পটকাব্য: প্রাকৃতিক রঙের খেলা পৌরাণিক কাহিনী লোকায়ত জীবন

শম্ভু আচার্য্য’র পটকাব্য পরম্পরা
মোরসালিন মিজান: পটচিত্র পুরনো প্রাচীন চর্চা। এই পুরনো এই প্রাচীন কোন নতুনে ঢাকা পড়ে না। বরং স্বতন্ত্র আবেদন নিয়ে হাজির হয়। আড়াই হাজার বছর আগের ইতিহাস। আজকের উন্নত বোধ ও শিল্প-রুচির মানুষেরা তবু একে অস্বীকার বা অগ্রাহ্য করতে পারে না। বাঙালী এখনও পটচিত্রে মুগ্ধ। স্ক্রল পেইন্টিংয়ে শেকড়ের সন্ধান করে। আয়নায় মুখ দেখার মতো করে নিজেকে দেখে। আর পটুয়া যদি হন শম্ভু আচার্য্য তাহলে তো কথাই নেই। এই ধারার কাজের জন্য বিশেষ তিনি। আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। দেশে এবং বিদেশে খ্যাতি অর্জন করা পটুয়ার একক প্রদর্শনী এখন চলছে গ্যালারি চিত্রকে। বিজ্ঞাপনী সংস্থা এক্সপ্রেশানস আয়োজিত প্রদর্শনীর শিরোনাম- পটকাব্য পরম্পরা। শিরোনাম প্রদর্শনীর শিল্পী ও শিল্পকর্মের ইতিহাস সম্পর্কে, হ্যাঁ, একটি প্রাথমিক ধারণা দেয়। মূলত পূর্ব পুরুষের চর্চা ভালবেসে আগলে রেখেছেন শম্ভু। বংশ পরম্পরায় পটচিত্র অঙ্কনে নবম উত্তরপ্রজন্ম তিনি। বাবা ঠাকুরদা কিংবা তাদেরও আগে পরিবারের যারা পটচিত্র আঁকতেন তাদের শৈলী অনুসরণ করে চলেছেন। নিজের দেখা চারপাশ, কল্পলোক তার সৃষ্টিকে বিশিষ্টার্থক গঠন নির্মিতি দেয়। নতুন প্রাণ পায় লোক চিত্রকলার বিলুপ্তপ্রায় ধারা।

মোট পটচিত্র সংখ্যা ৪১টি। কিছু অনুকৃতি। মোটামুটি দেখা। অথচ প্রথম দেখার আনন্দ নিয়ে হাজির হয়। প্রায় প্রতিটি ছবি ভেতরে দোলা দিয়ে যায়। তাকানো মাত্রই চোখ স্থির হয়ে যায়। একটি ছবি মনের গভীরে জমা হয়ে থাকা শত সহস্র ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়!

শম্ভু পৌরাণিক কাহিনী, কেচ্ছা রং তুলির পরিভাষায় ফুটিয়ে তুলতে প্রয়াসী হন। লোকায়ত জীবন সংস্কৃতির গল্প বলেন। ঐতিহ্যকে ধারণ করেন নানা রঙে। রূপে। পট যেহেতু, রংয়ের হবে। রূপের হবে। এ তো স্বাভাবিক। কিন্তু শম্ভু যে প্রাকৃতিক রং নিজে তৈরি করেন, ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে পরিমিতি দেখান, তা তার দীর্ঘ চর্চার ফল বলেই ধারণা হয়। শিল্পীর লাল হলুদ নীল যথারীতি উজ্জ্বল। কিন্তু চোখের আরাম নষ্ট করে না। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকার কারণ হয়। সুযোগ করে দেয়। প্রতিটি পটকে মনের মতো করে গড়ে নেন শিল্পী। প্রাণের সঞ্চার করেন। এক ধরনের উৎসবের আমেজ আনন্দের উপলক্ষ তৈরি হয়ে যায়। একইরকম নিয়ন্ত্রণ তুলির ওপর। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আঁচড়ে মোটা মার্কিন কাপড় ভরিয়ে তুলেন। তার রেখা আর রঙের ব্যবহারে পটের ঐতিহ্য যেমন প্রকাশিত হয়, তেমনি এক ধরনের আধুনিকতা মূর্ত হয়ে ওঠে। পটের ক্ষেত্রে দ্বিমাত্রিকতাই মুখ্য। শম্ভু এখানেও ব্যতিক্রম। তার পটচিত্রে বহুমাত্রিকতা। নির্দিষ্ট ফর্ম ভেঙ্গে বের হয়ে যাওয়ার নেশা।

পটের সাধারণ ঐতিহ্য মেনে শম্ভু আচার্য্যও মহাভারতকে আশ্রয় করেন। পুরাণ থেকে আঁকেন। রূপকথারা কথা কয়। ওঠে আসে ধর্মীয় বিশ্বাস। তার পটে রাধা কৃষ্ণ আসে ঘুরে ফিরে। যুগলের প্রেম লীলা কল্পনার রঙ গায়ে মেখে সামনে আসে। ধারাবাহিক চিত্রকর্মে পটুয়া বর্ণনা করেন গাজীকালুর কেচ্ছা। মহাভারতের নানা চরিত্র কথা বলে পটের গায়ে। সীতার বনবাস নিয়ে কত গল্প। সেই গল্পকে রং তুলিতে আঁকেন তিনি।

প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য কাজে লোকায়ত জীবন ও সংস্কৃতির অনুসঙ্গ। বিশেষ করে বলতে হয় কলা গাছের পাতার কথা। এই পাতা আঁকতে গিয়ে স্বতন্ত্র সৌন্দর্যের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটান শিল্পী। কলাপাতার মোড়কে যে নারীমুখ, তার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকার সাধ হয়। গ্রামীণ প্রকৃতি শস্য ভা-ার নদী নৌকো অদ্ভুত ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে। গ্রামীণ জীবনের ছবি আঁকতে গিয়ে নারীকেই প্রাধান্য দেন শিল্পী। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান স্মরণ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। এই নারীদের হাত ভর্তি চুরি, নাকে নোলক, কোমরে বিছা। আলতা রাঙা পা। দীর্ঘ কেশ। বিন্যস্ত খোঁপা। সর্বোপরি চোখে মুখে যে সারল্য, তার কোন তুলনা হয় না। পটচিত্রে দেহাবয়বের ভাবভঙ্গিতে নানা ক্রিয়ার প্রকাশ ঘটে। মুখে তেমন কোন অভিব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। শম্ভুর কোন কোন আঁকায় ভাষা খুঁজে পাওয়া যায়।

পটুয়া একইসঙ্গে সমকালকে ধরার চেষ্টা করেন। তার নিজের সময়কে তিনি প্রাকৃতিক রঙে ফুটিয়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পাথর ভাঙ্গার কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিক, ভারত থেকে পাহাড়ী ঢলে ভেসে আসা হাতি যেন তার উদাহরণ। একাত্তরে ফিরে গিয়ে তিনি আঁকেন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে।

পটের পুরোটাজুড়ে কাজ করেন শম্ভু। প্রচুর কাজ। অলঙ্করণ। সব মিলিয়ে অনবদ্য এক একটি পট। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা উচিত হবে নিভৃতচারী পটুয়ার কাজ বিদেশেও বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন নানকরা জাদুঘরে স্থান করে নিয়েছে তার কাজ। অনেকেই জানেন না, এমনকি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে স্থায়ীভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে বাংলার পটচিত্র। এবং তা শম্ভু আচার্য্য’র কল্যাণেই।

গত শুক্রবার শুরু হওয়া প্রদর্শনী আগামী শুক্রবার পর্যন্ত চলবে। সমাপনী দিনে আরও থাকবে পটের গান। সুযোগটা কাজে লাগানোর মতো বৈকি! যারা দেখেননি, নিশ্চয়ই একবার ঘুরে আসবেন।

জনকন্ঠ