বাউশিয়ায় হচ্ছে না গার্মেন্টস পল্লী!

গার্মেন্টস মালিকদের অনীহা ও খামখেয়ালির কারণে গার্মেন্টস পল্লী হচ্ছে না মুন্সীগঞ্জের বাউশিয়ায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মালিকরা ওই পল্লীতে চড়া দামে জমি কিনে সেখানে কারখানা করতে চান না। ফলে জমি অধিগ্রহণের পরও এ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। এজন্য বিনিয়োগে আগ্রহ থাকা চীনা প্রতিষ্ঠান ওরিয়েন্টাল ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং করপোরেশন লিমিটেড (ওআইএইচ) কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘বাউশিয়া গার্মেন্টস পল্লীতে চীনের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ করার কথা ছিল। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ক্রেতারা সন্তুষ্ট হতেন। কিন্তু নানা করণে এটি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।’

সূত্র মতে, বাউশিয়ায় গার্মেন্ট পল্লীতে শিল্প স্থাপনে সরকারের অর্থায়ন চান ব্যবসায়ীরা। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানানো হলে তিনি মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর পরামর্শ দেন। আর ব্যবসায়ীদের এমন আচরণে বিব্রত হয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।

এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিচু জমি ভরাট করে সেখানে কারখানা উপযোগী প্লট তৈরি করতে প্রতি বিঘা জামির দাম পড়বে এক কোটি টাকার বেশি। এছাড়া অনুসঙ্গিক খরচ রয়েছে। তাই সেখানে শিল্প স্থাপন করা সম্ভব না।’

রাজধানী থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বাউশিয়ায় গার্মেন্ট পল্লী বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয় এক দশক আগে। তবে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ৫৩০ দশমিক ৭৮ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন দেয় সরকার। এরমধ্যে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বাউশিয়া, মধ্যম বাউশিয়া, পোড়ারচক, কাইচখালী ও চৌদ্দকাহনিয়া মৌজায় ৪৯২ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়। জমির দাম ও ক্ষতিপূরণের জন্য নির্ধারিত হয় ৭৭৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

শিল্পপার্ক স্থাপনে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ওআইএইচের সঙ্গে ২০১৪ সালের ১০ জুন সমঝোতা স্মারক ও ১৩ ডিসেম্বর কাঠামোগত চুক্তি করে বিজিএমইএ। শিল্পপার্ক স্থাপনে ব্যয় ধরা হয় ২৩০ কোটি ডলার। যার পুরোটাই চীনা কোম্পানির দেওয়ার কথা ছিল।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সমঝোতা স্মারক সইয়ের ধারাবাহিকতায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিজিএমইএ এবং চীনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট সই হয়। এর পাঁচ মাসের মধ্যে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি করা হয় একশ পৃষ্ঠার একটি সম্ভাব্যতা যাচাই রিপোর্ট।

এদিকে জমি অধিগ্রহণের পর দফায় দফায় জমির দাম ও ক্ষতিপূরণের জন্য নির্ধারিত টাকা জমা দিতে বিজিএমইএকে নোটিশ দেয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। কিন্তু বিজিএমইএ টাকা জমা দেয়নি। কারণ গার্মেন্টস মালিকরা রাজধানীর বাইরে কারখানা শিফট করতে চান না। ভাড়াটে কিংবা অংশীদারী ভবনে কারখানার মালিকদের জন্য এই গার্মেন্ট পল্লী নির্মাণ করার কথা ছিল। তাই বিজিএমইএ’র নেতৃত্বে থাকা বড় শিল্প মালিকদের এখানে বিনিয়োগের কোনও আগ্রহ নেই। গার্মেন্টস পল্লী স্থাপনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে দফায়-দফায় নানা উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করা হলেও তাতে সাড়া দেয়নি বিজিএমইএ।

এ অবস্থার মধ্যেই ওআইএইচের ১০ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করে ধারণা পান, পোশাকশিল্প মালিকরা এখানে প্লট কিনবেন না। ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানটিও বিনিয়োগে আগ্রহ হারায়। কারণ শিল্পপার্ক প্রতিষ্ঠার পর গার্মেন্ট মালিকদের কাছে প্লট বিক্রি করে এবং বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ভাড়া আদায় করে বিনিয়োগের সঙ্গে মুনাফা করার পরিকল্পনা ছিল চীনা প্রতিষ্ঠানটির।

মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সেখানে ৩০০-৫০০ কারখানা নির্মিত হওয়ার কথা ছিল। যেখানে কর্মসংস্থান হতো আড়াই লাখ শ্রমিকের। আর রফতানি করা সম্ভব হতো ৩০০-৫০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে নিবন্ধন হওয়া চালু গার্মেন্টস কারখানার সংখ্যা পাঁচ হাজার ১৯০টি। এরমধ্যে ঢাকায় দুই হাজার ৫০০টি, গাজীপুরে ৮৭২টি, চট্টগ্রামে ৫২৮টি, নারায়ণগঞ্জে এক হাজার ২১৮টি কারখানা রয়েছে। অন্য জেলাগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহে ২৭টি, যশোরে চারটি, মৌলভীবাজারে তিনটি, টাঙ্গাইলে ১১টি, মুন্সীগঞ্জে তিনটি, সিরাজগঞ্জ ও রংপুরে একটি করে, কুমিল্লায় ছয়টি, বগুড়ায় ১২টি ও খুলনায় তিনটি তৈরি পোশাক শিল্প কারখানা রয়েছে।

শফিকুল ইসলাম
বাংলা ট্রিবিউন

Comments are closed.