একাকিত্ব যেন মৃত্যূ যন্ত্রনার আবেশ

এডভোকেট ব.ম শামীম: মৃত্যূ মানেই একাকিত্ব। ইসলামের ভাষায় মৃত্যূর পর দির্ঘ একটা সময় ছোট মাটির তৈরী কবর নামের ঘরে ঘুমিয়ে থাকার পর আবার বিধাতা একটা সময় জাগ্রত করবেন মানুষকে। তবে ওই মাটির তৈরী ঘরটি যদি কোন পূর্ণবান ব্যাক্তির হয় তাহলে সে নিশ্চিত একটা দির্ঘ সময় ওই ঘরের মধ্যে আরামে ঘুমের মধ্যে পাড়ি দিবেন সময়টা আর যদি কোন পাপাচার ব্যাক্তির হয় তাহলে ওই ঘরের মধ্যে অসহ্য দূঃখ কষ্ট ভোগে করতে হবে তাকে। কিন্তু মৃত্যূর পূর্বের আমাদের যে ক্ষনস্থায়ী জীবন এখানে কি কাজ করলে ভালো আর কোন কাজ করলে খারাপ হয় তার তারতাম্য অনেক ক্ষেত্রেই বোধগাম্য হয়না মানুষের। কিন্তু আল্লাহ সৎ জীবন যাপন করতে বলেছেন। তবে এই জগতে সৎ থেকে অসৎ পথে যারা আছেন তারাই সুখি সমৃদ্ধি জীবন যাপন করছেন বলে পত্যক্ষ দিবালোকে দেখা যায়।

কিন্তু মৃত্যূর পরের জীবনটা যে একাকিত্বের একটি জীবন সেটা হোক যন্ত্রনার আর হোক আরামের কিন্তু একাকিত্বটা যেন চীরসত্য। তবে মৃত্যূর পরে একাকিত্বটা এখনও আমরা উপলদ্ধি করি যখন বেচেঁ থাকা অবস্থায় আতœীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব কিংবা কাছের কাউকে হারিয়ে ফেলি তখন মৃত্যূর কথা মনে হয়। একাকিত্বের যন্ত্রনাটা যেন মৃত্যূ যন্ত্রনার মতোই। তবে মৃত্যূ যন্ত্রনা শুধু যে মারা যায় সেই তার সঠিক অনুধাবন করতে পারে আমরা যারা বেঁচে আছি এই যন্ত্রনা সম্পর্কে আমাদের পক্ষে সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে একাকিত্ব এমন একটা অবস্থা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাসায় কোন মানুষকে একা যদি একটি কক্ষে পর্যাপ্ত খাবার দিয়ে ১৫ দিনের অধিক সময় আটকে রাখা হয় তাহলে নিসঙ্গ থাকার কারনে সে তার স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলতে পারে। এতে বুঝা যায় বেচেঁ থাকতে হলে অপরের সখ্যতা কতটা প্রয়োজন। একে অপরের উপর নির্ভরশীল এ জগৎতের মানুষ হিসাবে যখন অত্যন্ত কাছের কোন আপনজন মৃত্যূর মিছিলে যোগ হয় তখন নিজের মৃত্যূ নিয়ে ভাবনাটাও প্রকট হয়। আবার কাছের কেউ দূরে চলে গেলেও সেই চলে যাওয়ার নিরবতাটা মৃত্যূর মতো বিষাদের মনে হয়।

তবে মৃত্যূর স্বাদ বা যন্ত্রনাটা আমি ছোট বেলা হতেই প্রতিবছর যখম কুরবানি আসে তখন নতুন করে অনুধাবন করি। কুরবানির দিনে হাটে হতে ক্রয় করা গরুগুলো যখন জবাই করি ওগুলোর হাত পা বেধে চেপে ধরে রাখি ইমাম সাহেবের ওই গরুগুলোর গলায় ছুড়ি চালানোর দৃশ্য দেখি তারপর মৃত্যূর যন্ত্রনায় জোড়ে উচ্চ স্বরে ওই গরুগুলো বে বে শব্দ করে গগন বিদরিয়া শব্দ করে কিংবা পুরো শরীরটিতে মৃত্যূর যন্ত্রনা নিয়ে কাতরাতে থাকে তখন উপলদ্ধি করি মৃত্যূ নামের যন্ত্রনটা কত যে ভয়ঙ্কর।

প্রাণী হত্যা বলতে ছোট বেলায় ইদুর এবং শাপ মারার বেশ অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। ইদুর নামের ছোট প্রাণীকে একটি দুইটিবার অঘাত করলেই অতি সহজেই মরে যায় প্রাণীটি তাই ওই ছোট প্রানীটির মৃত্যূর যন্ত্রনাটা উপলদ্ধি করা বা হৃদয়ের মধ্যে তেমন দাগ কাটে না। আর শাপ নামের প্রাণীটাকে নিজে অথবা কাছের লোকজন মিলে যখনি মেরেছি এটাকে এমনভাবে আঘাতের পর আঘাত করা হয় আঘাতের তোড়ে কিভাবে মৃত্যূর কোলে ঢলে পরে অনন্তকালে হারিয়ে যায় সেটা দেখার দৃষ্টির চেয়ে শাপটির উপর আঘাতের পর আঘাত করার প্রবল ইচ্ছার কারনে সেটা অনুভব করা যায়না। শাপের কামরানোর ভয়ে মানুষ ওটাকে এতোভাবে অঘাত করতে থাকে যে ওর দেহ থেকে দ্রুত প্রাণটি না বের হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায়ন্তর থাকেনা। তবে ছোট বেলা থেকে এই দুটি প্রাণীকে দেখলেই মেরে ফেলতে হবে যেই লাইসেন্স পরিবার থেকে পেয়ে এসেছি তাতে এই প্রানি দুটিকে মেরে ফেলতে কখনো নিজের বিবেক কিংবা তাদেরও যে প্রাণ আছে ওদের আঘাত করলে ওরা কষ্ট পায় সে উপলদ্ধিটা হয়ে উঠেনি বা ওদের মৃত্যূ যন্ত্রনাটাও সেভাবে দেখা হয়নি।

তবে পশু কাতরানোর মতো যন্ত্রনায় ছটফট করে মৃত্যূর কোলে ঢলে না পড়তে দেখলেও মৃত্যূর যন্ত্রনা কাছের কেউ চলে যাওয়ার দৃশ্যটা সেই ছোট বেলা হতেই দেখা হয়েছে অনেকবার। দূরের মানুষের কথা হয়তো নাইবা বললাম। আমার পরিবারের সবার আগে যাকে মৃত্যূ বরণ করতে দেখলাম সে আমার দাদী। তবে দাদীর চলে যাওয়ার দৃশ্যটা শুধু মনে আছে তার নিথর দেহটি পরে থাকতে দেখিছিলাম আমার উঠানের উপর। তারপর দাদাকে দেখলাম মৃত্যূর যন্ত্রনায় দির্ঘদিন ভূগে একদিন সেও চলে গেল। চলে যাওয়ার আগে বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন দির্ঘদিন। বিছনায় শুয়ে থাকতে থাকতে পিঠের মধ্যে অনেক বড় বড় ঘা হয়ে গিয়েছিলো তার। তারপর খুব ছোট বয়সে আপন ছোট ভাই জনির চলে গেলো মৃত্যূর যন্ত্রনা নিয়ে। ও চলে গেলো কয়েক মাস বয়সে। জনি মুখ দিয়ে কোন কথা বলতে পরতো না।

ওকে দেখতাম যেদিন ও সুস্থ থাকতো চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে হাসতো অন্য দশটি ছেলের মতো খেলা করতো হাত পা নাড়তো। আর যেদিন অসুস্থ থাকতো বিছানায় শুয়ে শুয়ে খুব জোড়ে জোড়ে শ্বাস প্রশ্বাস নিতো। তখন ওর মাথার তালুর অংশে একটা স্থানে বেশ ডেবে যেতো। ও শ্বাস প্রশাস নেওয়ার সময় ওই অংশটিও কেমন উঠা নামা করতো। তখন ওর জন্য খুব মায়া হতো আমার মাথায় ওর হাত বুলাতাম সাথে উঠা নামা করতে থাকা ওই অংশটিতেও হাত দিতাম ওই অংশটি বেশ নরম মনে হতো।

মা ও বাবাকে দেখিছি ডাক্তারি চিকিৎসার পাশাপাশি এলাকার ফকির দ্বারা বেশ ঝাড় ফুক কড়ালেন ওকে। কিন্তু একদিন সকল কিছু ব্যার্থ করে ও চলে গেলো। সেই সময় গভির রাত গভির ঘুমে অচেতন আমি। গভির ঘুমের মধ্যে মায়ের গগণ বিদরানো কান্নার ধ্বনি শুনলাম, হক চকিয়ে বিছানার উপর বসে পড়লাম মায়ের কান্না শুনে মনে হয় বেশ জোড়ে কাদছিলাম আমিও সাথে আমার অন্যান্য ভাই ও বোনেরা। তখন হয়তো উপলদ্ধি করার বয়স হয়নি আমার এই মানেই শেষ যাত্রা সেই ছোট ভাইয়ের আদূরে মুখটা আর দেখা হবে না আমার।

তারপর সেই ছোট জনির নিথর দেহটি আমার নানা কোলে করে একটি গোরস্থান সেখানে তৈরী ছোট একটি গর্তের মধ্যে সাদা কাপড় মুড়িয়ে রেখে এলেন। সেই শেষ দেখা ছোট ভাইটিকে আমার। তারপর অনেকবার ওই কবরের পাশ দিয়ে হেটে গিয়েছি আমি দেখেছি ভাইয়ের কবরের স্থানটিতে বেশ বড় বড় ঘাস জমিয়েছে কখনও দেখেছি সেই ঘাসগুলোর মধ্যে ফুল ফুটেছে। বাতাস আসলেই ওই ঘাসগুলো যখন নড়েছে মনে হয়েছে ছোট জনি যেন ওর হাসি মুখটি দিয়ে আমায় ডাকছে। এখন আর সেভাবে ওর কবরের কাছে যাওয়া হয়না অনেকটা ভূলেই গেছি জনিকে।

তারপর হঠাৎ করে চলে গেলেন বাবাও। সুস্থ সবল বাবা বয়স তখন হয়তো ৪৫ কি ৫০ । মৃত্যূর ৩ মাস আগেও কেউ কল্পনা করতে পরেনি ক্যান্সার নামের কঠিন ব্যাধিটি তার শরীরে দানা বেদেছে। মাত্র ১৫-২০দিন শয্যাশায়ী ছিলেন বাবা। সেই সময় মৃত্যূ যন্ত্রনায় বেশ ছটফট করতে তাকে দেখেছি। যখন ওই যন্ত্রনা তাকে গ্রাস করতো তখন বেশ জোড়ে জোড়ে শ্বাস প্রসাশ নিতো সে বেশ উচ্চ স্বরে শব্দ হতো তখন। এমনি একদিন জোড়ে জোড়ে শ্বাস প্রশাস নিতে নিতেই চির দিনের মতো শ্বাস প্রশ্বাস হারিয়ে গেলো তার শূণ্যতায়। তারপর বাড়ির পাশে আমাদের সামাজিক কবরস্থানটিতে কবর খুড়ে বাবার দেহটিকে কবরে নামিয়ে রেখে আসলাম।

মনে পরে আমি বাবার কবরে নেমে বাবার দুটি পা উপর থেকে ধরে যখন কবরে নামালাম তখন বাবার পা দুটি বেশ ঠান্ডা মনে হচ্ছিল। প্রাণহীন বাবার সেইতো শেষ স্পর্শ নেওয়া। বাবাকে কবরে শুইয়ে তার কবরের পাশে নিজ হাতে কয়েক টুকরা মাটি রেখে উঠে আসলাম। বাবার মৃত্যূর পর সংসার নামের কঠিন বাস্তবতার ¯্রােতে বয়ে চলেছি নিরন্তর। অল্প বয়সে যখন হতে বাবাকে হারালাম তখন হতেই উপলদ্ধি করে আসছি আমার মাথার উপর ছাদ নেই ছায়াহীন আমি। সংসারের বড় সন্তান হিসাবে নিজের দায়িত্বটুকু পালন করার চেষ্টা করে চলেছি নিরন্তর। আমি যে ছায়াহীন মাথার উপরে ছাদহীন বুঝতে দেইনি ছোট ভাই-বোনদের কখনো। তারপর একদিন চলন্ত গাড়ির মধ্যে শুনতে পেলাম ছোট বোনের চির দিনের জন্য চলে যাওয়ার বার্তাটা।

চলন্ত গাড়ি থেকে ইচ্ছা হচ্ছিল আমি নিজেও ঝাপ দেই। কিন্তু বাবার রেখে যাওয়া সংসার মা আর অন্যান্য ভাই-বোনদের কথা চিন্তা করে পারলাম না। বোনের দেহটিকেও নিজ হাতে কবরে শুইয়ে আসলাম। এখনও যতই দিন যায় চির চেনা মুখ গুলো সব দূরে চলে চায়। কর্মের তাগিদে নিজের চিরচেনা ছোট নিজ এবং চাচাতো ভাইগুলো দেশে বিদেশে পাড়ি জমায়। চাচাতো বোনগুলো একের পর এক বিয়ে করে শশুর বাড়ি চলে যায় একাকিত্বের যন্ত্রনাটা যেন প্রতিনিয়ত কাছ হতে আরো কাছে এসে গ্রাস করে । ইচ্ছে হয় এখন ওই ছোট ঘরটি যেখানে রেখে এলাম বাবা, ছোট ভাই আর বোনকে ওই ছোট একটি ঘর কেন যেন আজ বেশ আপন মনে হয়। বর্ষায় অবিরত বৃষ্টির মধ্যে কবরের উপরে অসংখ্য ঘাস জন্মে ঘাস দিয়ে আবৃত্ত মাটি দিয়ে তৈরী ঘরটির সুদা গন্ধ যেন বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুনতে পাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *