফুমিহিতোকে ১৯৯০ সালে বিয়ে করে রাজপরিবারের সদস্যা উপাধি গ্রহণ করেন এবং মাকো’র বড় চাচি মাসাকে ওয়াদা জাপান রাজপরিবারের দ্বিতীয় উত্তরাধিকারী ক্রাউন প্রিন্স নারুহিতোকে বিয়ে করেন এবং রাজ উপাধি গ্রহণ করেন।

এছাড়াও রাজকন্যার একজন ছোট বোন (প্রিন্সেস কাকো) এবং ১০ বছর বয়সী ছোট ভাই প্রিন্স হিসাহিতো (যিনি রাজপরিবারের তৃতীয় উত্তরাধিকারী হবেন) রয়েছেন। কিন্তু বিয়ের পর সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। যেমনটি হয়েছে সায়াকোর ক্ষেত্রে।

সাধারণ জাপানিরা অবশ্য রাজকন্যার এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা মনে করেন এ রাজপরিবারের এই বদ্ধ জীবন থেকে যেখানে নিজের বলে কিছুই নেই, সব কিছুই এমন কি কথাবার্তা বলার সময় ভাষার ব্যবহারেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেখানে রাজকন্যা মাকো একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে জীবনকে উপভোগ করতে পারবেন। তার ভোটাধিকার থাকবে। তিনি কর প্রদান করবেন, নিজের টুকিটাকি কাজগুলো নিজেই পছন্দ মতো করে নিতে পারবেন এ এক মুক্ত জীবন। এটাই হলো আসল জীবন, উপভোগ করার মতো। মুক্ত বিহঙ্গ।

জাপান মিডিয়া এমন কি বিশ্ব মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে তার এ সিদ্ধান্তে। অবশ্য তার হবু বর বিষয়টি নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছেন।

তথ্য সূত্র : জাপান মিডিয়া এবং ইন্টারনেট
rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক