ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে তাঁরাও দলীয় আদর্শ থেকে বিচ্যুত!

শাহ্‌ মোয়াজ্জেম হোসেন ও এম কোরবান আলী
সত্তুরের নির্বাচনে জনাব শাহ্‌ মোয়াজ্জেম হোসেন আমাদের এলাকার এমপিএ এবং এম কোরবান আলী কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। কোরবান আলী স্বাধিনতা যুদ্ধচলাকালীন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাস্ট্রপতির উপদেস্টা ও পরে ৭২ সালে আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। স্বাধিনতা পূর্ববর্তী আওয়ামী রাজনীতিতে তাঁদের গৌরবোজ্জল ভূমিকা অনস্বীকার্য।

‘৬৯ এর গণ আন্দোলনের সময় শাহ্‌ মোয়াজ্জেমের নাম শুনেছিলাম, ‘৭০ এর নির্বাচন কালীন রাড়িখালের মিশনের জনসভায় তাঁকে ডোরাকাটা কোট গাঁয়ে প্রথম দেখলাম। মুন্সীগঞ্জের উকিল হিসেবে তিনি আমার কাকা মোফাজ্জল হোসেন খানের পূর্ব পরিচিত ছিলেন বিধায় তাঁর সাথে কোলাকুলি করতে দেখলাম, তাঁর অগ্নিঝরা বক্তৃতা শুনলাম, বিমোহিত হয়ে গেলাম পাকিস্তানী শোষণ বঞ্চনার নানান কাহিনী শুনে, মনে আছে তিনি বলতেন, এ দেশে উৎপন্ন কাগজ জাহাজে করে করাচী যায় সিল মারার জন্য, এ জন্য আমরা সে কাগজ কিনি ১০ আনা দিস্তা আর পশ্চিম পাকিস্তানীরা কিনে ৬ আনা দিস্তা, এ ভাবে তেল লবন চিনি কাপড় ইত্যাদির দামের বৈষম্য ও বংগবন্ধুর কারাবরণসহ নানান অত্যাচার অবিচারও অনাচার নিয়ে কথা বলতেন, তাঁর বক্তৃতা শুনার জন্য দল বেঁধে বিভিন্ন স্থানে চলে যেতাম, সে সময় তাঁর কথা শুনে আবেগে মাঠেই অনেককে কাঁদতেও দেখেছি। স্বাধিনতার পরে ভারত থেকে দেশে আসার পর শাহ্‌ মোয়াজ্জেম হোসেনের গণসংবর্ধণায় গেলাম শ্রীনগরে, লঞ্চঘাট থেকে তিনি ভালবাসায় শিক্ত হয়ে মানুষের মাথায় চড়ে স্টেডিয়াম মাঠ পর্যন্ত এলেন।

‘৭৩ সালের ১ম সংসদ নির্বাচনে এ দু’নেতা মুন্সীগঞ্জের দুটি আসনে পুনরায় জেতার পর শাহ্‌ মোয়াজ্জেম বনাম কোরবান আলীর ক্ষমতার দ্বন্দে কিছু দিনের ব্যবধানে শ্রীনগর লৌহজং সিরাজদিখানের রাজনীতির দৃশ্যপট পাল্টে গেল, একই দলে বিভেদ, উপদলীয় কোন্দল, গ্রুপিং এর কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হলো সাধারন জনগণ। মুল পরিচয় একটিই কে মোয়াজ্জেম গ্রুপের কে কোরবান গ্রুপের, আবার উপগ্রুপগুলোর ও নানান পরিচয় নানান নাম ছিল।

আধিপত্যের লড়াইটা বুঝা গেল তথ্য মন্ত্রী এম কোরবান আলী হেলিকপ্টারে কোলাপাড়া বাজারে আসার কয়েকদিনের মাথায় আবার হেলিকপ্টারে শাহ্‌ মোয়াজ্জেম হোসেন কোলাপাড়া এলেন, শাহ্‌ মোয়াজ্জেম বললেন, আমাকে চীফহুইপ বানানো হয়েছে অথচ এটা কি জিনিষ আমি নিজেই বুঝি না। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্র করে বংগবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে জাতীয় জীবনে কলংক নেমে এলে শাহ্‌ মোয়াজ্জেম মুহুর্তেই ভোল পাল্টে মোশতাক মন্ত্রীসভায় ভূমি ও বিমান প্রতিমন্ত্রী হিসাবে নাম লেখালেন। ক্ষমতা ও আদর্শ এ দু’টোর পার্থক্য বিক্রমপুরের জনগণ বুঝে নিল। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো নড়বড়ে হয়ে পড়লো।

এম কোরবান আলী ‘৭৯ সালে আমাদের আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলেন, নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যক কর্মী পাওয়া গেল না, তিনি আমাদের বাড়িতেও এসেছিলেন, মা চাচিদের কাছে দোয়াও চেয়েছিলেন। এলাকায় আমরা হাতে গোনা কয়েকজন কর্মী তাঁর ক্যাম্পিং করতে গিয়ে নানাভাবে নাজেহাল হলাম, তিনি পরাজিত হলেন। ক্ষমতার ভারসাম্য এবং প্রতিপক্ষ শাহ্‌ মোয়াজ্জেমকে সামাল দেয়ার জন্য এম কোরবান আলীও নীতি আদর্শ বিসর্জন দিয়ে এরশাদের মন্ত্রীত্ব নিয়ে দলত্যাগী হয়ে গেলেন। দলীয় আদর্শ ও বিপুল সংখ্যাক কর্মী বাহিনীর মতামত উপেক্ষা করে শুধুমাত্র ক্ষমতা রক্ষার জন্য উপরোক্ত দু’জনের ভুল এবং বিভ্রান্তিকর রাজনীতির কারণে পশ্চিম বিক্রমপুরে আওয়ামী লীগকে পায়ের উপড় ভর করে দাঁড়াতে দীর্ঘ সময় লেগে গিয়েছিল। অতিতের বিভ্রান্তিকর ও হঠকারী রাজনীতি থেকে আমাদের সবাইকে শিক্ষা নেয়া উচিৎ।

আবদুর রশিদ খান এর ফেছবুক থেকে